রবিবারের ছোটগল্প

Sunday, March 17th, 2019

  উত্তম বিশ্বাস

 

Ads code goes here

ফাগুন বার্তা  

প্যাসেঞ্জার না পেলে আজকাল মোবাইল টিপে টিপে পর্ণসাইট সার্চ করে টাইম পাস করে কৌস্তভ। বাকিদের মধ্যে কেউ কেউ খৈনি ডলে, একে অন্যের সুগঠিত বাহুর মাসেল মাপে, আর উগ্র খিস্তির সাথে কাঁচা সুপুরি চাবিয়ে ত্রিফলা ল্যামপোস্টের গোড়ায় ফচ্‌ ফচ্‌ করে পিক ফ্যালে। অথচ আশ্চর্য এদের মধ্যে একটিও বখাটে কিংবা বেয়াড়া ছেলে না! বেশির ভাগ পোষ্টগ্রাজুয়েট। দু’এক জনের ডিগ্রি একটু আধটু কমতি হলেও, ডিপ্লোমা সমতুল কাগজ সবারই একখান দুখান আছে।

এদিকে শহরের অলিতে গলিতে এখন দিনে রাতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে টোটো স্ট্যাণ্ড। যদিও বড় রাস্তায় পারমিশান নেই। তাতে কী! এরা আপাতত এটুকু আঁকড়ে ধরেই হুহু করে ছুটছে শহরের গলিঘুঁজিতে।
–“হ্যালো ডিয়ার, একটু আসতে পারবে?”
ফোনের ওপার থেকে ক্লান্তি জড়ানো কণ্ঠে অবজ্ঞার মতো এক জিজ্ঞাসা ভেসে এল, “কোথায়?”
–“উল্টোডাঙ্গা নতুন ওভারব্রিজের নীচে দাড়াচ্ছি, ওখানেই।”
–“তোমার মাথায় ছিট আছে বুঝলে! আমি অনশন মঞ্চে আছি তো!—চাইলেই আসা যায়?”
–“বহুত ল্যাবড়াবাজি শুরু করেছ আজকাল! আধঘণ্টার জন্যে মিমিকে পাঠাচ্ছি। ওকে রিলেতে রেখে চলে এস ব্যাস!”
–“তোমার দরকারটা মিমিকে দিয়েই মিটিয়ে নাও না।”
–“ওই মঞ্চে আমাকে যেন না যেতে হয়। তুমি আসবে ব্যাস
। আর যদি একবার যাই না, গুষ্টির গু—!” কথাটা অসমাপ্ত রেখেই ফোনটা কেটে দিল কৌস্তভ।

ঠিক আধঘণ্টার মধ্যে এসে হাজির হল আদ্রিজা। ধ্বস্ত শরীর। অথচ হাসিমুখ। দেখে মনেই হবে না ও এখন মৃত্যুর চেয়েও অনিশ্চিতু এক অন্ধকার ম্যারাপের তলা থেকে উঠে এসেছে। কালিপড়া চোখদুটোর কোটরে অদ্ভুত এক মায়া মাখিয়ে নিয়ে এসেছে আদ্রিজা। কিন্তু ওদিকে তাকাল না কৌস্তভ। চড়ানো চোয়াল, আর বৃদ্ধা কাছিমের মতো কুচকে আসা কণ্ঠি দেখে কৌস্তভের বুকের ভেতরটা ক্ষোভে, দুঃখে হুহু করে উঠল। পাছে দুর্বলতা প্রকাশ পায়, তাই মুখ ভেংচে বলল, “তোমার মতো একখান ছকেট থাকলে না, ওসব ফল্লা না করে, চুপচাপ লাইনে দাঁড়িয়ে পড়তাম, বুঝলে?” সপাটে একটা চড় উড়ে এসে পড়ল কৌস্তভের গালে। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল কৌস্তভ। স্ট্যাণ্ডের অনেকেই শুনছিল উত্তপ্ত বাদানুবাদ। কিন্তু কেউ কিছু বলল না। কারণ এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে এসব কথাগুলোই আজ বড্ড বেশি দ্রোহের, বড্ড বেশি সেনসিটিভ। মিনিট দুয়েক নীরব থাকার পর চিৎকার করে উঠল কৌস্তভ, “তোমার বয়েস কত হল? আমার বয়েসই বা কত হল?কেন আমরা আজও সংসার পাততে পারলাম না? একজন ঠ্যালাচালক সে ঠিকই রাতে ঘরে গিয়ে বউবাচ্চাকে পাশে নিয়ে আরাম খাচ্ছে। একজন ফুচকা বিক্রেতা, সেও ময়দা ঠাসতে ঠাসতে ঘরের মেয়েলোককে নিয়ে সুখ মিটিয়ে নিচ্ছে। তাহলে আমরা কেন পারছি না? কেন? হোয়াই?”
–“আমরা অনেক স্বপ্ন দেখে ফেলেছি বোধ হয়। আমাদের পুস্তকপ্রণেতা আর ওইসব আঁতেল মার্কা সিলেবাস কমিটিগুলোই হয়ত এর জন্যে দায়ী!”
কৌস্তভ এক ছুট্টে পাশের একটা গ্যারেজে ঢুকে বড় একটা হ্যামার জাতীয় কিছু এনে বলল, “মারো। নইলে আমি তোমার মাথাটা থেঁতো করে দেব!”
আদ্রিজা অজানা আতঙ্কে কৌস্তভকে জড়িয়ে ধরল। বলল, “তুমি এমন করছ কেন সোনা?” বুকের খাঁজে মুখ লুকিয়ে অনেকটা গরম নিঃশ্বাস দিল কৌস্তভকে। তারপর স্নিগ্ধ স্বরে সান্তনা দিল, “মাথা গুড়িয়ে দিলেই কি আর স্বপ্নের প্রাসাদ গুড়ো করা যায়? তিল তিল করে গড়ে তোলা এই সৌধ! চূর্ণ করি কোন সাহসে বলো? আমাদের এ চাহিদা কোথায় যেন অদৃশ্য এক রক্তের অক্ষরে লেখা আছে। তুমি হয়তো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলে। কিন্তু পরক্ষণেই আমার মাথা ফুঁড়ে হয়তো সেই একই চাহিদার ফুল ফুটবে। ধীরে ইয়ার! লড়াইটাকে সাকসেস হতে দাও, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বেলোয়ারীর ওই ঝুটা ঝাড়গুলো আমরাই একদিন খসিয়ে দেব। নইলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম… আমাদের মতো থিয়োরিওয়ালা ছেলেমেয়েরা শূন্যে এমনই করে হাত-পা ছুড়ে কাঁদবে!  এবার বলো কী জন্যে ডেকেছিলে?”
কৌস্তভ পকেট থেকে একটা মোড়ক বার করে আদ্রিজার গাল, মাথা, বুক, সব লাল করে দিল।
–“এমা! কী সর্বনাশ করলে? আমি এখন অনশন মঞ্চে অংশগ্রহণ করব কী করে?”
–“আ-বে দেখো, জোরপূর্বক সিঁদুর তো ঢেলে দিই নিই, জাস্ট আবীর। একটা একটা করে বসন্ত খুন হয়ে গেল আমাদের! পচিশ—পয়ত্রিশ– পয়তা–!” আর বলতে পারল না। গলাটা ধরে এল কৌস্তভের।
–“একটা রুমাল দাও প্লিজ, মুছে নিই।”
সমান দর্পভারে কথার রিটার্ন এল, “এটুকুও আজকাল বিলাসিতা বলে মনে হয়! আজও সকাল থেকে লাইনে ভ্যারেণ্ডা ভাজছি। একজন প্যাসেঞ্জারও…!”
লজ্জায় ও করুণায় এক্কেবারে আদ্র হয়ে এল আদ্রিজা। কৌস্তভকে কাছে টেনে নিয়ে আবীর রাঙা গালটা ওর বুকে পরম মমতায় ঘষতে লাগল।
হঠাৎ দু’ফোঁটা অশ্রু উষ্ণ আকাশের আক্ষেপ হয়ে আদ্রিজার ময়লা রুক্ষ চুলের মধ্যে টুপটুপ করে ঝরে পড়ল। “এটুকু মুছো না প্লিজ। আমি অনশন মঞ্চে যেতে পারলাম না। সরি! কিন্তু কী করব বলো, ভীষণ লজ্জা লাগে! চাকরিটা যে আমারও প্রয়োজন। আমার জন্যে না হলেও, আমার ভেতরে যে লড়াকু আর এক কৌস্তভ রয়েছে, তার জন্যে! কোনও শর্তেই আমরা আমাদের স্বপ্নের রং ফিকে হতে দিতে পারি না! এখন থেকেই তাই আগাম অভিনন্দন পাঠালাম।”
হঠাৎ সরকারি আবাসনের আড়াল থেকে একটি দলছুট কোকিল স্বরভাঙা কণ্ঠে করুণ সুরে কোকিয়ে উঠল!

আজ হোলি। পড়ন্ত বিকেলে বিহারি কুলিরা কর্পোরেশনের কলে তাদের কাঁধের উত্তরীয়খানা পাকা শানের ওপর যখন আছাড় দিয়ে দিয়ে কাচছিল, ঠিক সেই সময় শুনশান রাস্তা দিয়ে একমাথা আবীর নিয়ে অনশন মঞ্চের দিকে এগিয়ে চলেছে আদ্রিজা।

Spread the love

Best Bengali News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is Bengal's popular online news portal which offers the latest news Best hindi News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is popular online news portal which offers the latest news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement