রবিবারের গল্প, ‘সানাইবাদক’

Sunday, August 25th, 2019

 উত্তম বিশ্বাস:

সানাইবাদক

Ads code goes here

সুধন্য সাধুখাঁ মস্ত বড় সানাইবাদক। এই কথাটি সে পৃথিবীর পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ সবখানেই ছড়িয়ে দিতে চায়। সে কারণে তার সানাই মোটে থামায় না সে। বিবাহ নয়, কোনও মাঙ্গলিক আচার আহ্নিকও নয় সে কেবল সুরের আনন্দেই সারাক্ষণ সানাই বাজায়। জীবনে আর কিছুই শেখেনি সুধন্য। তাকে থামাতে পারে এমন মানুষও এ তল্লাটে একটিও খুঁজে পাওয়া যায় না! ওর এই সানাই থামলে নাকি গ্রহ-তারকাদের আহ্নিক গতি থমকে যাবার সম্ভাবনা আছে। এটা অবশ্য সুধন্য নিজেই মনে করে। অথচ ওর দুঃখ একটাই, ও যখন সানাইয়ে ডুব দেয় অমনি গাঁয়ের প্রতিটি ঘর আলো নিভিয়ে দরজা জানলার কপাট এঁটে দেয়। এমন কি সুধন্য যে মেয়েটাকে ভালোবাসে সেও সুধন্যর সানাই শুনলে কানে হেডফোন গুঁজে দিয়ে অন্যমনস্কের মতো সরে দাঁড়ায়। সুধন্যের বুড়ি মা অবশ্য বার কয়েক উঠোনে মাদুর বিছিয়ে লোক টানার চেষ্টা করেন, “একবার শুনেই দেখো না। কী অসম্ভব মহিমা আছে ওর সুরে!”
কিন্তু কেউ আমল দিল না এমন আদেখলেপনায়, “ধুর! এই নাকি সানাই! শিক্ষিত লোকেরা এখন দু’মুঠো ভাতের জন্যে কত না কৌশলে ঘরে বসে কাঁদে!” একে আকালের বৎসর। তার ওপরে ধম্মষাঁড়ের অত্যাচার। মানুষ এখন দিনে রাতে চব্বিশ ঘণ্টা আগুনের মালসা মাথায় করে নিয়ে হাঁটছে। কে শুনবে অমন ঘ্যানঘেনে রাগিনী!
—“তাহলে এ বাঁশি কেউ কি শুনবে না?” এই আক্ষেপ মনের মধ্যে গুড়ো করতে করতে একসময় মরিয়া হয়ে উঠল সুধন্য। একদিন খুব ভোর ভোর সে তার বুড়ো বাবাকে চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে উঠোনে নিয়ে এল। বাটনাবাটা নোড়া দিয়ে তার দাঁতকপাটি গুড়ো করে দিল। তারপর বিচালিকাটা বটি দিয়ে গলার নলিটা ফাঁক করে ফেলল। কাটা কৈতরের মতো ছটফট করতে লাগল ছিন্নমস্তা সুধন্যর বাপ। সুধন্যর বুড়ি মা তার শুকনো কচ্ছপের নাড়ির মতো শরীর কাঁচিয়ে যেই না কটু খিস্তি আর শাপশাপান্ত মাখিয়ে কোকিয়ে কেঁদে উঠল, অমনি উঠোনের চারপাশ থেকে অনেকগুলো লোক এসে ওদের বাড়িটাকে ঘিরে ফেলল।
—“এই জানোয়ার সুধন্য বাইরে আয় বলছি!” ধৈর্য্যহারা মানুষ যে যার ভাষায় চিৎকার করতে লাগল। সুধন্য ভেতর থেকেই সানাইয়ে ফুঁ দিল। হঠাৎ উঠোন ভর্তি লোকগুলো পাথরের পুতুল হয়ে গেল। সুধন্যর রাক্ষুসী মা’কে বিশাল বড় এক বাজপাখি এসে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গেল। অমনি অমাবস্যার চেয়েও গাঢ় মেঘ অন্ধকার করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল। ভোর ভিজিয়ে সকাল এল। দুপুর গড়িয়ে গোধূলী। তখনও লোকগুলো শুদ্ধ আত্মা সন্তদের মতো সানাইয়ের স্বরে স্বরে স্নান করতে লাগল।
একসময় গাছগাছালিতে পাখিরা প্রহর মেপে পাখা ঝাড়া দিয়ে ডেকে উঠল। তবু লোকগুলো নড়ল না। উঠোন দিয়ে বরবধূর পালকি নিয়ে ছয় বেহারা তাদের আদিমকালের আদিরসাত্মক গান গাইতে গাইতে চলে গেল। একজন অপরূপা যুবতী সবচেয়ে মোটা ভুঁড়িওয়ালা পাথরের পেটে আলত করে হলুদ মাখিয়ে দিল। তবু লোকগুলি নড়ল না। একসময় মাঠে মাঠে শুকনো বীজতলা ফেটে অঙ্কুর বার হল। তবু লোকগুলো নড়ল না।
দশদিগন্ত ব্যেপে তখন এক আশ্চর্য নীরবতা! কেবলমাত্র সুধন্যর সানাই দ্রিমি দ্রিমি লয়ে ঘুরে ঘুরে পৃথিবীকে আলিঙ্গন করতে লাগল। এই ফাঁকে সুধন্যর বুড়ি মা জোনাকি হয়ে উড়ে এল স্বর্গের সুরভী তীর্থে থেকে। এখন চালতা গাছের পাতায় ঝুলে ঝুলে উনিও মধুর হাসি হাসছেন!
একসময় সুধন্যর ঠোঁট দুটো অসাড় হয়ে এল। বাঁশিখানি ফেলে দিয়ে বাপের মৃতদেহের ওপর একবার চুমু খেল। মুহূর্তে পাথরগুলি আবার মানুষ হয়ে তাদের কৌতূহলী হাত পা নিয়ে পূর্বের মতো নড়াচড়া করতে লাগল।
একজন ছুটে গিয়ে একথালা জুঁইফুল এনে সুধন্যর পায়ের কাছে রাখল।
একজন তাদের মন্দির থেকে পেতলের বড় একটা ঘণ্টা খুলে এনে জোরে জোরে বাজাতে লাগল।
একজন অনেককালের একখানি পুরনো ধর্মীয় পুঁথি এনে ওর ওপর আগুন ছুড়ে মারল।
আর বাদবাকি যারা ছিল, তারা সমবেতভাবে হাততালি দিয়ে সুধন্যকে অভিনন্দন জানাল।
চলে যাবার আগে সুধন্যর বাঁশিখানি ছুঁয়ে দ্যাখার জন্যে অনেকের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে গেল। হঠাৎ ওর বুড়ি মা ছিন্ন মুণ্ডুটা জুড়ে দিয়ে, ওর বাপকে ঘাড় ধরে ঠেলে বসিয়ে দিল।
সুধন্যর বাপও হাততালি দিল।
সকলের হাঁ হাওড়া ব্রিজ হবার উপক্রম, “ও বুড়ো তুমি মরনি?”
—“মরেছি বৈকি! ছেলেটা আমার স্বীকৃতি পেল, সমাজ মেনে নিল! আমিও যে আনন্দ পেয়েছি এটা ওকে না জানিয়ে একেবারে মরি কী করে বলো!”

………………………..

উত্তম বিশ্বাসের জন্ম ১৯৮০ সালে। বনগাঁর এক অখ্যাত সীমান্তগ্রাম সুটিয়ায়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে এমএ। পেশায় শিক্ষক। প্রকাশিত গ্রন্থ ‘নদীতৃষ্ণা ও অলৌকিক মাছেরা’ ২০১৮ (গল্পগ্রন্থ)। উপন্যাস ‘বন্ধ্যানদীর বালিহাঁস’ ২০১৯,। কাব্যগ্রন্থ ‘জলটুঙি’ ২০১৯,। প্রকাশের পথে ‘মাটির সিন্দুক’ (গল্পগ্রন্থ) বইমেলা ২০২০। ২০১৮ সালে পেয়েছেন ‘রামমোহন রণজিৎ পাল সাহিত্য পুরস্কার’। ভালোবাসেন লেখালিখি ও গান।

Spread the love

Best Bengali News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is Bengal's popular online news portal which offers the latest news Best hindi News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is popular online news portal which offers the latest news

One response to “রবিবারের গল্প, ‘সানাইবাদক’”

  1. BISWAJIT BISWAS says:

    ‘সানাইবাদক’এক অনন্য স্বাদের গল্প।শুধু গল্প বললাম এই কারণে যে এটিকে যেমন ঠিক ছোটগল্প বলা চলে না তেমনি অনুগল্পের বৈশিষ্ট্যাবলী ছাপিয়ে আরও কিছু বক্তব্য ও ভাবের বিচ্ছুরন ঘটেছে এখানে যা এই গল্পটিকে নতুন আঙ্গিকে মুড়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
    প্রচলিত গল্পের যে ধাঁচ তা এখানে লক্ষিত হয় না-অর্থাৎ কন্টেন্ট ও ফর্মের দিক দিয়ে এ গল্পের আঙ্গিক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ক্ষুদ্র একমুখীন ঘটনা সরলরৈখিক পথ অনুসরণ করে এগিয়ে চললেও মাঝপথে কোন এক বিস্ময়ের কুজ্ঝটিকাজানে আচ্ছন্ন হয়ে এক অযাচিত অন্ধকারের মধ্যে পথ হাতড়াতে শুরু করে দিল।তৈরী হল বিস্ময়-মিশ্রিত এক গোলকধাঁধা। পাঠকের বুদ্ধি ও চিন্তাও আচ্ছন্ন হতে শুরু করল।যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা চালিত অনুশাসনের বাইরে অবস্থিত মগ্নচৈতন্যের এক অধিবাস্তব জগতের অতলান্তিক রহস্যকে উন্মোচনের আতিশয্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন পাঠকবর্গ।স্বপ্ন ও বাস্তবের প্রচলিত অবস্থান অতিক্রম করে পাঠকবর্গ চলে গেলেন এক উচ্চতর বাস্তব বা অধিবাস্তবের অবচেতন-স্তরে,যেখানে চেতনাজগতের মস্তিষ্কপ্রসূত জ্ঞানলোক ও মগ্নচৈতন্যের রহস্যলোক মিলেমিশে এক হয়ে যায়। গড়ে ওঠে Superreality র এক জগৎ,যেখানে চিন্তা, কল্পনা, স্বপ্ন ও বাস্তব সব মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
    সুধন্য সাধুখাঁ জীবনে বেঁচে থাকতে এক আদর্শকে বেছে নিয়েছিল। সানাইয়ের বাঁশি ছিল তার সেই আদর্শের মূলাধার।সুধন্যের এই আদর্শের কিয়দংশ ঈশ্বর প্রদত্ত আর অনেকাংশে পিতৃদত্ত। পিতার কাছ থেকে পাওয়া এই একমাত্র সম্পত্তিকে অবলম্বন করে সুধন্য তার সাধ ও স্বপ্নকে সাকার করে তুলতে চেয়েছিল।সে যে মস্ত সাধক সেকথা জেনেও সুধন্যের আত্মা পরিতৃপ্ত হয়নি,তাই পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ সবখানেই তার বাণীর সঞ্জীবনি সুধায় সিঞ্চিত করে দিতে চেয়েছিল।আর এখানেই সুধন্যের শিল্পসাধনার স্বাতন্ত্র্যতা এখানেই।তাছাড়া কোন ব্যক্তি মানুষের তাবেদারির জন্য তার শিল্পীসত্ত্বা নিয়োজিত হয়নি,তাই-“বিবাহ নয়,কোন মাঙ্গলিক আচার আহ্নিকও নয় সে কেবল সুরের আনন্দেই সারাক্ষণ সানাই বাজাই।” কিন্তু সুধন্যের এই সারস্বত সাধনাকে তার প্রতিবেশীরা সহজভাবে গ্রহণ করেনি,তাই -” ও যখন সানাইয়ে ডুব দেয় অমনি গাঁয়ের প্রতিটি ঘর আলো নিভিয়ে দরজা জানলার কপাট এঁটে দেয়।”অথচ ওর সানাইয়ের সুর মহাকাশের গ্রহতারকাদের গতিবিধিকে পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
    সুধন্যের দুঃখ একটাই- তার মন ও মননকে কেউ যেমন আমল দিতে চাইনি তেমনি বুঝতেও চায়নি তার মানসিকতাকে।তার সাধনার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল সমাজজীবনের চরম অবক্ষয়, অধঃপতন আর মূল্যবোধহীন নিশ্চল মানসিকতা। লেখকের এই মন্তব্য তার প্রমাণ দেয় -“ধুর! এই নাকি সানাই!শিক্ষিত লোকেরা এখন দুমুঠো ভাতের জন্য কতনা কৌশল করে ঘরে বসে কাঁদে। ”
    মানুষের রুক্ষ শুষ্ক নিরস নির্জীবতা আকাল বৎসরের রূপ ধারণ করলে ধম্ম-ষাড় রূপী নিঃষ্কর্মা গুণ্ডা বদমায়েশদের বাড়বাড়ন্তকে আরও উচ্চকোটি পর্যায়ে উন্নীত করে দেয় ফলে তার সানাইয়ের সুর ঘ্যানঘ্যানানি প্যানপ্যানানির মত লাগে যে কারণে সুধন্যের সারস্বত সাধনা হাপিয়ে ওঠে,গুমরে ওঠে-“তাহলে এ বাঁশি কেউ শুনবে না?” এ আক্ষেপ তাকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে।
    এই পর্যন্ত গল্প তার প্রচলিত (ফর্মের) পথ ধরেই চলছিল কিন্তু তার পরেই কেমন যেন চকিতেই সব ওলট পালট হয়ে গেল। সুধন্য তার বাবার আদর্শের পথ ধরেই এগিয়ে চলছিল কিন্তু যখন দেখল সে পথ হাজার কণ্টকে আকীর্ন হয়ে আছে,নানান প্রতিকূলতা আর প্রতিবন্ধকতা সে পথকে বিপন্ন করে তুলেছে তখনই দিশেহারা হয়ে সুধন্য হটকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে- পিতাকে হত্যা করে তার আবাল্য আদর্শকে জলাঞ্জলি দিতে এতটুকু কুণ্ঠিত হয় না সে।বিচিলি-কাটা বটি দিয়ে বাবার গলার নলিকে দুফাঁক করার সাথে সাথে সুধন্য তার শিল্পসত্ত্বাকেও দুখন্ড করে ফেলল।এই পর্যায়ে সুধন্যের জীবনে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিয়েছে তার মনের এক অবচেতন অন্ধকার স্তর,যেখানে তার মা আলো ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি,উপরন্তু সমাজের চোখে তার সেই চেষ্টাকে মনে হয়েছিল ‘আদেখলেপনা’।
    বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ফরাসী সাহিত্যে ‘Dadaism’ বা ডাডাবাদ বলে একপ্রকার সাহিত্য আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল। একদল শিল্পী সাহিত্যিক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা ও বিনাশের মধ্যে দাঁড়িয়ে শিল্প সাহিত্যের প্রচলিত প্রথা,রীতি ও বক্তব্যকে ব্যঙ্গবিদ্রূপ বাণে ছিন্নভিন্ন করে দিতে চাইলেন -“A movement in European an US art characterised by violent against traditional values.” অর্থাৎ যা কিছু প্রথাগত, স্থির ও সুস্থিত তাকে সংহার করাই ছিল ডাডাবাদী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। প্রাচীন পচাঁ ঐতিহ্য আদর্শবোধ ও নীতিমালা সবকিছুকে ভেঙেচুরে ফেলতে চাইলেন ডাডাবাদী সাহিত্যিকেরা। পরিবর্তে এক উদ্দাম অবিন্যস্ত জীবনবোধ সাহিত্যে নির্মান করতে চাইলেন তাঁরা। আলোচ্য গল্পেও লেখকের সেই প্রচেষ্টা প্রতিফলিত হয়,যখন দেখি সুধন্য সাধুখাঁ তার পিতাকে হত্যা করে সেই উদ্দামতার সাক্ষী থেকেছে।
    (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement