রবিবারের গল্প: ব্ল্যাক সোয়ান

Sunday, August 18th, 2019

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়:

– “আপনার নাম হংসিনী দাশগুপ্তা! ইন্টারেস্টিং!”
– “ইন্টারেস্টিং? ও।”
– “না … মানে এই নাম আগে কখনও শুনিনি।”
– “আসলে ওই একটা গান আছে, না- “ও হান্সিনি, মেরি হান্সিনি …”
– “হ্যাঁ, কিশোর কুমারের বিখ্যাত গান।”
– “আমার বাবার খুব প্রিয় গান। ছোটোবেলায় বাবা আমাকে এই গানটা গেয়ে গেয়ে ঘুম পাড়াত … সেই থেকে কোনোভাবে আমার ধারণা হয় আমার নাম হংসিনী … মানে, কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে আমি বলতাম, আমার নাম “হান্সিনি” … এসব আমার স্মৃতিতে নেই … শোনা কথা … তো তখন আমার বাবা-মা ঠিক করেন যে আমার নাম “হংসিনী”-ই রাখা হবে।”
– “অর্থাৎ আপনি নিজেই নিজের নামকরণ করেছিলেন।”
– “হ্যাঁ … বলতে পারেন।”
– “আপনার বয়স?”
– “২৭।”
– “কী করেন?”
– “আমি একটি হাইস্কুলের টিচার।”
– “কোথায় থাকেন?”
– “সোনারপুরে।”
– “বাড়িতে আর কে কে আছেন?”
– “কেউ নেই। আমি একা থাকি।”
– “আপনার বাবা-মা?”
– “ওরা ঢাকুরিয়ায় থাকে।”
– “আপনার স্কুলটা কোথায়?”
– “লক্ষ্মীকান্তপুরে।”
– “সোনারপুর থেকে লক্ষ্মীকান্তপুর যাওয়াও যা ঢাকুরিয়া থেকে যাওয়াও তো তাই। বাবা-মায়ের সঙ্গে না থাকার কারণ?”
হংসিনী উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে রইল। ডাক্তার সুবিন্যাস চট্টোপাধ্যায় আবার প্রশ্ন করলেন- “আপনার ম্যারাইটাল স্ট্যাটাস?”
– “অবিবাহিত।”
– “বয়ফ্রেন্ড আছে?”
– “ছিল।”
– “তাঁকে নিশ্চই বাড়ি থেকে মেনে নেয়নি? তাই বেরিয়ে এসে একা থাকার সিদ্ধান্ত।”
– “হুঁ।”
– “তো বয়ফ্রেন্ডকে বিয়ে করলেন না কেন?”
– “সেটা কোনোদিনই সম্ভব ছিল না।”
– “একটু বিস্তারিত ভাবে বললে ভালো হয়।”
– “ও প্রথম থেকেই বিবাহিত এবং যমজ কন্যার পিতা। আর দুই মেয়েরই অটিজম আছে। এ অবস্থায় সংসার ছেড়ে কী করে বেরিয়ে আসবে, বলুন?”
– “হুঁ, ঠিক। আপনাদের পরিচয় কী করে?”
– “শঙ্কর আমাকে পড়াত।”
– “ভদ্রলোকের নাম শঙ্কর?”
– “হ্যাঁ।”
– “উনিও কি ঢাকুরিয়ার?”
– “হ্যাঁ, একই পাড়ার।”
– “আপনাদের বয়সের বেশ ভালোই তফাত ছিল তার মানে?”
– “হ্যাঁ, শঙ্কর আমার থেকে ১৭ বছরের বড়।”
– “আপনার বাড়িতে তো এই সম্পর্কের ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গিয়েছিল?”
-“হ্যাঁ।”
-“আর শঙ্করবাবুর বউ?”
-“জানত।”
-“তাই নিয়ে ওঁদের ফ্যামিলিতে অশান্তি হত না?”
-“হত। ওর বউ অত্যন্ত মুখরা। আমি শঙ্করের জীবনে আসার অনেক আগে থেকেই ওদের ঝামেলা। ওই মহিলার ঝগড়া করাটা বলতে পারেন একটা হবি। কিছু না কিছু নিয়ে ওকে ঝগড়া করতে হবে। পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন কারো সঙ্গে ওর সদ্ভাব নেই। বাজে টাইপের মহিলা। শঙ্করের জীবনটা অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। শঙ্কর শান্তশিষ্ট মানুষ … আমি ছিলাম ওর কাছে সবকিছুর রিলিফ …”
– “বুঝলাম। ভদ্রমহিলার চাপটা একবার ভাবুন। দুটো অটিস্টিক বাচ্চা। ভদ্রমহিলা কি হাউজ-ওয়াইফ?”
– “হ্যাঁ, পরমুখাপেক্ষী।”
– “সারাদিন চার-দেওয়ালের মধ্যে দুটো অটিস্টিক বাচ্চাকে নিয়ে পড়ে থাকতে হলে বুঝতেন। যে কেউ খিঁটখিঁটে হয়ে যাবে। তাকে তো কেউ রিলিফ দিতে আসছে না, না?”
– “শঙ্করেরও চাপ কম ছিল না। প্রচুর টাকার যোগান দিতে হত ঘরে। সকালে টিউশনি, তারপর অফিস, আবার বাড়ি ফিরে টিউশনি। তার ওপর ওই কাণ্ডজ্ঞানহীন বউ।”
-“আপনি এসবের মধ্যে পড়ে নিজের জীবনটাকে অযথা জটিল করে তুলেছিলেন। যাইহোক, সেই সম্পর্কটা তো আর নেই। এবার বলুন, এখন সমস্যা কী?”
– “সবাই বলল, একবার সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যেতে, তাই এলাম। সমস্যাটা আসলে ঠিক আমার নয় …”
– “বলুন গোড়া থেকে।”
– “একদিন হল কী, স্কুল থেকে ফিরে খুব ক্লান্ত লাগছিল। ঘুমিয়ে পড়েছি। রাত আটটা নাগাদ শঙ্করের ফোনে ঘুম ভাঙল।”
– “এটা কবেকার ঘটনা?”
– “মাস তিনেক আগে।”
– “আচ্ছা, তখনও সম্পর্কটা ছিল।
আপনি স্কুল থেকে কখন ফেরেন? আর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কখন?”
– “স্কুল থেকে ফিরতে আমার চারটে-সাড়ে চারটে বাজে। ঘুমিয়েছি ধরুন ওই পাঁচটা।”
– “বেশ। তারপর?”
– “শঙ্কর ফোন করে বলে- “এটা কী করলে তুমি? তুমি কি আমায় বাঁচতে দেবে না? আমি তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি।” আমি তো অবাক! কী করলাম রে বাবা!”
– “আচ্ছা!”
– “আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কেন কী করেছি আমি। ও বলে সেদিন সাড়ে ছ’টার সময় নাকি আমি ওর বাড়িতে গিয়েছিলাম। গিয়ে ওর বউকে বলেছি- “শঙ্করের জীবনটা এইভাবে বরবাদ করছিস কেন? দুটো অটিস্টিক বাচ্চার জন্ম দিয়ে তোর লজ্জা হল না? আমার সঙ্গে সম্পর্ক আছে জেনেও নির্লজ্জের মতো এখানে পড়ে আছিস। দূর হয়ে যা।” আমি তখন শঙ্করকে জানাই যে আমি তো সেই সময় ঘুমাচ্ছিলাম। তাছাড়া, এই ধরণের অসভ্যতা করার মতো মেয়েই নই আমি। যদি সত্যিই শঙ্করের বউকে গিয়ে এসব বলতাম ও আমাকে ছেড়ে কথা বলত? সত্যি কথা বলতে কী ওই মহিলার মুখ লাগার সাহসই নেই আমার। সব শুনে শঙ্কর আমাকেই বিশ্বাস করে এবং বলে- “এটা তাহলে ভাস্বতীর নতুন ব্যামো শুরু হল- মিথ্যে কথা বলে অশান্তি পাকানো।”
– “শঙ্করবাবুর স্ত্রীর নাম তাহলে ভাস্বতী। আপনি কি মনে মনে কখনও এই কথাগুলো ভাস্বতী ম্যাডামকে বলতে চেয়েছিলেন?”
– “না না, ছি ছি। শঙ্করের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করে এই নিয়ে ওই মহিলার ওপর আমার সত্যিই রাগ ছিল। কিন্তু, বাচ্চাদের নিয়ে ওইসব কথা! আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। আর শঙ্কর নিজেই তো ডিভোর্স করতে চায় না। সে ব্যাপারেই বা আমি ভাস্বতীকে দোষ দিতে যাব কেন? আমি তো এই ব্যবস্থা মেনেই নিয়েছিলাম।”
– “শঙ্করবাবু আপনার সোনারপুরের বাড়িতে আসতেন?”
– “হ্যাঁ, আসত। এসে কিছুক্ষণ থেকে চলে যেত। রাত কাটাত না।”
– “ও। তারপর কী হল?”
– “আমি দু-এক দিন অন্তর অন্তর বাবা-মাকে ফোন করি। যতই মতের অমিল থাকুক, আলটিমেটলি ওরা আমার বাবা-মা, আমি ওদের একমাত্র সন্তান, ওদের প্রতি আমার একটা দায়িত্ব তো থেকেই যায়।”
– “হ্যাঁ, অবশ্যই।”
– ” একদিন ফোন করে দেখি, মা বারবার ফোন কেটে দিচ্ছে। এরকম তো কখনও হয় না! ভাবলাম, বিজি আছে হয়তো। কিছুক্ষণ বাদে আবার ফোন করলাম। সেই একই ব্যাপার। তখন বাবার ফোনে ফোন করি। বাবাও দেখি ফোন কেটে দিচ্ছে। খুব চিন্তায় পড়ে যাই। কী হল রে বাবা! উপায় না দেখে পাশের বাড়ির এক কাকীমার মোবাইলে কল করি। কাকীমা বলল- “ওরা তো বাড়িতেই আছে, আলো জ্বলছে দেখতে পাচ্ছি, টিভির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।” আমি বললাম- “কাকীমা, একবার কষ্ট করে ও বাড়িতে গিয়ে দেখবে কী হয়েছে? আমি লাইনে থাকছি।” কাকীমা আমাদের বাড়িতে গিয়ে মাকে সোজা ফোনটা ধরিয়ে দিল। মা “হ্যালো” বলতে আমি বললাম- “কী হয়েছে তোমাদের? ফোন কেটে দিচ্ছ কেন?” মা বলল- “এখন ফোন রাখ, পরে ফোন করছি।”
– “এটা কবে ঘটেছে?”
– “এই ধরুন, শঙ্করের বাড়ির ইনসিডেন্টটার এক সপ্তাহ পর।”
– “আচ্ছা। তারপর মা কল করলেন?”
– “হ্যাঁ, ওই কাকীমা চলে যেতে মা আমায় ফোন করল। করে বলে- “তুই কী করতে ফোন করছিস আবার? কাল বাড়িতে এসে তো আমাদের সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে গেলি। কী অপমানটাই না করলি! এত কষ্ট করে জন্ম দিয়ে, এত কষ্ট করে মানুষ করে, এই তার প্রতিদান?” আমি তো পুরো আকাশ থেকে পড়ছি! বললাম- “কাল! কখন!” মা বলল, ওই নাকি সন্ধ্যে ছ’টা নাগাদ!”
– “আর সেদিনও আপনি স্কুল থেকে ফিরে ওই সময় ঘুমাচ্ছিলেন?”
– “ঠিক তাই।”
– “আর কোনো ঘটনা?”
– “অনেক মান-অভিমানের পর বাবা-মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক স্বাভাবিক হল। এবারে, জুন মাসের ৩ তারিখ, আমার বেস্টফ্রেন্ড প্রমিতার জন্মদিন ছিল। আমরা একদম স্কুলবেলার বন্ধু। উইশ করব বলে ফোন করেছি। ও ফোন তুলে বলল- “কোন মুখে আবার আমায় ফোন করছিস? কী করে গেছিস আমার বাড়িতে তোর মনে নেই?” শুনলাম, কোনো এক সন্ধ্যেবেলায় আমি ওর বাড়ি গিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করে এসেছি, বলেছি- “তুই আমায় চিরকাল ভুল পথে চালিত করে এসেছিস। কোনোদিন একটা ভালো পরামর্শ দিসনি। তোর জন্যে আমার জীবনটা বরবাদ হয়েছে।” তার সঙ্গে নাকি তুমুল গালি-গালাজ! আমি তখন প্রমিতাকে বললাম- “তুই তো আমার এতদিনের বন্ধু, কোনোদিন আমার মুখ দিয়ে একটা খারাপ কথা বেরতে শুনেছিস? কোনোদিন উঁচু স্বরে কথা বলতে শুনেছিস? বিশ্বাস কর, ওটা আমি ছিলাম না।” বলে আমি আগে যা যা ঘটেছে প্রমিতাকে সব বললাম। শঙ্করের ব্যাপারটা ও প্রথম থেকেই জানত। শঙ্করের বাড়িতে কী হয়েছে বললাম। আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে কী ঘটেছে বললাম। সব শুনে ও বলল- “না রে, ওটা তুই হতে পারিস না। তোর মতো দেখতে কেউ একটা এই রকম করছে। সেদিন আমি পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম। ভাবছি, একি! ঠিক দেখছি তো! ঠিক শুনছি তো!”
– “এটাও যখন ঘটেছে, তখন আপনি ঘুমাচ্ছিলেন?”
– “সেটা ঠিক খেয়াল নেই। তবে আমি স্কুল থেকে ফিরে প্রায় দিনকেই ঘুমিয়ে পড়ি। তারপর আটটা-সাড়ে আটটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে রান্না করি।”
– “৩রা জুনের পর আর এরকম ঘটনা?”
– “এর পরের হামলা আমার এক কলিগের বাড়ি।”
– “সন্ধ্যে ছ’টার সময়? এবং তখন আপনি ঘুমাচ্ছিলেন।”
– “একদমই তাই।”
– “কলিগের বাড়িতে কী হল?”
– “এর সঙ্গে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল। ওই কলিগটির অনেক বছর বিয়ে হয়েছে, বেবি হয়নি। ও একটা বাচ্চার জন্য প্রায় পাগল হতে বসেছে। আমি নাকি ওর বাড়ি গিয়ে ওকে এইসব বেবি না হওয়া নিয়ে উল্টো-পাল্টা কথা বলে এসেছি। ঠিক কী বলেছি জানি না। সে তো আর আমার সঙ্গে কথাই বলে না। অন্য কলিগদের মুখে কানাঘুঁসো যা শুনেছি তার ভিত্তিতে বলছি। আমি কাউকে কখনও মনে আঘাত দিয়ে কথা বলি না। আমি তো ওর বন্ধু ছিলাম। কেন এসব বলতে যাব, বলুন তো?”
– “তাহলে এগুলো করছেটা কে?”
– “ব্ল্যাক-সোয়ান।”
– “মানে?”
– “সেই যে একটা রূপকথার গল্প ছিল না- সোয়ান লেক?”
– “কীরকম গল্প? গল্পটা একটু বলুন।”
– “অনেক ছোটবেলায় পড়েছিলাম তো, ভাসা ভাসা মনে আছে।”
– “যেটুকু মনে আছে সেটুকু বলুন।”
– “এক রাজকন্যাকে একজন দুষ্টু জাদুকর রাজহাঁস বানিয়ে দিয়েছিল। সে সোয়ান লেকে সোয়ান কুইন হয়ে থাকত। যদি কোনোদিন সোয়ান কুইন “ট্রু লাভ”-এর সন্ধান পায় তবেই সে আবার হাঁস থেকে রাজকুমারী হতে পারবে। সোয়ান কুইনের এক রাজকুমারের সঙ্গে প্রেম হয়। তখন জাদুকর ব্ল্যাক সোয়ানকে ওই রাজপুত্রের কাছে পাঠায়। ব্ল্যাক সোয়ান অবিকল ওই হোয়াইট সোয়ান, মানে, সোয়ান কুইনের মতোই দেখতে- শুধু একজন কালো আর একজন সাদা। রাজকুমার ব্ল্যাক সোয়ানকে সোয়ান কুইন ভেবে ভুল করবে আর ব্ল্যাক সোয়ান সেই সুযোগে রাজপুত্রকে সোয়ান কুইনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে। পরে রাজকুমারের ভুল ভাঙবে। কিন্তু, তখন তো তাদের প্রেম কলুসিত হয়ে গেছে, “ট্রু লাভ” আর “ট্রু লাভ” নেই। সোয়ান কুইনের পুনরায় মানুষ হবার পথ চিরকালের মতো বন্ধ। হোয়াইট সোয়ান তখন আর কী করে, আত্মহত্যার পথই বেছে নেয়।”
– “এই “ট্রু লাভ” বিষয়টা কী?”
– “জানি না … এই গল্প অনুযায়ী যেটা দাঁড়ায়, সারা জীবনের জন্য ফিজিক্যলি ও মেন্টালি একে অপরের হয়ে থাকাটাই “ট্রু লাভ”। জানেন, শঙ্করই ওই মেয়েটার নাম দেয় “ব্ল্যাক সোয়ান ” …
– “ব্ল্যাক সোয়ান কী উদ্দেশ্যে এসব করছে বলে আপনার মনে হয়?”
– “ও আমার কাছ থেকে আমার প্রিয় মানুষগুলোকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। তাই ও আমি সেজে আমার কাছের মানুষদের কাছে যাচ্ছে এবং যার যেটা দুর্বল জায়গা সেখানে আঘাত করে আসছে।”
– “ভাস্বতী তো আপনার প্রিয়জন নন।”
– “সেক্ষেত্রে তো টার্গেট ছিল শঙ্কর। পরোক্ষভাবে শঙ্করের ওপর আঘাত হানা।”
– “বটে। ব্ল্যাক সোয়ান কী করে জানছে বলুন তো কার কোনটা উইক পয়েন্ট, কাকে কী বললে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে?”
– “আমি সেটা কী করে জানব?”
– “আচ্ছা! এরপর ব্ল্যাক সোয়ান আর কোথায় কোথায় যায়?”
– “একদিন আমার হেড স্যারের বাড়ি। নেহাত গভমেন্ট সার্ভিস, তাই আমার চাকরিটা রক্ষা পেয়েছে। আরেকদিন সাড়ে ছ’টা নাগাদ শঙ্করের অফিসের সামনে দাঁড়িয়েছিল। শঙ্কর অফিস থেকে বেরতেই, নাকি শুধু মারতে বাকি রেখেছে!”
– “কী বলেছে?”
– “সে আমি মুখে আনতে পারব না। ওই … ও আমার জীবন নষ্ট করেছে … ইত্যাদি।”
– “শঙ্করবাবু তারপরই সম্পর্ক কেটে দেন?”
– “না, তবে খুব ভেঙে পড়েছিল।”
– “সবই ঘটছে, যখন আপনি ঘুমাচ্ছেন?”
– “মোটামুটি।”
– “টাইমটা সব ক্ষেত্রেই এক- ওই ছ’টা থেকে সাড়ে ছ’টা, তাই তো?”
– “হ্যাঁ। আরেকটা ব্যাপার। মা বলেছে, প্রমিতা বলেছে আর শঙ্কর। ব্ল্যাক সোয়ান একটা কালো রঙের কুর্তি পরে আসে। কালো রং আমি দুচক্ষে দেখতে পারি না। আমার কোনো কালো জামা নেই। এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে ওটা আমি নই। অন্য কেউ।”
– “স্ট্রেঞ্জ!”
– “এরপর এক ভয়াবহ কাণ্ড! ঠিক এক সপ্তাহ আগে ব্ল্যাক সোয়ান শঙ্করের অফিসের মধ্যে ঢুকে পড়ে। সবার সামনে যা নয় তাই বলে শঙ্করকে অপমান করে। আমাদের সম্পর্কের কথা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সবাইকে জানায়। তারপর নাকি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ! ব্ল্যাক সোয়ান চলে যাবার পর শঙ্কর হনহন করে অফিস থেকে বেরিয়ে যায় … সেদিনই মেট্রোতে ঝাঁপ দিয়ে সুইসাইড করে।”
– “ও মাই গড! আপনাকে কে খবর দিল?”
– “ওর এক কলিগ। তিনি আমাদের ব্যাপারে সবটাই জানতেন। আমার সঙ্গে শঙ্কর ওঁর আলাপও করিয়ে দিয়েছিল … ”
– “আপনার নামে পুলিস কেস হয়নি?”
– “না, ভাস্বতী এটাকে অ্যাক্সিডেন্ট বলে চালাতে চেষ্টা করছে। আত্মহত্যা প্রমাণিত হলে এল.আই.সি-র টাকাগুলো তো পাবে না।”
– “সেটা পারবে না। সি.সি.টি.ভি ফুটেজ আছে না।”
– “ওর কোন আত্মীয় মেট্রোর হর্তা-কর্তা-বিধাতা। সব ফুটেজ গায়েব হয়ে যাবে।”
– “যাক গে। সে ভালো। আপনি বেঁচে গেলেন। তো যে সম্পর্কের কারণে আপনার বাড়ি ছাড়া, সেটা যখন আর নেই তখন বাড়ি ফিরে যেতে অসুবিধা কোথায়?”
– “ওরা আমায় রাখবে কেন? একদিন দেমাক দেখিয়ে চলে এসেছিলাম …”
– “বাবা-মা তো! ওঁরা হাত বাড়িয়েই আছেন। আপনি একবার বলে দেখুন না।”
– “গেলেই বিয়ে-বিয়ে করে মাথা খারাপ করবে। মনটা যেন ভাড়াবাড়ি- একজন উঠে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা ভাড়াটেকে দিব্যি বসিয়ে দেওয়া যায়!”
– “আমি নিজে ওঁদের সঙ্গে কথা বলব। বুঝিয়ে বলব, এই মুহূর্তে আপনি বিয়ে করার মতো অবস্থায় নেই।”
– “আমি আর ঢাকুরিয়াতে যেতে চাই না। কত স্মৃতি! প্রত্যেক গলির বাঁকে বাঁকে শঙ্করের স্মৃতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এখনও আমার মনে হয়, ঢাকুরিয়া গেলেই আমার ঠিক ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। হয়তো দেখব, পাড়ার মুদির দোকানটায় দাঁড়িয়ে আছে বা টিউশনি সেরে ফিরছে। ঢাকুরিয়া লেক আমাদের খুব প্রিয় জায়গা ছিল। কতবার যে লেকের ধারে বসে বসে সূর্যাস্ত দেখেছি। কমলা রঙের আকাশকে পেছনে ফেলে এক ঝাঁক পাখি উড়ে যেত। সন্ধ্যেবেলা গাছে এসে বসত দুটো হুতুম পেঁচা। সেসব আর কোনদিন দেখা হবে না। শঙ্করকে ছাড়া যাব কী করে? আমি ওর মৃত্যুটাকে কিছুতেই কেন যে মেনে নিতে পারছি না কে জানে! বারবার মোবাইল হাতড়ে দেখি, যদি ওর কোনো মেসেজ আসে। আমি ভাবতে পারছি না, ওর সঙ্গে আমার আর কোনোদিন দেখা হবে না। কোনোদিন কথা হবে না!”
– “শান্ত হন, মিস দাশগুপ্তা।”
হংসিনীর দু-গাল বেয়ে জলের ধারা। ও ব্যাগ থেকে একটা রুমাল বের করে মুখে চাপা দিল। সুবিন্যাসও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হংসিনীকে একটু সামলে নিতে সময় দিলেন। তারপর বললেন- “কয়েকটা কথা একটু মন দিয়ে শুনবেন?”
– “বলুন।”
– “হেড স্যারের বাড়ি আপনি চেনেন?”
– “চিনি। গৃহপ্রবেশের সময় উনি আমাদের সকলকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। তখন গিয়েছিলাম।”
– “আর কলিগের বাড়ি?”
– “হুঁ। ওর লাস্টবার যখন মিসক্যারেজ হয় ওর বাড়িতে ওকে দেখতে গিয়েছিলাম।”
– “প্রমিতা কি বিবাহিত?”
– “হ্যাঁ।”
– “ওর শ্বশুরবাড়ি আপনি চেনেন?”
– “হ্যাঁ, অনেকবার গিয়েছি।”
– “অর্থাৎ ব্ল্যাক সোয়ান যেখানে যেখানে গিয়েছে সব আপনার চেনা জায়গা এবং আপনি যার যে দুর্বলতার কথা জানেন, সেও তা জানে। আপনি যখন ঘুমাচ্ছেন তখন সে সক্রিয় হচ্ছে।”
– “আপনি কী বলতে চাইছেন? ব্ল্যাক সোয়ান আসলে আমারই আরেকটা সত্তা?”
– “ঠিক তাই। সে আপনার মেমরি অ্যাকসেস করতে পারে। কিন্তু, সে কী করে আপনি জানতে পারেন না। আর ওই কালো জামাটা আপনার ঘরেই আছে, ব্ল্যাক সোয়ান কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। আপনি ভালো করে খুঁজলে ঠিক পেয়ে যাবেন।”
– “ভুল। আমি ওই মেয়েটিকে নিজে দেখেছি।”
– “কবে?”
– “৩ দিন আগে। রাতে ঘুম আসছিল না। একটু চোখটা লেগেছে, গালে সুড়সুড়ি লাগল। চোখ মেলে দেখি একটা মেয়ে খোলা চুলে আমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। চিৎকার করে উঠতেই মেয়েটি আমারই সব্জি কাটা ছুরি নিয়ে আমার ওপর চড়াও হয়। দেখুন আমার হাতের অবস্থা।”
– “সেটা আমি আপনি ঢুকতেই লক্ষ্য করেছি। মেয়েটির মুখ আপনি দেখতে পেয়েছেন?”
– “নাইট ল্যাম্প জ্বলছিল। স্পষ্ট দেখেছি, সে অবিকল আমি! পরনে একটা কালো কুর্তি।”
– “তারপর কী হল?”
– “খানিক ধস্তাধস্তির পর আমি ওর হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিই। তখন ও ছুটে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। আমি গিয়ে লাইট জ্বালালাম। আর তাকে দেখতে পেলাম না।”
– “পুলিসে খবর দেননি কেন?”
– “কী বলব পুলিসে গিয়ে? দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। সেই অবস্থাতেই ও ঢুকল, বেরিয়েও গেল।”
– “আপনি ওই মেয়েটিকে দেখেননি, হ্যালুসিনেট করেছেন। আর আপনার দুই হাতে এগুলো সেল্ফ-হার্টের চিহ্ন। মানে আপনি নিজেই নিজের হাত কেটেছেন। বুঝতে পারছেন, আপনি কতটা বিপজ্জনক সিচুয়েশনে রয়েছেন? আপনি স্রোতের উল্টোপথে হেঁটে একটা রিলেশনকে মেইনটেন করতে চেয়েছিলেন। ছোট বয়স থেকে সমাজের বিরুদ্ধে লড়েছেন। বাবা-মার বিপক্ষে গিয়েছেন। শঙ্করবাবুর পারিবারিক সব টেনশনের বোঝা নিজের কাঁধে চাপিয়েছেন। বাড়ি ছেড়েছেন। একা থাকার চাপ নিয়েছেন। অনেক স্ট্রেস গেছে আপনার ওপর দিয়ে। তার ফলাফল হল, আপনার এই মাল্টিপল পারসোন্যালিটি ডিস-অর্ডার।”
– “মানে ব্ল্যাক সোয়ান অন্য কেউ নয়? আমি-ই ব্ল্যাক সোয়ান? শঙ্করের মৃত্যুর জন্য তাহলে আমিই দায়ী? তাহলে আর এ জীবন রেখে কী হবে! আমি ওকে পাগলের মতো ভালোবাসতাম। এখনও বাসি। আমি? আমিই তাহলে ওকে মেরে ফেলেছি! আমি ওকে খুন করেছি!”
– “আপনি কেন করবেন? সে অবশ্যই অন্য কেউ। শুধু আপনি ঘুমিয়ে পড়লে সে জেগে ওঠে। এখন আপনার প্রপার কেয়ারের প্রয়োজন। একা থাকা ঠিক হবে না। আপনার জন্যও না, আপনার প্রিয় মানুষদের জন্যও না। কখন ব্ল্যাক সোয়ান আবার কাকে কী বলে আসবে, শঙ্করবাবুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান কি?”
– “না না, একদম না।”
– “তাহলে বাড়িতে গিয়ে থাকুন।”
– “বাবা-মাকে এর মধ্যে জড়াতে চাইছি না। সবটা শুনলে ওরা খুব চিন্তায় পড়ে যাবে।”
– “তাহলে রিহাবে গিয়ে থাকবেন?”
– “আমি এতটাই পাগল হয়ে গিয়েছি যে রিহাবে থাকতে হবে?”
– “এসব আপনাদের ভ্রান্ত ধারণা। রিহাবে কি শুধু পাগল থাকে নাকি? যদিও “পাগল” কথাটাতেও আমার আপত্তি আছে। অনেক সচেতন ব্যক্তি রিহাবে গিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে আরও বড় কোনো ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে। তাছাড়া, আপনি তো ভয়ানক সাফার করছেন। উপায় যখন আছে তখন নিজেকে এত কষ্ট দেওয়ার তো কোনো মানে হয় না।”
– “রিহাবে গেলে আমি ঠিক হয়ে যাব?”
– “পুরোপুরি ঠিক হতে সময় লাগবে। তবে আপনার কষ্টটা অনেকটা লাঘব হবে।”
– “ঠিক আছে। আমি রাজি। কবে থেকে থাকতে হবে বলুন।”
– “আজ থেকে থাকলেই ভালো হয়।”
– “না, সেটা কী করে সম্ভব। কাল একবার স্কুল যাই, ছুটি বন্দোবস্ত করি?”
– “স্কুল থেকে সোজা রিহাবে আসবেন। সোনারপুরে গিয়ে ঘুমাবেন না। ছ’টা বাজলেই কিন্তু সর্বনাশ।”
– “রিহাবটা কোথায়?”
– “ফুলবাগানে। আমি ঠিকানা লিখে দিচ্ছি।”
– “কত দিনের জন্য থাকতে হবে?”
– “দিন পনের তো বটেই।”
– “বাপরে এতদিন?”
– “যে রোগের যা ট্রিটমেন্ট।
আসার সময় মোবাইলটি বাড়িতে রেখে আসবেন। কারণ, রিহাবে আপনাকে মোবাইল ইউজ করতে দেওয়া হবে না। কারোর সঙ্গে দেখা করতেও দেওয়া হবে না। আসার সময় বাবা-মা কে অবশ্যই জানিয়ে আসবেন। রিহাবের ঠিকানা, ফোন নম্বর দিয়ে আসবেন। ফোনে খবর নিতে বলবেন। আপনি একটু সুস্থ হলে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হবে। শুধুমাত্র মা এবং বাবা। আর কাউকে অ্যালাও করা হবে না।”
হংসিনী সেদিনকার মতো সোনারপুরে ফিরে এল। সুবিন্যাস চেম্বার সেরে বাড়ি ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তেই গেয়ে উঠলেন- “ও হন্সিনি, মেরি হন্সিনি, কাঁহা উড় চলি? মেরে আরমানোকে পাঙ্খ লাগাকে কাঁহা উড় চলি …”

Ads code goes here


পরদিন বিকেল পাঁচটা নাগাদ ফুলবাগানের রিহাব থেকে সুবিন্যাসের মোবাইলে একটা ফোন এল- “স্যার, আমি সিস্টার সুদেষ্ণা বলছি।”
– “বলুন।”
– “হংসিনী দাশগুপ্তা বলে একজন আপনার আন্ডারে ভর্তি হয়েছে।”
– “ঠিক আছে। আমি চেম্বার করে রাত ন’টা নাগাদ আপনাদের ওখানে যাচ্ছি। ছ’টা- সাড়ে ছ’টার সময় মেয়েটির মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা একটু লক্ষ্য রাখবেন।”
চেম্বারের পর্ব মিটিয়ে রিহাবে পৌঁছতে সুবিন্যাসের সাড়ে ন’টা বাজল। গিয়ে সিস্টার সুদেষ্ণাকে জিজ্ঞাসা করলেন- “কোথায় রেখেছেন তাঁকে?”
– “স্যার, ৮ নম্বর কেবিনে।”
– “ওয়ার্ডে থাকতে চাননি?”
– “না স্যার। উনি বললেন কেবিনে থাকবেন।”
– “বেশ। সন্ধ্যে থেকে কী করলেন উনি?”
– “স্বাভাবিকই ছিলেন। বেরিয়ে নার্সদের সঙ্গে গল্প করছিলেন।”
– “ঘুমাননি?”
– “না।”
– “একজন সিস্টারকে ওঁর কেবিনে পাঠান। বলে আসতে বলুন, আমি ওঁকে দেখতে আসছি।”
কিছুক্ষণ বাদে একজন সিস্টার এসে বললেন- “স্যার, ৮ নম্বর কেবিনের মেয়েটা রেডি আছে।”
সুবিন্যাস হংসিনীর কেবিনে ঢুকলেন। হংসিনী বেডের ওপরে বসে আছে। সুবিন্যাস চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে বললেন- “কেমন লাগছে এখানে?”
– “অন্য রকম। সন্ধ্যেবেলা একজন পেশেন্ট খুব চিৎকার করছিলেন।”
– “তাই ঘুম হয়নি?”
– “নাহ, আসলে আজকাল আমার ঘুমটা কমে গেছে। ক্লান্ত থাকি। কিন্তু, ঘুম হয় না।”
– “শঙ্করবাবুর মৃত্যুর পর থেকে?”
– “হুঁ।”
– “আপনার রেস্টের প্রয়োজন। এখন ক’দিন শুধু খাবেন আর ঘুমাবেন। আমি ওষুধ লিখে দিয়ে যাচ্ছি।
আচ্ছা ভালো কথা, বাবা-মাকে বলে এসেছেন তো?”
– “এসব বলা যায়? কতখানি টেনশন করবে একবার ভাবুন।”
– “বাড়ি ছেড়ে সোনারপুর চলে আসবার সময় একবারও মনে হয়নি, ওঁরা কতটা টেনশন করবেন?”
– “কী আর বলি! তখন তো মনে হয়েছিল, আমি যা করছি ঠিক কাজই করছি।”
– “বাবা-মাকে এখন কিছুই জানাননি তাহলে?”
– “না, বলেছি, মন ভালো নেই তাই পাহাড়ে বেড়াতে যাচ্ছি। ওখানে টাওয়ার থাকে না। তাই মোবাইল বাড়িতে থাকবে।”
সেদিনকার মতো কথোপকথনের এখানেই ইতি।
সুবিন্যাস হংসিনীর জন্য কিছু কড়া ডোজের ট্রাঙ্কুলাইজার প্রেসক্রাইব করে গেলেন আর বললেন মেয়েটিকে যেন সর্বদা চোখে চোখে রাখা হয়, বিশেষ করে সন্ধ্যা ৬-৬.৩০ নাগাদ। উনি চেম্বার সেরে রোজ রাত ন’টা নাগাদ হংসিনীকে দেখতে আসবেন।

তার পরের দিন রাত্তির ন’টা।
সুবিন্যাস রিহাবে এসে শুনলেন, হংসিনী সারাদিন ঘুমিয়েছে। চারবেলা খাওয়ার সময় ওকে ঘুম থেকে তুলে খাইয়ে দেওয়া হয়েছে। একটু আগে ডিনার করে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। সুবিন্যাস সব শুনে বললেন- “ওঁকে ঘুম থেকে তুলুন। আমি কথা বলব।”
কিছুক্ষণ বাদে আবার এক সিস্টার এসে জানালেন- “স্যার, ৮ নম্বরের মেয়েটা রেডি আছে।”
সুবিন্যাস হংসিনীর কাছে গিয়ে বসলেন। হংসিনী ঘুমে ঢুলছে।
– “কেমন আছেন আজ?”
– “জানি না। শুধু ঘুমাচ্ছি আর ঘুমাচ্ছি। কোনো বোধই কাজ করছে না।”
– “বেশ। আজ আসি। আপনি বিশ্রাম নিন।”

পরের দিন সুবিন্যাস তখন চেম্বারে পেশেন্ট দেখছেন। সন্ধ্যে ৬টা। রিহাব থেকে একটা ফোন এল- “স্যার, আমি সিস্টার সুদেষ্ণা বলছি। ৮ নম্বরের মেয়েটা পালিয়ে গেছে।”
– “পালিয়ে গেছে মানেটা কী? আপনারা কী করছিলেন?”
– “আমরা তো এখানেই ছিলাম।”
– “আপনাদের চোখের সামনে দিয়ে পালিয়ে গেল?”
– “সেটাই তো ভাবছি, কী করে পালাল! আমরা দেখতেই পেলাম না!”
– “রিসেপশনের কেউও দেখতে পেল না রিহাবের ড্রেস পরে একজন বেরিয়ে যাচ্ছে?”
– “না, স্যার ওরাও দেখেনি।”
– “পুলিসে খবর দিন। কী পরিমান ট্রাঙ্কুলাইজারের আন্ডারে ও আছে জানেন তো? কিছু একটা হয়ে গেলে তার দায়িত্ব কে নেবে? আর সি.সি.টি.ভি ফুটেজ দেখুন। কীভাবে পালাল সেটা তো জানা দরকার।”

একঘন্টা বাদে আবার ফোন- “স্যার, আমি সিস্টার সুদেষ্ণা বলছি।”
– “হ্যাঁ। কী?”
– “বলছি যে সি.সি.টি.ভি ফুটেজে তো কিছু পাওয়া গেল না।”
– “খুব ভালো কথা। ক্যামেরাগুলো খুলে গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে আসুন।”
বলে সুবিন্যাস ফোনটা কেটে দিলেন।

আবার রাত আটটার দিকে ফোন। সুবিন্যাস তখন চেম্বার থেকে বেরিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছেন।
– “স্যার, আমি সিস্টার সুদেষ্ণা বলছি।”
– “আবার কী?”
– “স্যার, মেয়েটা ফিরে এসেছে।”
– “আচ্ছা! কখন ফিরল?”
– “আমরা কেউ জানি না। হঠাৎ এক আয়া মাসি দেখতে পায় ও বেডে শুয়ে আছে। গিয়ে দেখি অকাতরে ঘুমাচ্ছে। তুলে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় গিয়েছিল, কিছুই বলতে পারল না।”
– “রিসেপশনেও কেউ দেখেনি ও কখন ঢুকল?”
– “না স্যার।”
– “আর আপনাদের সি.সি.টি.ভি ক্যামেরাগুলোও তো কাজ করে না।”
– “কাজ করে, স্যার। কিন্তু, ও কোথা দিয়ে বেরিয়েছে আর কোথা দিয়ে যে ঢুকেছে!”
– “ঠিক আছে, আমি আসছি। মেয়েটিকে আর কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না। ও কিছুই বলতে পারবে না। অযথা ওকে বিরক্ত করবেন না। ডিনার করিয়ে রাখুন।”

রাত ন’টা নাগাদ সুবিন্যাস রিহাবে পৌঁছলেন।
যেতেই সিস্টার সুদেষ্ণা এসে বললেন- “স্যার, স্যার আমার মনে হয় কী জানেন? পেশেন্টটা বেড থেকে পড়ে বেডের নিচে ঢুকে গিয়েছিল। তাই আমরা খুঁজে পাইনি। পরে ঘুম ভাঙতে পেশেন্টটা আবার বেডে উঠে শুয়েছে।”
– “অতি উত্তম! পেশেন্ট বেড থেকে পড়ে যাচ্ছে আপনারা কেউ টেরই পাচ্ছেন না। উনি কি সেরকম কিছু দাবি করেছেন যে উনি পড়ে গিয়েছিলেন, তারপর উঠে শুয়েছেন?”
– “না স্যার, পেশেন্টটা তো ট্রাঙ্কুলাইজারের ঘোরে আছে। কিছুই বলতে পারছে না। বলছে, ও নাকি ঘুমাচ্ছিল।”
– “আপনারা বাথরুম-টাথরুম ভালো করে দেখেছিলেন?”
– “হ্যাঁ, স্যার।”
– “আর আপনাদের ছাদের দরজা?”
– “আমাদের ছাদ খোলা হয় না তো।”
– “পেশেন্টদের জামা-কাপড় কোথায় শুকতে দেন?”
– “আমাদের সব মেশিনে কাচা হয়। এতগুলো সুইসাইডাল পেশেন্ট! তাই আমরা ছাদ ব্যবহার করার রিস্ক নিই না।”
– “বেশ। আমি যাচ্ছি ওঁর সঙ্গে কথা বলতে।”
সুবিন্যাস হংসিনীর ঘরে গিয়ে বসলেন। হংসিনী কোনো ক্রমে উঠে বসেছে। সুবিন্যাস বললেন- “আপনার মা-বাবার ফোন নম্বরটা দিন। ওঁদের আমি দুশ্চিন্তায় ফেলব না, কথা দিচ্ছি।”
– “মনে নেই তো। মোবাইল আসার পর থেকে কোনো নম্বরই মনে থাকে না। কন্টাক্ট থেকে ডায়াল করে দিই।”
– “আপনার চেনাজানা কারোর নম্বরই মুখস্থ নেই?”
– “শঙ্করের নম্বরটা বলতে পারব।”
– “সেটা বলে আর কী হবে!”
– “হুঁ, ও মরে গেছে, না? সত্যিই মরে গেছে?”
– “মনে করে দেখুন না, একজন কারো নম্বর যদি মনে পড়ে।”
– “প্রমিতার ল্যান্ডলাইন নম্বরটা মনে আছে। তবে সেটা তো ওর বাপের বাড়ির।”
– “তাই দিন।”
নম্বরটা নিয়ে সুবিন্যাস হংসিনীর কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন। সিস্টার সুদেষ্ণাকে নম্বরটা দিয়ে বললেন- “এই নম্বরে এক্ষুণি ফোন করুন। ফোন করে প্রমিতার মোবাইল নম্বর চাইবেন।”
– “যদি জিজ্ঞাসা করে কে বলছি?”
– “মাথা খাটিয়ে কিছু একটা বলতে পারবেন না? বলবেন, প্রমিতার সঙ্গে স্কুলে পড়তেন।”
– “আচ্ছা।”

সিস্টার সুদেষ্ণা একগাদা মিথ্যে বলে প্রমিতার মায়ের কাছ থেকে প্রমিতার মোবাইল নম্বর আদায় করলেন। সুবিন্যাস সুদেষ্ণার উদ্দেশে বললেন- “যাক, জীবনে একটা কাজের কাজ করতে পেরেছেন। এবার ওই নম্বরে একটা ফোন লাগান। প্রমিতা ধরলে আমায় দেবেন।”
সিস্টার সুদেষ্ণা তাই করলেন।
– “হ্যালো, প্রমিতা দেবী বলছেন?
– “হ্যাঁ, আপনি কে বলছেন?”
– “স্যার, কথা বলুন।”
বলে সিস্টার সুদেষ্ণা ফোনটা সুবিন্যাসের হাতে ধরিয়ে দিলেন।
– “হ্যালো, আমার নাম সুবিন্যাস চট্টোপাধ্যায়, আপনার বান্ধবী হংসিনী দাশগুপ্তার সাইকিয়াট্রিস্ট।”
– “আচ্ছা, বলুন কী জানতে চান?”
– “হংসিনীর বাবা-মায়ের ফোন নম্বর।”
– “আমার কাছে তো নেই। হংসিনী দিচ্ছে না?”
– “ওঁর বাবা-মায়ের নম্বরটা যে করেই হোক আপনাকে জোগাড় করে দিতে হবে। বন্ধুর ভালোর জন্য এইটুকু করতে পারবেন আশা করি।”
– “আচ্ছা, হংসিনীর এক কাজিন দাদা আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আছে। ওর কাছ থেকে মনে হয় পেয়ে যাব।”
– “আর বিষয়টা যেন জানাজানি না হয়। মানে হংসিনীর যে ট্রিটমেন্ট চলছে এইসব। সেনসিটিভ ব্যাপার, বোঝেনই তো। এমনকি ওর বাবা-মাকেও কিছু বলবেন না। যা বলার আমি বলব। আপনি ওঁদের মোবাইল নম্বরটা পাওয়া যায় কিনা দেখুন।
– “পেলে এই নম্বরে ফোন করে জানাব তো?”
– “হ্যাঁ।”
যাওয়ার সময় সুবিন্যাস সিস্টারদের বলে গেলেন, হংসিনীর ঘরে দিবারাত্র কেউ যেন পাহারায় বসে থাকে আর প্রমিতা হংসিনীর বাবা-মায়ের নম্বর দিলে সিস্টাররা যেন নোট করে রাখেন।

ঠিক তার পরের দিন দুপুরবেলা সুবিন্যাস লাঞ্চ করতে বসেছেন এমন সময় রিহাব থেকে ফোন এল- “স্যার আমি সিস্টার মালবিকা বলছি।”
– “সিস্টার সুদেষ্ণা কোথায় গেলেন?”
– “ওর তো এখন ডিউটি নয়।”
– ” ও আচ্ছা। বলুন কী বলবেন।”
– “বলছি যে পারমিতা ম্যাডাম ফোন করেছিলেন। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন।”
– “কে তিনি?”
– “ওই তো ৮ নম্বরের বান্ধবী। ওর মায়ের মোবাইল নম্বর দিলেন আর বললেন আপনার সঙ্গে আর্জেন্ট দরকার।”
– “ও বুঝেছি। ওঁর নাম পারমিতা নয় প্রমিতা। প্রমিতাকে ফোন করে আমার মোবাইল নম্বরটা দিয়ে দিন।”
– “আর ৮ নম্বরের পেশেন্টপার্টিকে এখন কিছু জানাব না তো?”
– “না, আমি বললে তবেই যেন পেশেন্টপার্টিকে ফোন করা হয়।”
– “কিন্তু, প্রমিতা ম্যাডাম তো ল্যান্ডলাইনে ফোন করেছিলেন। ওঁর ফোন নম্বর পাব কোথায়?”
– “কাল রাতে তো সিস্টার সুদেষ্ণা একটা হলুদ রঙের খাতায় লিখে রেখেছিলেন।”
– “আচ্ছা, দেখছি স্যার।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা আননোন নম্বর থেকে সুবিন্যাসের মোবাইলে কল ঢুকল। ট্রু কলারে নাম দেখাল- প্রমিতা বিশ্বাস। ফোনটা রিসিভ করে সুবিন্যাস বললেন- “সুবিন্যাস চট্টোপাধ্যায় স্পিকিং।”
– “ডাক্তারবাবু, কাল একটা ঘটনা ঘটেছে। আমি কাকীমার নম্বরটা জানার জন্য হংসিনীর ওই দাদাকে পিং করেছিলাম। দাদা আমায় জানালেন, কাল নাকি হংসিনী ওদের বাড়ি গিয়েছিল।”
– “ক’টার সময়?”
– “৭ টা হবে।”
– “গিয়ে কী করেছেন?”
– “দাদাকে যা নয় তাই বলে এসেছে। ওর দাদার আর্ট কলেজে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। বাড়ির চাপে সেটা হয়নি, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। ও দাদাকে বলে এসেছে- “তুমি কাপুরুষ। নিজের ইচ্ছায় বাঁচ না। লড়াই করতে শেখনি। তোমার জীবনের মালিক তুমি নিজে নও। এভাবে বেঁচে তোমার কী লাভ? এর থেকে বরং তুমি মরে যাও।”
– “সর্বনাশ! ওঁর দাদা এসব শোনার পর ঠিক আছেন তো।”
– “দাদা হংসিনীকে খুবই ভালোবাসেন। এসব শোনার পর কেউ কি আর ঠিক থাকে? আমি ওঁর দাদাকে বোঝালাম, আমার সঙ্গেও ঠিক একই ব্যাপার হয়েছিল। পরে ওর আর কিছুই মনে থাকে না। এটা ওর মাল্টিপল পার্সোন্যালিটি ডিস-অর্ডার।”
– “এই রে! এত কথা বলতে গেলেন কেন? তাহলে তো হংসিনীর বাবা-মাও এতক্ষণে সব জেনে গেছেন।”
– “না না, দাদা কাউকে কিছু বলবেন না বলেছেন।”
– “আচ্ছা, দাদাকে আর একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারবেন, হংসিনী কী রঙের পোশাক পরে কাল ওঁদের বাড়িতে গিয়েছিল?”
– “হ্যাঁ, এক্ষুণি জেনে বলছি।”

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রমিতা ফোন করে জানাল, হংসিনী কালো কুর্তি পরে দাদার বাড়ি গিয়েছিল।
সুবিন্যাস রিহাবে ফোন করলেন- “৮ নম্বরের মেয়েটি কী করছে? আমি সুবিন্যাস স্যার বলছি।”
– “স্যার, ও লাঞ্চ খেয়ে ঘুমাচ্ছে।”
– “ওর ব্যাগ-ট্যাগ ভালো করে সার্চ করান, দেখুন তো কালো রঙের কোনো কুর্তি পাওয়া যায় কিনা।”

আধ ঘন্টা বাদে রিহাব থেকে ফোন এল- “স্যার, সিস্টার মালবিকা বলছি। মেয়েটির ব্যাগ সার্চ করা হয়েছে। কালো কুর্তি তো নেই।”
– “ঘরে ভালো করে খুঁজুন। কোথাও না কোথাও নিশ্চই পাবেন। আমি রাত ৯টার দিকে যাব।”

তারপর সেদিন সন্ধ্যেবেলায় সুবিন্যাস চেম্বারে পেশেন্ট দেখছেন, এমন সময়, চেম্বারের বাইরে, পেশেন্টরা যেখানে বসেন, সেখানে হঠাৎ খুব চিৎকার-চেঁচামেচি! সুবিন্যাস ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন সাড়ে ছ’টা। কী যেন একটা আশঙ্কা করে সুবিন্যাস বাইরে এলেন। এসে দেখেন হংসিনী সেই কালো কুর্তি পরে এসে চেঁচাচ্ছে। সুবিন্যাসকে দেখা মাত্রই বলতে লাগল- “আমাকে কেন আটকে রেখেছিস বুঝি না ভাবছিস? তোর তো আমার শরীরের ওপর লোভ। যতই ভালো মানুষের মুখোশ পরে ঘুরিস না কেন, আমার বুঝতে কিছু বাকি নেই। শয়তানের বাচ্চা, এত চুলকানি যখন সোনাগাছি যা না। সারাদিন আমায় ঘুমের ওষুধ দিয়ে বেহুঁশ করে রাখিস। না জানি কী কী নোংরামি করিস আমার সঙ্গে!”
বলেই হংসিনী দৌড়ে পালাল। সুবিন্যাস কম্পাউন্ডার ছেলেটিকে ডেকে বললেন- “এই নীল, দেখো তো কোথায় গেল মেয়েটি।”
একঘর পেশেন্ট আর পেশেন্টপার্টির সামনে এইভাবে অপমানিত হতে হবে সুবিন্যাস কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। এসব কথা মার্কেটে ছড়িয়ে পড়লে সুবিন্যাসকে আর করে খেতে হবে না। কিছুক্ষণের জন্য পেশেন্ট দেখা স্থগিত রেখে সুবিন্যাস নিজেকে গুছিয়ে নিতে অন্য একটা ফাঁকা ঘরে গিয়ে বসলেন। ঠিক সেই সময় রিহাব থেকে ফোন- “স্যার, আমি সিস্টার সুদেষ্ণা বলছি। ৮ নম্বরের মেয়েটি আবার গায়েব হয়ে গেছে।”
– “জানি।”
বলে সুবিন্যাস ফোনটা কেটে দিলেন। সেই সময় কম্পাউন্ডার ছেলেটি এসে ঢুকল। সে জানাল, কিছুক্ষণ পিছু করার পর ও আর মেয়েটিকে দেখতে পায়নি।

আটটার দিকে আবার রিহাব থেকে ফোন এল। ফোনটা ধরে সুবিন্যাস নিজেই বলতে শুরু করলেন- “কী? তিনি ফিরে এসেছেন, তাই তো? এবারেও তিনি কোথা দিয়ে বেরলেন আর কোথা দিয়ে ঢুকলেন আপনারা কেউ জানতে পারলেন না। তিনি হঠাৎ বেড থেকে উধাও হয়ে গেলেন। তারপর আবার হঠাৎ করে বেডের ওপর অবতীর্ণ হলেন, তাই তো?”
– “হ্যাঁ, স্যার।”
– “চুপ করুন। আপনাদের মধ্যে কেউ এমন আছেন যে ওঁকে রিহাব থেকে বেরতে সাহায্য করছেন। অথবা আপনারা সবাই সব জানেন, জেনে ন্যাকা সাজছেন।”
– “না স্যার, বিশ্বাস করুন এরকম কিছু নয়। কী হচ্ছে আমরা সত্যি কিছু বুঝতে পারছি না।”
– “আমি বলে গিয়েছিলাম তো সব সময় ওই রুমে কেউ যেন পাহারা দেন।”
– “স্যার একটা মাসি বসেছিল তো। পাঁচ মিনিটের জন্য চা খেতে গেছে, এসে দেখে সে হাওয়া।”
– “জানলা গলে ফুরুৎ করে উড়ে গেল, বলুন। বাইরে আপনারা কী করছিলেন?”
– “আমরা তো বাইরেই ছিলাম। এতজনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সে কী করে বেরল, বলুন তো?”
– “হয় আপনাদের গাফিলতি নয় আপনাদের বজ্জাতি। এনিওয়ে, আজ আমার যেতে একটু দেরি হবে। দশটা বাজবে।”

রাত দশটার সময় সুবিন্যাস রিহাবে ঢুকে সোজা গেলেন সিস্টার সুদেষ্ণার কাছে, গিয়ে বললেন- “কালো কুর্তি পাওয়া গেল?”
– “না স্যার।”
– “ঠিক আছে, ওঁকে ঘুম থেকে তুলুন। বাইরে এনে বসান। আর ওঁর বেডটা ভালো করে সার্চ করান। বেডশিট, পিলো কভার সব বদলে দিন।”
একজন মাসি হংসিনীকে ধরে ধরে এনে বাইরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। সুবিন্যাসের জন্যও আরেকটা চেয়ার দেওয়া হল। হংসিনী চেয়ারে বসে বসেই ঝিমতে লাগল। সুবিন্যাস মনে মনে ভাবছেন, ভারী আশ্চর্য ব্যাপার, সন্ধ্যেবেলায় তো মেয়েটির মধ্যে আচ্ছন্নতার কোনো নাম-নিশান ছিল না! এখন হংসিনীর যা অবস্থা, এই অবস্থায় কারো পক্ষে এত দূর আসা-যাওয়া তো সম্ভব নয়। তাহলে কি ব্ল্যাক সোয়ানের ওপর কোনো ট্রাঙ্কুলাইজার কাজ করে না?
সুবিন্যাস হংসিনীর কাছে গিয়ে বসলেন। একটু জোর গলায় বললেন- “হ্যাঁ, শুনছেন?”
হংসিনী চোখ মেলে তাকাল। সুবিন্যাস আবার বললেন- “কেমন আছেন?”
– “ভালো। এবার আমায় ছেড়ে দিন।”
– “রিলিজ দিলে কোথায় যাবেন, সোনারপুর না ঢাকুরিয়া?”
– “আমি মা’র কাছে যাব।”
– “বাড়ির জন্য মন কেমন করছে?”
হংসিনী কোনো উত্তর দিন না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
ওদিকে একজন সিস্টার ৮ নম্বর কেবিনের সামনে থেকে হাতের ইশারায় জানালেন, কিছু পাওয়া যায়নি। সুবিন্যাসও ইশারা করে হংসিনীকে কেবিনে নিয়ে যেতে আদেশ দিলেন। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, আগামী কাল সন্ধ্যে থেকে রাত অবধি তিনি নিজে এসে হংসিনীকে পাহারা দেবেন। রিহাব থেকে বেরিয়ে সেইমতো কম্পাউন্ডার ছেলেটিকে ফোন করে বললেন- “শোনো নীল, কালকে সন্ধ্যেবেলার সব অ্যাপোয়েন্টমেন্ট ক্যানসেল করো। কাল আমি চেম্বার করব না। পেশেন্টপার্টিদের ফোন করে বলো, অন্য ডেট নিতে।” সব শুনে নীল বলল- “ঠিক আছে, ডাক্তারবাবু।”


তার পরের দিন ঠিক বিকেল পাঁচটার সময় সুবিন্যাস রিহাবে এসে হাজির হলেন। সুবিন্যাসকে দেখে সিস্টাররা একটু থতমত খেয়ে গেলেন। একজন সিস্টার বললেন- “স্যার, আপনি এখন?”
– “কেন, আপনাদের খুব অসুবিধা করে দিলাম?”
– “না না স্যার, কী যে বলেন!”
– “যাক গে, ৮ নম্বরের কী খবর?”
– “স্যার ও তো সারাদিন ঘ্যানঘ্যান করছে। যখনই ঘুম ভাঙছে, বলছে “বাড়ি যাব”। একটু আগে ওকে চা আর টিফিন দেওয়া হয়েছিল। খেয়ে ঘুমিয়েছে।”
– “আচ্ছা।”
– “তুলে দেব, স্যার?”
– “না না, ঘুমাচ্ছে ঘুমাক।”
সুবিন্যাস কেবিনে ঢুকে দেখেন, একজন মাসি মেঝের ওপর বসে আছে আর হংসিনী ঘুমাচ্ছে। সুবিন্যাস ইশারা করে মাসিকে চলে যেতে নির্দেশ দিলেন। মাসি উঠে গেল। কিছুক্ষণ বাদে সুবিন্যাসের জন্য একটা চেয়ার এল। সুবিন্যাস চুপচাপ বসে রইলেন।

ঠিক সাড়ে ছ’টা। হংসিনীর ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে সুবিন্যাসকে দেখতে পেয়ে বলল- “ওহ ডাক্তারবাবু! এখন ক’টা বাজে?” বলে উঠে বসতে যাচ্ছিল। সুবিন্যাস বললেন- “না না উঠতে হবে না। আপনি বিশ্রাম করুন। এখন সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টা।”
– “ডাক্তারবাবু, বলছি কী, এখন তো আমি ঠিক হয়ে গেছি। এবার আমায় ছুটি দিয়ে দিন।”
– “বেশ তাই দেব। কাল সকালে আপনার বাবা-মা এসে আপনাকে নিয়ে যাবেন।”
– “সত্যি!”
– “হ্যাঁ, তবে এখন স্কুল করা যাবে না। বাড়িতে রেস্ট নেবেন। আর সোনারপুরের বাড়ি আপনাকে ছাড়তে হবে। এবার থেকে আপনি মা-বাবার সঙ্গে থাকবেন।”
– “ওরা আমায় রাখবে?”
– “কেন রাখবেন না!”
– “ওরা আমায় আগের মতো ভালোবাসবে, যেমন ছোটবেলায় ভালোবাসত।”
– “হ্যাঁ, বাসবেন।”
– “বাবা আমায় আবার ওই গানটা গেয়ে ঘুম পাড়াবে?”
– “হ্যাঁ।”
শুনে হংসিনী পাশ ফিরে শুল, দেওয়ালের দিকে মুখ করে। আপনমনে গাইতে লাগল- “ও হন্সিনি, মেরি হন্সিনি, কাঁহা উড় চলি? মেরে আরমানোকে পাঙ্খ লাগাকে কাঁহা উড় চলি …”

আবার রাত আটটার সময় হংসিনী জেগে উঠল। সুবিন্যাসকে দেখে বলল- “ওহ ডাক্তারবাবু! এখন ক’টা বাজে?” বলে আবার উঠে বসতে যাচ্ছিল। সুবিন্যাস বারণ করলেন। সন্ধ্যেবেলা ওদের মধ্যে যা কথপোকথন হয়েছিল রাত আটটার সময় আবার সেই একই কথাবার্তার পুনরাবৃত্তি হল। তফাত শুধু এটাই, এবারে আর হংসিনী গান গাইল না।
সুবিন্যাস বুঝলেন, সাড়ে ছটার সময় আসলে যার ঘুম ভেঙেছিল সে হল ব্ল্যাক সোয়ান। তখন ব্ল্যাক সোয়ান হংসিনী সেজে নাটক করছিল। সুবিন্যাস ঠি করলেন, সত্যিই তিনি এবারে হংসিনীকে বাড়ি পাঠিয়ে দেবেন। এদের ভরসায় এই পেশেন্টকে রাখার ঝুঁকি আর নেবেন না।
কেবিন থেকে বেরিয়ে সুবিন্যাস সিস্টাস সুদেষ্ণার কাছে গিয়ে বললেন- “৮ নম্বরে মাসিকে পাঠিয়ে দিন। আর মেয়েটির মায়ের নম্বরে এক্ষুণি ফোন করুন। করে রিহাবের অ্যাড্রেস দিন। বলুন, এখানে ওঁদের মেয়ে ভর্তি আছে। কাল সকাল দশটায় ডিসচার্জ। পেশেন্টপার্টিকে দশটার সময় আসতে বলুন। সেই সময় আমিও আসব। পেশেন্টপার্টির সঙ্গে কথা বলব। আমি আসার আগে পেশেন্টপার্টিকে যেন মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া না হয়। আমার সঙ্গে কথা হবার পর আমি ডিসচার্জ-অর্ডার লিখে দেব। তারপর ওঁরা মেয়েকে নিয়ে চলে যাবেন।”
শুনে সিস্টার সুদেষ্ণা একগাল হেসে বললেন- “হ্যাঁ স্যার, পেশেন্টপার্টিকে এখনি ফোন করে জানাচ্ছি।”
দেখে মনে হল, সিস্টার সুদেষ্ণার বুকের ওপর থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল।
সুনিব্যাস বাড়ি ফিরে এলেন। রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নানা কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আবিষ্কার করলেন নিজের বেখেয়ালে তিনি গেয়ে চলেছেন- “ও হন্সিনি, মেরি হন্সিনি, কাঁহা উড় চলি? মেরে আরমানোকে পাঙ্খ লাগাকে কাঁহা উড় চলি …”

পরদিন সকাল আটটা, সুবিন্যাস প্রাতরাশ করতে করতে খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছেন। এমন সময় রিহাব থেকে ফোন- “স্যার, আমি সিস্টার মালবিকা বলছি। ওই ৮ নম্বরের মেয়েটা আবার নিখোঁজ!”
– “মানে! কখন থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না?”
– “স্যার, ও কোলাপসিবল গেট খোলার আগেই উধাও হয়ে গিয়েছে।”
– “আমাকে কি গাধা ভাবেন? ছেলে ভোলানো গল্প শোনাচ্ছেন?”
– “স্যার, সত্যি বলছি।”
– “ওই কেবিনে তো পাহারার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।”
– “হ্যাঁ, স্যার। মাসি তো ওই ঘরের মেঝেতে বিছানা করে ঘুমাচ্ছিল। ভোর ছ’টায় ওদের শিফট চেঞ্জ হয়। তার একটু আগে মাসি ঘুম থেকে উঠে দেখে পেশেন্ট বেডে নেই! তারপর আমরা গোটা রিহাব তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। কোথাও পেলাম না মেয়েটাকে! তারপর তো কোলাপসিবল গেট খোলা হল।”
– “বাহ খুব ভালো কথা। মাসিকে ওখানে ঘুমোবার জন্য রাখা হয়েছিল? পেশেন্ট পালিয়ে গেছে ৬টার সময় আর আমায় জানাচ্ছেন আটটায়। অবিলম্বে থানায় গিয়ে একটা ডায়েরি করুন।”
– “স্যার, মেয়েটা তো আবার ফিরে আসে। থানায় যাবার কি খুব একটা দরকার আছে?”
– “পেশেন্ট ফিরে আসার আগে যদি পেশেন্টপার্টি চলে আসে তাহলে নার্সিংহোম ভাঙচুর ঠেকাতে পারবেন তো?”
– “ও … ঠিক আছে, থানায় লোক পাঠাচ্ছি।”
সুবিন্যাস সময় নষ্ট না করে সঙ্গে সঙ্গে প্রমিতাকে ফোন লাগালেন। প্রমিতা ফোন ধরে বলল- “হ্যালো ডাক্তারবাবু, গুডমর্নিং!”
সুবিন্যাস মনে মনে ভাবছেন, আর গুডমর্নিং! তিনি বললেন- “সকাল সকাল বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। আপনার কাছে হংসিনীর কোনো ছবি আছে? থাকলে আমার নম্বরে এক্ষুণি হোয়াটসঅ্যাপ করুন।”
– “কেন, কী হয়েছে ডাক্তারবাবু। ছবি তো আছে। সে আমি পাঠাচ্ছি …”
– “হ্যাঁ, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হোয়াটসঅ্যাপ করুন।” বলে সুবিন্যাস ফোন কেটে দিলেন।
অল্প সময় পরেই সুবিন্যাসের হোয়াটসঅ্যাপে হংসিনীর একটি ছবি চলে এল। সুবিন্যাস রিহাবে ফোন করে বললেন- “সিস্টার মানবিকা? আমি সুবিন্যাস স্যার বলছি।”
– “হ্যাঁ, স্যার বলুন।”
– “আপনার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে আমায় একবার পিং করুন। আমি হংসিনীর একটা ছবি পাঠাচ্ছি। পুলিসের কাছে যেন ছবিটা দেওয়া হয়। মেয়েটিকে ইমিডিয়েটলি খুঁজে বের করা দরকার।”
– “হ্যাঁ, স্যার। আমি পিং করছি আপনাকে।”
সুবিন্যাস সিস্টার মালবিকাকে হংসিনীর ছবিটা পাঠিয়ে দিলেন।

সকাল দশটা। রিহাব থেকে আবার ফোন- “স্যার, মালবিকা বলছি। ৮ নম্বরের পেশেন্টপার্টি চলে এসেছে। কী বলব ওদের?”
– “কী বলবেন সেটা আপনারা বুঝুন। পেশেন্ট আপনাদের দায়িত্বে ছিল। আপনারা পেশেন্টকে রাখতে পারেননি। এখন আমায় জিজ্ঞাসা করছেন, পেশেন্টপার্টিকে কী জবাব দেবেন!”
– “স্যার, আপনি আসছেন তো?”
– “আমি কী করতে যাব এখন? মুখ দেখাতে? নিখোঁজ ডায়েরিটা করা হয়েছে তো?”
– “হ্যাঁ, স্যার। ছবিও দিয়ে দিয়েছি।”

আবার দুপুর ১২টার সময় ফোন- “স্যার, মালবিকা বলছি। পেশেন্টপার্টি খুব ঝামেলা করছে। আপনি একবার আসুন।”
– “পুলিস ডাকুন।” বলে বিরক্তিতে ফোন কেটে দিল সুবিন্যাস।

দুপুর দুটো। রিহাব থেকে আবার ফোন এল- “স্যার পুলিস এসেছে।”
– “পেশেন্টকে এখনও পাওয়া যায়নি?”
– “না, স্যার।”

দুপুর তিনটে। আবার ফোন- “স্যার, মেয়েটির বডি পাওয়া গেছে!”
– “সেকি! কোথায় পাওয়া গেল?”
– “কাছেই একটা পুকুরে ভাসছিল, রিহাবের ড্রেস পরা।”
– “আপনারা সিওর ওটা হংসিনী?”
– “হ্যাঁ, স্যার। ওর বাবা গিয়ে লাশ সনাক্ত করেছে। স্যার এবারে একবার আসুন।”
– “আচ্ছা যাচ্ছি।”
সুবিন্যাস ফুলবাগানের উদ্দেশে রওনা দিলেন। গাড়িতে উঠে কম্পাউন্ডার নীলকে ফোন করে বললেন- “আজও চেম্বার করা হবে না। সবাইকে ফোন করে ক্যানসেল করে দাও।” নীল একটু অবাক হয়ে বলল- “আচ্ছা।”

ফুলবাগানে ঢুকতে ঢুকতে ৪টে বাজল। ইতিমধ্যে রিহাব থেকে আরেকবার ফোন এসে গেছে- “স্যার আপনি আসছেন তো?”
সুবিন্যাস চিৎকার করে বলেছেন- “আরে একটু তো টাইম দিতে হবে। উড়ে উড়ে যাব নাকি?”

রিহাবের সামনে সুবিন্যাস গাড়ি থেকে নামলেন। নামতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য তাঁর চোখে পড়ল। এই গরমেও সুবিন্যাসের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত খেলে গেল। একি দেখছেন তিনি! ঠিক দেখছেন তো? রিহাবের সামনে কুচকুচে কালো একটা হাঁস ঘুরে বেড়াচ্ছে- বাংলায় আমরা যাকে মরাল বলি। কোলকাতার বুকে এরকম একটা হাঁস, এ যে অবিশ্বাস্য! ফুটপাথ ধরে হেঁটে যেতে যেতে ওই হাঁসটা ঘাড় ঘুরিয়ে সুবিন্যাসের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ ওইভাবে তাকিয়ে রইল। সুবিন্যাস যেন স্পষ্ট দেখতে পেলেন, হাঁসটা ওঁকে দেখে একটা বাঁকাহাসি হাসছে! তারপর প্যাঁকপ্যাঁক শব্দ শব্দ করতে হাঁসটা কোথায় যেন চলে গেল। সুবিন্যাস হঠাৎ খেয়াল করলেন, তিনি আপনমনে গুনগুন করছেন- “ও হন্সিনি, মেরি হন্সিনি, কাঁহা উড় চলি? মেরে আরমানোকে পাঙ্খ লাগাকে কাঁহা উড় চলি …”

Spread the love

Best Bengali News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is Bengal's popular online news portal which offers the latest news Best hindi News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is popular online news portal which offers the latest news

One response to “রবিবারের গল্প: ব্ল্যাক সোয়ান”

  1. Joyanta Roychowdhury says:

    Just Wow…….!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement