Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / গল্প / তামাকপাতার দেঁজাভু সম্মাননা

তামাকপাতার দেঁজাভু সম্মাননা

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়:

হরেন দে ওরফে এবং হৃদয় এখন একজন মস্ত বড় কবি। তো দীর্ঘদিন কবিগিরি করার পর এবং হৃদয়ের মনে হল এবার একটা কাগজ (লিটিল ম্যাগাজিন) না করলে ঠিক মান থাকছে না। লিটিল ম্যাগাজিন করতে হলে সবার আগে চাই একটা যুৎসই নাম। কিছুদিন আগে হলেও এ-ব্যাপারে পাড়ার বাবলু বোসের শরণাপন্ন হওয়া যেত। কিন্তু, বাবলু বোস বর্তমানে লেখা-ফেকা সব ছেড়ে দিয়েছে। শোনা যায়, বাবলু বোসের বউ মেনকা মাথায় দিয়ে ঘোমটা কোন বাবাজীর কাছ থেকে “গোপনে কবিতা ছাড়াও” টোটকা এনে বরকে খাইয়েছিল।
তারপর ওয়ান ফাইন মর্নিং বাবলু বোস ঘুম থেকে উঠে বসে বলল- “আমি মুরগি কাটব।” বাড়ির সবাই ভেবে নিল, মাথাটা যেটুকু যেতে বাকি ছিল, সেটাও গেল। মেনকা মাথায় দিয়ে ঘোমটা বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগল— “ও গো, আমার একি সব্বোনাশ হল গো।” কিন্তু, না! কিছু দিনের মধ্যেই দেখা গেল, বাবলুদা পাড়ার মোড়ে “চিকন চিকেন” গুমটি খুলে মুরগি কাটতে বসে গেছে। বিক্রি-বাটাও ভালো হতে লাগল। তার ওপর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো অর্থাৎ কবিবাজী বন্ধ। ঘরের অভাব অনটন ঘুঁচল। মেনকা মাথায় দিয়ে ঘোমটা বাবাজীর কাছে ছুটল, গিয়ে বাবাজীর পায়ে পড়ে বলল— “বাবা আপনি সাক্কাৎ দেবতা। আপনার পায়ে জোড়া মুরগি ভেট চড়াব।” শুনে বাবাজী চিৎকার করে বলল— “কী! ব্রাহ্মণকে রামপাখি খাওয়াবি!” মেনকা মাথায় দিয়ে ঘোমটা ভয়ে ভয়ে বলল— “হ্যাঁ, বাবলুর দোকান থেকে খান দুয়েক ঝেড়ে এনে দিতাম।” বাবাজী বলল— “চোপ! দুর হয়ে যা এখান থেকে। তোর বর আবার কোবতে লিখুক।” মেনকা মাথায় দিয়ে ঘোমটা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল— “দয়া করুন বাবা, এমনটা করবেন না।” বাবাজী তখন আসল কথাটি পাড়লেন— “জোড়া পাঁঠা দিবি। কালীপুজোর আগে যেন পাই। মায়ের চরণে বলী দেব। যদি না দিতে পারিস, তোর পাঁঠা বরটাকে ধরে এনে পাশের পুকুরে স্নান করিয়ে একদম জয় মা মাগো ড্যাং!” মেনকা মাথায় দিয়ে ঘোমটা সুরসুর করে কেটে পড়ল। বাবাজী চেঁচিয়ে বলল— “দেখিস, পাঁঠাগুলো যেন কচি হয়।” তারপর কী হল— সে আর জেনে লাভ নেই। কারণ, পাঁঠা নিয়ে তো লিখতে বসিনি। লিখছি, লিটিল ম্যাগাজিন নিয়ে।

এবং হৃদয় সাত-পাঁচ ভেবে সেই বাবলুদার “চিকন চিকেন”-এ গিয়েই উপস্থিত হল। বলল— “ইয়ে … তুমি মুরগি কাটছ?” বাবলু বোস মুরগির পালক ছাড়াতে ছাড়াতে বিরক্তির স্বরে বলল— “না রে, গরুড়ের ডানা কাটছি।”
— “না মানে খুব সুন্দর করে কাটছ তো।”
— “এই তুই কি মুরগি কিনতে এসেছিস? না হলে ফোট এখান থেকে।”
— “আসলে আমি একটা কাগজ করব ভাবছি।”
— “তা বাড়ি গিয়ে ভাব না। এখানে কী?” তারপর বাবলুদা নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল— “কাজের সময় যত্তসব উৎপাত।” এবং হৃদয় তখনও হাল ছাড়েনি (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে গায়ের চামড়া মোটা না হলে কবি হওয়া যায় না), আবার বলতে লাগল— “তুমি যদি একটা নাম সাজেস্ট করতে!” এবার বাবলু বোস একটু ঠান্ডা হল, মুরগি কাটা থামিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর বলল— “কাগজের নাম দে “বনমোরগের বিলাপ”।
— “এটা একটা নাম হল!”
— “ও.কে.। তাহলে নাম দে “কালো মুরগি”।
— “ধ্যাৎ!”
— “তাহলে দে “বয়লার মুরগি”।
— “এই মুরগি কাটতে কাটতে তুমি নিজেই একটা মুরগি হয়ে গেছ। তোমার মাথাটাই একটা মুরগির মাথা হয়ে গেছে। আমি চললাম।”
— “এই আমি মুরগি হব কী করে রে? হলে তো আমি মোরগ হব। আচ্ছা “দিশি মুরগি” চলবে?”
এবং হৃদয় ততক্ষণে বাড়ির পথে পা বাড়িয়ে দিয়েছে।

হরেন দে তথা এবং হৃদয় ঘরে ফিরে এসে “মাই ফুট বাবলু বোস” বলে শয়নে পদ্মনাভ হল। এত দিনে কবিতার জগতের অনেক দাদা, দিদিকেই সে হাত করে ফেলেছে। এবং ফোন লাগাল এক দিদিকে। তার নাম মহুয়া। এখানে একটা কথা বলে নেওয়া দরকার, বাংলা বাজারে দাদারা অমুকদা তমুকদা ইত্যাদিদা (সে বাপের বয়সী হলেও দাদা) হলেও, দিদিরা কোনোদিন দিদি হয় না। দশ বছরের বড় হলেও মহুয়া তাই মহুয়াই। মহুয়াদি নয়। ফোন ধরে মহুয়া বলল— “অ্যাই এবং, সকাল থেকে চার বোতল বাংলা খেয়ে এখন আমি উল্টে পড়ে আছি। তুই পরে ফোন কর।” এবং হৃদয় তখন মহুয়ার পিঠ খোলা ব্লাউজ, পূর্ব ও পশ্চিম দুই বৃহৎ মেদিনীপুর ও ওয়াক্সিং করা বগলের প্রশংসাপূর্বক বলল— “নেশা করেছ তো কী হয়েছে? আমার সঙ্গে কথা বলছ তো।”
— “আচ্ছা, বল।”
— “বলছিলাম কী যে আমি একটা পত্রিকা বের করছি। ভাবছি তাতে তোমার ওই উপন্যাসটা রাখব… ওই যে সেদিন একটু একটু পড়ে শোনাচ্ছিলে… “রক্তমাখা তক্তপোষ” না কী যেন নাম? কত ওয়ার্ড হয়েছে গো?”
— “রক্তমাখা তক্তপোষ”! সে তো যাত্রার নাম হয়। আমার উপন্যাসের নাম “অস্তগামী ঋতুস্রাব”… প্রায় ৫০০০ শব্দ।” (পয়েন্ট টু বি নোটেড, পাঁচ হাজার শব্দের উপন্যাস)।
— “ওহ, ওটা তাহলে নিচ্ছি। তোমার কাছ থেকে আরও কিছু সাজেশন নেওয়ার ছিল।”
— “শোন তাহলে, বইটা একটু মোটা করে কর। প্রত্যেক কবির একটি বা দুটি কবিতা ছাপবি। বড় কবিতা হলে একটা। ছোট হলে দুটো। দাম রাখ মিনিমাম ১৫০/-। শর্ত দিবি, সকলকে এক কপি করে কিনতে হবে। আর টাকাটা অ্যাডভান্স নিয়ে নিবি। ওসব লেখক কপি-টপি দেওয়ার ঝামেলায় যাবি না। আজকাল কেউ দেয় না। দানসত্রের দিন শেষ।”
— “সে আর বলতে? আর দেখছি যদি কিছু বিজ্ঞাপন-টিজ্ঞাপন জোগাড় করা যায় কিনা।”
— “আমার এক বান্ধবী ব্রা-প্যান্টির বিজনেস করছে। ওখান থেকে তো ধর একটা অ্যাড পেয়েই যাচ্ছিস।”
— “আরে থ্যাঙ্ক ইউ!”
— “থ্যাঙ্ক ইউ”-এর কী আছে? আরেকটা কথা, একটা সাক্ষাৎকার অবশ্যই রাখতে হবে। নয়ত, কি আর কাগজের মান থাকে?”
— “ঠিক। কার ইন্টারভিউ নেওয়া যায় বলো তো?”
— “অবশ্যই টপ লেভেলের কোনো কবির। তেমন কারো সঙ্গে তোর খাতির আছে?”
— “হ্যাঁ, অমুকদার সঙ্গে তো আমার হেব্বি র‍্যাপো। রোব্বার রোব্বার করে গিয়ে ওর সারা হপ্তার বাজার করে দিয়ে আসি।”
— “ও তবে তো মিটেই গেল। অমুকদার সাক্ষাৎকার ছাপছিস। এছাড়া কয়েকটা অনুবাদ কবিতা রাখতে হবে।”
— “সেরেছে! সে আবার কোন চুলোয় পাব?”
— “আমার ওপর ছেড়ে দে। তপনকে গিয়ে ম্যানেজ করে দেব। হিব্রু ভাষার কোনো কবির অনূদিত কবিতা।”
— “অ্যাঁ! আমি তো জানতাম তপনদা স্প্যানিশ জানে। তারপর দেখলাম জাপানি কবিতাও ট্রান্সলেট করছে। “সুতরাং বকুল” পত্রিকায় আফ্রিকার কী যেন ভাষার কোন কবির কবিতা অনুবাদ করেছে! এখন হিব্রু! তপনদা ক’টা ভাষা জানে?”
— “দেখ মদ খেয়ে আছি। এত কিছু জিজ্ঞেস করিস না। সব সত্যি বলে দেব। তপন আসলে কোনো ভাষাই জানে না।”
— “মানে?”
— “হ্যাঁ, ওই নেটে সার্চ দিয়ে কোন ভাষার কী কবি আছে খুঁজে বের করে। তারপর নিজের মতো একটা কবিতা লিখে দেয়। কে আর অত দেখতে যাচ্ছে? কেই বা অত বোঝে?”
— “আচ্ছা! তাহলে অনুবাদ কবিতা থাকছে। এবার চমৎকার দেখে একটা নাম সাজেস্ট করো না।”
— “কীসের নাম?”
— “আরে আমার পত্রিকার নাম।”
— “একটু ভাবতে দে। কিছুক্ষণ পরে ফোন কর।”
এবং হৃদয় ফোন কেটে দিল। মিনিট দশেক পর মহুয়া কল করে বলল— “শোন তোর ওই কাগজটার নাম রাখ “তামাকপাতার দেঁজাভু”।
— “আহা খাসা নাম। কিন্তু, এর মানে কী?”
— “কী বললি? মানে? এতকাল কবিকুলে পেছন ঘষটে এটাও শিখলি না— মানে জিজ্ঞেস করাটা এক ধরণের অসভ্যতামো?”
— “সরি সরি ভুল হয়ে গেছে। এই নামই রাখব।”
— “বেশ। আর তোর জন্য যে এত করছি তার জন্য আমাকে কী দিবি?”
— “তোমায় একটা রাইটার্স কপি দেব। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।”
— “রাখ তোর রাইটার্স কপি। আমার “তামাকপাতার দেঁজাভু সম্মাননা” চাই।
— “ও সে হয়ে যাবে। কলেজ স্ট্রিট থেকে আশি টাকার মেমেন্ট কিনে দিয়ে দেব।”
— “শালা বেইমান! ওই আশি টাকার মেমেন্ট তোর মা-কে দিস, এমন একটা স্যাম্পেল বের করার জন্য।” এই বলে মহুয়া ঘ্যাচাং করে লাইন কেটে দিল।
হরেন দে জিভ কেটে মাথা চুলকাতে লাগল।

Spread the love

Check Also

ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’

 সৌমিককান্তি ঘোষ   কাশীনাথ বামুন গত সংখ্যার পর—   ২ “ঠাকুর এসেছে গো” উঠোন থেকে …

ধারাবাহিক ‘ভাষার ভাসান’, আজ ‘ভটভটিতে ভটচাজের বউ, আর্যর বাংলায় আগমন’

 সংকল্প সেনগুপ্ত: বাংলা ভাষা জীবনানন্দে (দাশ) যা সতীনাথে (ভাদুড়ী) তা না, হুতুমে যেমন তার থেকে …

রবিবারের কবিতা, মিহির সরকার

 মিহির সরকার মৃত  চন্দ্রবোড়া তখন আমাদের নিত্য-নতুন ভাঙা-গড়ার খেলা আমাদের নিয়ে বাতাসে বাতাসে রঙিন গল্প-বেলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *