Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / গল্প / দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্য গল্প, দ্বারকানাথের মেজদাদু

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্য গল্প, দ্বারকানাথের মেজদাদু

 দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়:

 

দ্বারকানাথের মেজদাদু

দ্বারকানাথ ভূতে বিশ্বাস করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস আবার কী? এ তো উপলব্ধি। উপলব্ধিটাই আসল।’ তবে দ্বারকানাথ ভূত-প্রেত সম্পর্কে যা বলেন তা কেবল উপলব্ধি বা অনুমানেই আটকে নেই। বরং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা! তিনি নিঃসন্দেহ যে তিনি আত্মা দেখতে পান। এই বিষয়ে তাঁর বলার ধরনটাও মজাদার। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে এসে বৌকে সটান বললেন, ‘এখনই যেন নিচে নেমো না। সিঁড়িতে তিনজন বসে আছেন।’
সাধারণত সংক্ষেপে গম্ভীর ভঙ্গিতে এ’ধরনের কথা বলে থাকেন দ্বারকানাথ। ভাবটা এমন যেন খুব স্বাভাবিক কিছু, সংসারের আর পাঁচটা দরকারি কথার মতোই। যদিও বাড়ির বেশির ভাগ লোকই তাঁর কথায় পাত্তা দেয় না। প্রকাশ্যে তো দেয়ই না। তবে মনে মনে অস্বস্তি বোধ করে অনেকেই। ফলে দ্বারকানাথের বউ যতই মুখে বলুক, ‘সিঁড়িতে যারা বসে আছে তাদের সঙ্গে আমারও দুটো কথা আছে। আমি এখনই নিচে নামছি।’ কিন্তু তক্ষুণি তক্ষুণি নিচে নামতে পারে না। এটাওটা কথা ব’লে, টিভিতে কী হচ্ছে তা খানিক দাঁড়িয়ে দেখে, এভাবেই খানিক সময় ব্যয় করে তবে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। আসলে দ্বারকানাথের কথা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া কারও পক্ষেই সম্ভব না। দ্বারকানাথের কথার মধ্যে কেমন একটা জোর আছে!
যেমন, তাঁর বক্তব্য হল তাঁদেরই এক পূর্বপুরুষ তাঁদের এই বাড়িতে এখনও আছেন। মানে তিনি সশরীরে না থাকলেও তাঁর আত্মা স্থানত্যাগ করেনি। এই কথা দ্বারকানাথ তাঁর বাড়ির সকলকেই বলেছেন। সকলকে বলতে তাঁর মা, বউ, মেয়ে, জাড়তুতো খুড়তুতো দাদা আর ভাই, ও তাদের পরিবার মানে স্ত্রী’রা। যথারীতি সকলে একথায় যেমন আধা অবিশ্বাস করে থাকে, তেমনি আধা বিশ্বাসও করে। এই যেমন সেদিন ছিল সত্যনারায়ণ পুজো। পুজোর ফুল মালার সঙ্গে পূর্বপুরুষদের ছবিতে পরানোর জন্যও মালা আনা হয়েছে। পূর্বপুরুষদের তালিকা লম্বা। পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, পিতামহেরা দুই ভাই, দ্বারকানাথদের বাবা কাকা জ্যাঠা। এদেরই মধ্যে ‘তিনি’ও রয়েছেন, দ্বারকানাথের মতে যাঁর আত্মা এখনও এ’বাড়ি ছাড়েনি। যাক গে, আসল কথা হল পুজোগন্ডার দিন, পূর্বপুরুষদের ফ্রেমে বাঁধানো ছবিগুলোতে মালা পরাচ্ছেন দ্বারকানাথের ভাই। একটা কাঠের চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে সে কাজ সারছেন তিনি। কিন্তু নির্দিষ্ট ছবির সামনে চেয়ার নিয়ে যেতেই দ্বারকানাথ বলে বসলেন, ‘দেখিস তোর মতো অবিশ্বাসীকে মেজদাদু যেন আবার ঠেলে ফেলে না দেন!’
বলে রাখা ভালো যে, দ্বারকানাথদের দাদু ছিলেন এ বাড়ির বড় ছেলে। পরের ভাই হলেন ইনি, মানে যাঁকে নিয়ে দ্বারকানাথের বিশেষ বিশ্বাস এবং অন্যদের আধা অবিশ্বাস। যেহেতু তিনি দ্বারকানাথের দাদুর মেজ ভাই তাই মেজদাদু। দ্বারকানাথের ভাই বলল, ‘ঠিক বলেছিস! আজই প্রমাণ হয়ে যাবে আত্মা আছে কি নেই। দেখি আমায় কেমন করে ঠেলে ফেলতে পারেন মেজদাদু!’
একথা বলতে বলতেই দ্বারকানাথের খুড়তুতো ভাই অনাথনাথ চেয়ারে উঠল। রজনীগন্ধার মালাটা ছবির গলায় পরানোর সুবিধের জন্যই চেয়ারের একটা হাতলে পা দিল। খানিক আগে ঠিক যেভাবে আগের ছবিগুলোতেও মালা পরিয়েছিল। সব ঠিকই ছিল। বেশ কথা বলতে বলতেই, কোনও কিছুর ভ্রূক্ষেপ না করেই কাজ সারছিল। কিন্তু দুই হাতলে দাঁড়িয়ে একটা কাপড়ের টুকরো দিয়ে ছবিটা পরিস্কার করতে যাবে, এমন সময় ডান দিকের হাতলটা ফটাস শব্দে ভাঙল। ভূপতিত হচ্ছেন বুঝে পড়িমরি ছবিটাকে আঁকড়ে ধরল অনাথ, এতে ছবির কাঁচ ভাঙল। এত করেও টাল সামলাতে পারল না অনাথনাথ। সজোরে পড়ল পাথরের মেঝেতে। সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝনিয়ে ভাঙল ফ্রেম, কাঁচ। ঈশ্বরের কৃপায় হাত পা ভাঙল না, মাথাও ফাটল না। এমনকি কাঁচে গা হাত পাও কাটল না অনাথনাথের। তবে ব্যথা হল খুব। রাত্রে জ্বর এল। তিনদিনের জন্য বিছানা নিলেন অনাথনাথ।
এই ঘটনার পর থেকে মনে যতোই দ্বিধা থাকুক দ্বারকানাথের কথায় অবিশ্বাস করতে ভয় পায় সকলেই।
মেজদাদুকে নিয়েই সম্প্রতি আরও এক ঘটনা ঘটে গেল দ্বারকানাথদের বাড়িতে। সেটা বিজয়ার দিন। পাড়ার প্রতিমা নিরঞ্জন হয়ে গেছে। দু’চারজন যারা বিজয়া করতে আসার তারাও ঘুরে গেছে। দ্বারকানাথরা তিন ভাই একটু মদ্যপান করতে বসেছেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে দ্বারকানাথই একমাত্র ধূমপান করেন। দুই পেগ শেষ করার পর তিনি বললেন, ‘যাই, একটা সিগারেট খেয়ে আসি।’ আসলে ঘরে এসি চলছে। তাই ঘর লাগোয়া ছাদে গিয়ে সিগারেট খেয়ে আসাই সমীচীন মনে করলেন দ্বারকানাথ। দ্বারকানাথের দাদা তাঁকে বললেন, ‘আর একটা পেগ খেয়ে যা।’ দ্বারকানাথ এমনিতে ধীরেসুস্থে মদ খান। স্কচ খান। জল থাকে না। এক পেগ পানীয়ে চার-ছ’টা বরফ। বরফগুলো চুঁয়ে চুঁয়ে পানীয়ের সঙ্গে মিশবে আর আলতো করে চুমুক দেবেন। এক্ষেত্রে অবশ্য বাধ্য ছেলের মতো অগ্রজের আদেশ মেনে আরও এক পেগ হাতে তুলে নিলেন তিনি। তারপর সাধারণ নিয়মের সামান্য পরিবর্তনে তুলনায় কিছুটা গতিতে নিজের পেগ শেষ করতে লাগলেন দ্বারকানাথ। তাঁর অগ্রজ ও অনুজ যে সময়ে তিনটি পেগ শেষ করেন সেই সময়ে একটি পেগ শেষ করতে পারেন দ্বারকানাথ। তাঁর পান করার ধরনটাও অন্যদের চেয়ে আলাদা। প্রতি পেগের শুরুতে একবার করে মা’কে স্মরণ করেন দ্বারকা। মা মানে জননী নয়, জগন্মাতা। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে, যাকে বলে নাভি থেকে শব্দ করা, সেভাবে ‘মা’ শব্দ উচ্চারণ করেন দ্বারকা। এদিনও তাই করলেন তিনি। ছোট ভাই বলল, ‘আঃ কী যে করিস না! গায়ে কাঁটা দেয়!’
এমন সময় ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ঘরে ঢুকল। তাঁর দুই হাতে দুটো থালা ধরা। এক হাতের থালায় মৌরলা মাছ ভাজা, অন্যটায় টুকরো টুকরো করে কাটা ডিম সেদ্ধ। অনাথনাথ তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘মেজদা’র জন্যে কী ব্যবস্থা?’
মেজদা মানে দ্বারকানাথ অবশ্যই। দ্বারকা আসলে শাকাহারী। সে কারণেই এমন প্রশ্ন অনাথের। দ্বারকা আর অনাথের বড়দা হল কেদারনাথ। যাঁর কথায় বর্তমানে নিয়ম ভেঙে তৃতীয় পেগ পানে ব্যস্ত দ্বারকা। অনাথের স্ত্রী বললেন, ‘মেজদার ব্যবস্থা দিদি আনছে।’


দিদি মানে দ্বারকার স্ত্রী’ই বটে। অর্থাৎ কিনা অনাথের স্ত্রী সর্বমঙ্গলার জা। বলতে বলতেই একটা জামবাটিতে করে আদা আর নুন দিয়ে মাখা কল বেরনো ভেজা ছোলা আর মাখন দিয়ে নাড়া আলু মরিচ নিয়ে ঘরে ঢুকল দ্বারকার স্ত্রী উমা। তাঁর পিছু পিছু এল বাড়ির বড় বউ কাত্যায়নী। সবাই এসে পড়ায় দ্বারকা বললেন, ‘সকলেই এসে পড়ছ দেখছি। তোমাদের সকলকে একটা জরুরি কথা বলার আছে। এই পেগটা শেষ করে একটি সিগারেট খেয়েই সে কথা বলব।’
সর্বমঙ্গলা বললেন, ‘কী হয়েছে দাদা?’
দ্বারকা বললেন, ‘এ বাড়ির অবিশ্বাসীরা যাই বলুক বৌমা, আজ তিনি আসবেন!’
সর্বমঙ্গলা বললেন, ‘কে দাদা? কে আসবেন?’
উমা আর কাত্যায়নী দুজনেই নিচু গলায় তাঁদের ছোট জা’কে বুঝিয়ে দিলেন, ‘তিনি মানে তিনি। কে তিনি জিজ্ঞেস না করাই ভালো।’
আধো অন্ধকার ঘর। কারও মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। একটি ছোট নীল আলো এঘরকে মায়াবী করে তুলেছে। যাকে বলে মদ্যপানের জন্য যথাযথ। তার সঙ্গে দ্বারকার এমন অতিজাগতিক কথা ঘরটাকে ভৌতিক চেহারা দিয়েছে বলা বাহুল্য। তদুপরি দ্বারকানাথদের পুরনো কালের দোতলা বাড়ি। দোতলায় দুটো ঘর। ঘর লাগোয়া টেরেস। বাড়ির সামনে একটা বিরাট ইদারা। বাড়ির সামনে ও পিছনে অসংখ্য গাছ। ভুট্টা, আতা, দেবদারু, আম, জামরুল, নারকোল… কী নেই? তবে আজ আকাশ পরিষ্কার। বিজয়া দশমীর চাঁদ উঠেছে। এই সময় হালকা ঠাণ্ডা পড়ে মধুপুরে। এবার ততো পড়েনি অবশ্য।
এতক্ষণে দ্বারকার তৃতীয় পেগ শেষ। অন্তিম চুমুকটি দিয়ে আরও একবার ‘মা’ উচ্চারণ করে উঠে দাঁড়ালেন দীর্ঘদেহী দ্বারকানাথ। বললেন, ‘তোমরা দেখে নিও। আজ তিনি আসবেন।’
ঠিক এই সময় একটি বক সম্ভবত দিকভুল করে ঘরের কাঁচের জানলায় দড়াম করে ধাক্কা খেল। দ্বারকানাথ ছাড়া বাকি সকলে চমকে উঠলেন। দ্বারকা বললেন, ‘বৌমা তিনি আসছেন। প্রস্তুত হও।’ এই বলে দ্বারকা বাড়ির পিছন দিকের ছাদে চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। যাঁরা ঘরে বসে আছেন তাঁরা ঘর থেকেই শুনল দ্বারকা ছাদে দাঁড়িয়ে ‘জয় মা, জয় মা’ ধ্বনি দিচ্ছেন। অনাথের স্ত্রী বাড়ির ছোট বউ। সে নতুন বলেই হয়তো খানিক আদুরে। এইবেলা ঘরে দ্বারকানাথ নেই দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কে আসবেন? দাদা যে বললেন, তিনি আসবেন। কে আসবেন বড়দা?’
কেদারনাথ বললেন, ‘দ্বারকা নিশ্চয়ই মেজদাদু মানে লক্ষ্মীবাবুর কথা বলছে।’
ঘরে ফিরলেন দ্বারকানাথ। উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘আমার মোবাইল? আমার মোবাইলটা কোথায়?’
অনাথনাথ বলল, ‘কী করবি মোবাইল দিয়ে?’
‘ছবি ছবি….!’
‘কিসের ছবি?’
আবছা আলো হাতড়ে মোবাইলটা পেলেন দ্বারকানাথ। ঘর থেকে প্রায় ছুটে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, ‘ছাপ, পা, ছাপ…!’
উমা তাঁর স্বামীকে অনুসরণ করতে যাচ্ছিল। বাধা দিলেন, কেদারনাথ। বললেন, ‘যেও না মেজ বৌমা। অপেক্ষা করো।’
থমকালেন উমা।
একটু পরেই ফিরে এলেন দ্বারকানাথ। শান্ত, সমাহিত মুখ! অনাথের দিকে ছুঁড়ে দিলেন মোবাইলটা। বললেন, ‘দেখ, ছবিটা দেখ। আর আমার জন্যে আর একটা বানা। পাতিয়ালা।’
বোঝাই যাচ্ছে খুশি দ্বারকানাথ। সবাই ফোনের ওপর ঝুঁকে দেখতে গেলেন ছবিটা। একজোড়া পায়ের ছাপের ছবি। মানুষের পায়ের ছাপ মনে হলেও মানুষের পায়ের পাতার চেয়ে অনেক বড়। দ্বারকা বললেন, ‘মেজদাদু এসেছিলেন। তাঁর পায়ের ছাপ রেখে গেছেন! তাও আবার বিজয়ার দিন! তোমরা প্রণাম করো। আমার বিশ্বাস কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি আবার আসবেন।’
এখানে বলে রাখা ভালো যে, দ্বারকা ছাড়া এ বাড়ির আর কেউ অশরীরী মেজদাদুকে দেখেনি এমন নয়। আরেকজন দেখেছিলেন নিশ্চয়ই। তবে তিনি আজ আর বেঁচে নেই। তিনি হলেন দ্বারকানাথদের ঠাকুমা আঙুরবালা। আঙুরবালা অবশ্য লক্ষ্মীনারায়ণের জীবদ্দশাতেও তাঁকে দেখেছেন। তিনি ছিলেন লক্ষ্মীর প্রিয় বৌঠান। আর লক্ষ্মী তাঁর স্নেহের মেজ ঠাকুরপো। আঙুরবালার মেজঠাকুরপোটি চিরকালই অন্যরকম ছিলেন। যৌবনে যুদ্ধে গেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। যুদ্ধ শেষে আহত অসুস্থ শরীর নিয়ে যখন ঘরে ফিরলেন তখন তাঁর পিতা গত হয়েছেন। সংসারের ভার গেছে বড়দার হাতে। পিতার ব্যবসা তখন ফুলেফেঁপে উঠেছে। পিতার তো ছিলই, এখন বড়দারও খুব নাম-যশ-প্রতিপত্তি। ফিরে এসে পিতৃবিয়োগের কথা শুনে শিশুর মতো কেঁদে ভাসিয়েছিলেন লক্ষ্মীনারায়ণ। মা’কে প্রণাম করতে গেলে মা পা সরিয়ে নেন। বেজায় অবাক হন লক্ষ্মী। এরপর দাদাকে প্রণাম করতে গেলে দাদাও মা’কে অনুসরণ করলেন। লক্ষ্মীনারায়ণ জানতে চাইলেন, ‘আমার অপরাধ?’
বড়দা বললেন, ‘তুমি যুদ্ধে গেছ। ম্লেচ্ছদের সঙ্গে অন্নজল নিয়েছ। তোমার জাত গেছে লক্ষ্মীনারয়াণ। আরও শুনে নাও, মা চান না তুমি এ’বাড়িতে থাকো।’


লক্ষ্মী অধোবদনে দাঁড়িয়ে থাকেন। বলেন, ‘বড়দা আপনার কী মত?’
‘মায়ের মতামতের ওপরে আমার কোনও মত নেই লক্ষ্মী। তা তো তুমি জানো। তাছাড়া গৃহে নারায়ণ রয়েছেন। লক্ষ্মীর ঝাঁপি রয়েছে। বাড়িতে দুর্গা পুজো হয়, জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। তোমার এখানে থাকা কি চলে? নিজেই বলো।’
জবাবে কী বলবেন ভেবে না পেয়ে মাথা নিচু করে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন লক্ষ্মীনারায়ণ। বড়দা বুঝতে পারলেন ভাইটি কি বলতে চায়। এতদিন পর দেশে ফিরে সে যাবেটা কোথায়?
নিরবতা ভেঙে মীমাংসা দিলেন লক্ষ্মীর বড়দাদাই। বললেন, ‘চিন্তা কোরো না। আমাদের শিব মন্দিরের পাশের জমিতে তোমার জন্যে দোতলা দালান দিয়ে রেখেছি। নদীর ধারে সুন্দর বাড়ি। তুমি ওখানেই থাকবে। আর তোমার খাওয়াদাওয়ার ব্যপারটা তোমার বৌঠান দেখে নেবেন। নিশ্চিন্তে থেকো।’
বড়দা সেদিন লক্ষ্মীর বাসস্থানের সমস্যার সমাধান করে ছিলেন ঠিকই তবু পিতৃগৃহ ছেড়ে, মায়ের সঙ্গ ছেড়ে যেতে বুক ফেটে গিয়েছিল লক্ষ্মীনারায়ণের। মা বা দাদাকে কিছু বলতে পারতেন না যদিও। যত ক্ষোভ, যত অভিমান সব গিয়ে পড়ত বৌঠানের উপর। স্বভাবতই সিংহফটক দিয়ে বাড়িতে ঢোকার অনুমতি ছিল না লক্ষ্মীনারায়ণের। আসতেন পিছনের খিড়কি দরজা দিয়ে। বৌঠানের কাছে পাত পেড়ে খেতেন দু’বেলা। মুড়ি চিড়ে বেঁধে নিতেন কোচোড়ে। আফিম খাবেন বলে এক আনা দু’আনা বাগিয়ে নিতেন বৌঠানের থেকে। যে সিংহফটক দিয়ে প্রবেশের অনুমতি ছিল না লক্ষ্মীর। সেদিকের সাজানো বাগানে ময়ুর ঘুরে বেড়ায়, আকাশে মেঘ দেখলে পেখম মেলে নাচে সেই সুন্দরী পাখী! আর গ্যারেজে কতরকম বিলিতি গাড়ি! কোনওটা ছোট তো কোনওটা বড়। কয়েকটা আবার হুড খোলা। কিন্তু আগেই তো বলা হয়েছে যে ওদিকে লক্ষ্মীর প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু একদিন সেই সদর দিয়েই লক্ষ্মীর উদ্দাম প্রবেশ! উদোম অবস্থায়! এসেই হাঁক পাড়লেন, ‘ও বৌঠান, বৌঠান…।’ তাঁকে দেখে তো বৌঠান মুখ ঢাকলেন লজ্জায়। উপস্থিত ঝিয়েরাও ঘোমটায় মুখ ঢাকল। চাকরেরা দৌড়ে গেল লক্ষ্মীকে ঠেকাতে। তারা বলল, ‘একী করেচেন মেজবাবু! কী হয়েচে আপনার?’
লক্ষ্মীনারায়ণ বললেন, ‘বৌঠান আমায় কাপড় দাও।’
ততক্ষণে তাঁর স্বামীর দুখানা ধুতি আর নিজের দুটো সুতির শাড়ি নিয়ে এসেছেন আঙুরবালা। বললেন, ‘গেল হপ্তাতেই তোমায় কাপড় দিয়েছি ঠাকুরপো। কী দশা করলে সেগুলোর শুনি?’
‘একজনকে দিয়ে দিয়েছি বৌঠান। আমায় দেবার জন্যে তবু তুমি আছ। তার তাও নেই।’ বললেন লক্ষ্মীনারায়ণ।
আঙুরবালা বুঝলেন তাঁর এই পাগল দেওরটিকে কিছু বলে লাভ নেই। মনে মনে সে এখনও বালক!
এভাবেই আমৃত্যু নিজের জন্মভিটেয় প্রবেশাধিকার ফিরে পাওয়ার উদগ্র বাসনায় দগ্ধ হয়ে ছটফট করেছিলেন লক্ষ্মীনারায়ণ। তারপর বহু বছর কেটে গিয়েছে, লক্ষ্মীনারায়ণ প্রয়াত হয়েছেন। একরাতে প্রিয় ঠাকুরপোর অশরীরী রূপ দেখেন আঙুরবালা। দেখেন লক্ষ্মীর চোখ দুটো রাগে ভাটার মতো জ্বলছে। ‘ঠাকুরপো, ঠাকুরপো তুমি!’ বলতে বলতে সম্বিত হারান আঙুরবালা।
আঙুরবালাও শ্বশুরের ভিটের মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন বছর পঁচিশ হল। তবে আজও প্রাসাদসম এবাড়ির ছাদে, দালানে, পিছনের জঙ্গলসম ফলের বাগানে লক্ষ্মীনারায়ণের অস্তিত্ব টের পান দ্বারকানাথ।
দ্বারকানাথদের পানীয়গ্রহণ পর্ব শেষ হয়েছে। পায়ের ছাপের কোনও ব্যখ্যা অনাথনাথের কাছে নেই। অনেকক্ষণ এসি চলার পর ঘরটা বেশিমাত্রায় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে যেন! বাইরের বাতাসও কি হঠাৎ একটু বেশিই শীতল হয়ে উঠল! রাতের আকাশে মেঘ জমেছে। ফলে চাঁদ সাময়িক আড়ালে। যদিও দ্বারকানাথের থেকে মেজদাদু লক্ষ্মীনারায়ণের এমন গল্প শুনে তিন বৌয়ের মনে এখন ততো ভয় নেই। পরিবর্তে মানুষটার জন্য খানিক বেদনাই বোধ করছে তারা।
দ্বারকানাথ ও তার পরিবার এখন ঘর লাগোয়া টেরেসে এসে বসেছে। রাত নিঝুম। দুরে কোথাও রামনাম সংকীর্তন হচ্ছে। বাতাসে মিশে ভেসে আসছে সেই সুর। আর শোনা যাচ্ছে ছোটনদীর স্রোতের একটানা শব্দ।
ওইদিকেই ছিল লক্ষ্মী নারায়ণের বাড়ি। এখন সেটি স্কুল। আশ্চর্য, অদেখা অজানা মৃত মানুষটার কথা ভেবে তিন বৌয়ের চোখ জল! অনাথনাথ চুপ, কেদারনাথও। এমন সময় দ্বারকানাথ দেখলেন, তিনতলার ছাদে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁর মেজদাদু লক্ষ্মীনারায়ণ। প্রশান্ত চেহারা। প্রসন্ন মুখের অভিব্যক্তি।
দ্বারকানাথ মাথা নিচু করে করজোড়ে প্রণাম করলেন লক্ষ্মীনারায়ণকে। বললেন, ‘বৌমা তিনি এসে গেছেন!’

Spread the love

Check Also

তামাকপাতার দেঁজাভু সম্মাননা

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়: হরেন দে ওরফে এবং হৃদয় এখন একজন মস্ত বড় কবি। তো দীর্ঘদিন কবিগিরি …

বামেশ্বরের সেকেন্ড ম্যারেজ

 নীলার্ণব চক্রবর্তী রোজই দ্বিপ্রহরে ঝিলে স্নান করতে যান বামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। আর তার পিছন পিছন ধাওয়া …

লাল ডায়রি, দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প

 দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় লাল ডায়রি  অফিসে পৌঁছে রিসেপসনে রোজই খানিকটা সময় কাটায় মেঘ। রিসেপসনিস্ট রায়না, ওর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *