Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / রবিবারের গল্প, ‘মেরা মেহেবুব আয়া হ্যায়’

রবিবারের গল্প, ‘মেরা মেহেবুব আয়া হ্যায়’

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়

 

মেরা মেহেবুব আয়া হ্যায়

“দিদিমুনি ও দিদিমুনি, দরজা খোলো!”
হরিকাকার গলা। হরিকাকা এ-বাড়িতে আছে বাহারের জন্মের আগে থেকে। কোথায় তার দেশ, কে কে ছিল তার পরিবারে এ-সব কথা হরিকাকা নিজেই আজ বিস্মৃত। বাহার যখন দুধের শিশুটি, হঠাৎই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বাহারের মা ইহলোক ছেড়ে চলে যান। তারপর থেকে এই বাড়ি-ঘর-দোর, এই সংসার গুছিয়ে রাখার দায়িত্ব পালন করে চলেছে এই হরিকাকা। গত বছর বাবাও চলে গেলেন। তারপর থেকে এই বিশাল বাড়ির ওপরতলাতে মাত্র দুটি প্রাণী— বাহার আর হরিকাকা। নিচের তলায় যদিও বেশ কয়েক ঘর ভাড়াটিয়া আছে। কিন্তু, তাদের ওপরে আসার হুকুম নেই। বাহার শুধু মাঝে মাঝে তাদের তীব্র কলহ, পুজোর কাঁসর-ঘন্টা, তারস্বরে বাচ্চার কান্না, সন্ধ্যেবেলার টিভি সিরিয়ালের শব্দ —এসবই শুনতে পায়। তাদের সঙ্গে মেশার কথা বাহার দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারে না। এমনিতেই বাহার একটু একা থাকতে ভালোবাসে। পার্টি-হুল্লোড় এসবেও তার কোনো আসক্তি নেই। তবে মদ, গাঁজা, মারিহুয়ানা এ-সবে নেশা তেমন না থাকলেও এর কোনোটিতেই আপত্তি নেই বাহারের। মাঝেসাঝে খায়-টায়। এক কথায় বলতে গেলে বাহার পুরোপুরি ভাবে অসামাজিক একটি মেয়ে।

মোবাইলটা তুলে বাহার দেখল, তখন সবে মাত্র রাত দশটা। এর মধ্যেই খাবার ডাক পড়ে গেল! বাহার কোনোদিনই রাত এগারোটার আগে ডিনার করে না। খাওয়ার পর অনেক রাত্তির অবধি জেগে থাকে। বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে। অবশ্য বেড়াতে গেলে বাহারের আর এই রুটিন থাকে না। তখন সে ভোর ভোর উঠে পড়ে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রেডি হয়ে নেয়। ভোর থেকে শুরু করে যতক্ষণ রাস্তায় মানুষজন থাকে ততক্ষণ সে টই টই করে ঘুরে বেড়ায়। বাহারের অসম্ভব বেড়ানোর নেশা। সারা পৃথিবী ঘুরে দেখতে চায় সে। সেই জন্য, বাহার, বিয়ে তো দূর অস্ত, কোনো সম্পর্কে জড়াতেও অনিচ্ছুক। তবে বেশ কয়েকটি ওয়ান-নাইট-স্ট্যান্ড তার জীবনে এসেছে। তা নিয়ে বাহারের কোনো ট্যাবুও নেই। সে একা একাই দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ায়। কলেজ জীবন থেকেই বাহার অনুভব করে যে তার পায়ের তলায় সরষে আছে। প্রথম প্রথম হাত-খরচের টাকা জমিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে সে ঘুরে বেড়াত। বলা বাহুল্য যে বাহার হাত-খরচ হিসেবে খুব একটা কম টাকা পেত না। ওদের অঢেল পয়সা আর অগাধ সম্পত্তি। তারপর বাহারের বাবা তাকে ডেকে একদিন বললেন— “তোমার শখ-আহ্লাদে আমি কোনোদিন হস্তক্ষেপ করব না। যেমন ভাবে বাঁচতে চাও বাঁচো। শুধু এটুকুই বলব, যেখানেই যেও, বলে অন্তত যেও। এ-ভাবে চিন্তায় ফেলে চলে যেও না।”

যাইহোক, বাহার গিয়ে দরজা খুলল। হরিকাকা ঘরের মধ্যে ঢুকে এসে ফিসফিস করে বলল— “ওপরতলায় একজন ভাড়াটে রাখবে বলেছিলে, একটা ছেলে ঘর দেখতে এসেছে।” বাহার শুধরে দিয়ে বলল— “পেয়িং গেস্ট।” এত রাতে ঘর দেখতে এসেছে শুনে বাহার বেশ অবাক হল। বাবা চলে যাবার পর থেকে হরিকাকা মাঝে মাঝেই ঘ্যানঘ্যান করত— “ওপরতলাটা যেন খাঁ খাঁ করে।” তার ওপর বাহারের এমন ঘুরতে যাওয়ার নেশা! বাহার না থাকলে তো হরিকাকা একদম একা। এ-সব কারণে বাহার ঠিক করে ওপরতলার গেস্টরুমে একজন পেয়িং গেস্ট রাখবে। ওই ঘরে অ্যাটাচড বাথও আছে। অসুবিধা হবে না। কোনো সিঙ্গেল ছেলে বা মেয়েকেই ও রাখবে। বিবাহিত দম্পতি মানেই ক্যাচাল। দিন-রাত ঝগড়া করবে, দালানময় বাচ্চা দৌড়ে বেড়াবে, যখন তখন বাচ্চা কাঁদবে, বউটি গায়ে পড়ে বাহারের সঙ্গে আলাপ জমাতে আসবে। ওরে বাপরে বাপ! এ-সব ভাবলেই বাহারের দমবন্ধ হয়ে আসে। তাই পেয়িং গেস্টই ভালো। তাকে রান্না-বান্না করার জন্য আলাদা রান্নাঘর দেবারও ঝামেলা নেই। সে তার মতো থাকবে। বাহার বাহারের মতো।

বাহার হরিকাকাকে বলল— “তুমি যাও। আমি আসছি।” হরিকাকা গেল না, দাঁড়িয়ে রইল। মুখ দেখে মনে হল হরিকাকা যেন আরও কিছু বলতে চায়। বাহার বলল— “কী? আর কিছু বলবে?” হরিকাকা আরও খানিকটা ঘরের মধ্যে ঢুকে এসে, আরও গলা নামিয়ে বাহারের কানে কানে বলল— “শ্বেতীরুগিদের মতো ফ্যাটফ্যাটে সাদা। ভূতের মতো চেহারা। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি না কী যেন নাম বলল। নির্ঘাত কেরেস্তান। শোর-গরু সব খায়। দূর করে দাও। দূর করে দাও।” বাহার বুঝল, কেরেস্তান মানে হল খৃস্টান। বাহার নিজেও যদিও শুয়োর-গরু সবই খায়। বিদেশে গেলে তো খায়ই। দেশেও খায়। বাহার সব শুনে একটি মাত্র বাক্য উচ্চারণ করল— “দেখছি।”

বাহার জানে ছেলেটিকে কোথায় বসানো হয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ওপরতলায় ঢোকার যে দরজা, সেই দরজা দিয়ে ঢুকলেই পাশে একটি ছোট অথচ রাজকীয় সোফা-সেট রাখা আছে। তার পাশেই গেস্টরুম। সোফার পিছনের দেওয়ালে বাহারের কোনো এক পূর্বপুরুষের রাজবেশ পরিহিত বিশাল তৈলচিত্র। তিনি কে ছিলেন, তাঁর নাম কী— কোনো কিছুই বাহারের মনে থাকে না। বাহার শুধু জানে, তারা কোনো এককালে কোথাকার যেন জমিদার ছিল।
হরিকাকাকে বলাই আছে, বাইরের কেউ এলে যেন তাঁকে ওই সোফায় বসানো হয়। হরিকাকা প্রস্থান করতে বাহার সেই সোফার কাছে এসে হাজির হল। এসে দেখল, সোফায় বসে আছে একটি ছেলে। কাঁধ অবধি লম্বা চুল। হরিকাকা যেমন বলেছিল, তেমন ফরসা না হলেও আমাদের দেশে যারা খুব ফরসা, ছেলেটির গায়ের রং তাদের মতোই। স্পেন দেশীয় বা ইতালিয়ানদের গাত্রবর্ণও অনেকটা এরকম হয়। দেশ-বিদেশে ঘুরতে ঘুরতে বাহার এ-সব অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে। ছেলেটির চোখদুটো বাদামী। আদ্যিকালের ঝাড়বাতি থেকে ঠিকরে পড়া হলুদ আলোয় ছেলেটির চোখদুটো যেন বাদামী ক্রিস্টালের মতো জ্বলজ্বল করছে। বাদামী হীরে বললেও ভুল বলা হবে না। অদ্ভুত সে জ্যোতি। ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়ে বাহারকে অভিবাদন জানাল। প্রাথমিক ভ্যাবাচ্যাকাটা কাটিয়ে উঠে বাহার ইংরিজিতে কথোপকথন শুরু করল। নাম জিজ্ঞাসা করাতে ছেলেটি জানাল, তার নাম আন্তোনিও রুসো। তখন বাহার আবার ইংরিজিতে জানতে চাইল, ছেলেটি ইতালিয়ান কিনা। কারণ, বাহার জানে ‘রুসো’ পদবী সাধারণত ইতালিয়ানদেরই হয়। এবার ছেলেটি পরিস্কার বাংলা ভাষায় উত্তর দিল— “না না, আমি একেবারেই মাছ-ভাত খাওয়া বাঙালী। শুনেছি, আমাদের পূর্বপুরুষরা এককালে ইতালির অধিবাসী ছিলেন। এখন শুধু এক মামা থাকেন ওদেশে। তাও ব্যবসার কাজে।”
বাহারের ছেলেটিকে বেশ ভালো লাগছে। কিন্তু, কোনো রকম খোঁজ খবর না নিয়ে তো কাউকে থাকতে দেওয়া যায় না। তাছাড়া, বাসুকাকাকে তো সব বলতে হবে। বাহার এই বিপুল সম্পত্তির মালিক হলেও সবকিছু দেখাশোনা করে বাসুকাকাই। বাড়িতে যেমন হরিকাকা হল “হোমমিনিস্টার”, তেমনি বাসুকাকা হল গিয়ে অর্থমন্ত্রী। বাসুকাকাও আছে সেই বাহারের বাবার আমল থেকে। খুবই বিশ্বস্ত লোক। বাসুকাকা শুধু যে সব সম্পত্তি ঠিকঠাক দেখেশুনে রাখে তা নয়, বাসুকাকার বিচক্ষণতায় তাদের অবস্থা আরও ফুলে-ফেঁপে ঢোল হয়েছে। তাছাড়া, বাহার বেড়াবে না এই সম্পত্তি নিয়ে পড়ে থাকবে? তাই এ-সব ক্ষেত্রে বাসুকাকার কথাই শেষ কথা। বাসুকাকা কী করছে না করছে সে ব্যাপারে বাহার খোঁজ-খবর রাখলেও, বাসুকাকাকে সে অগাধ স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছে। বাহারের বাবা চলে যাওয়ার আগে বাহারকে যেমন বলে গিয়েছিলেন— “বাসুকাকার কথা শুনো। উনি এই পরিবারেরই একজন।” তেমনি বাসুকাকাকেও বলে গিয়েছিলেন— “সম্পত্তির সঙ্গে সঙ্গে আমার মেয়েটাকেও রেখে যাচ্ছি তোমার ভরসায়। ওর পৃথিবী বেড়ানোর ইচ্ছায় যেন কোনোদিন কোনো বাধা না পড়ে।” তাই বাহার জিজ্ঞাসা করল— “আচ্ছা, আপনি কী করেন?” আন্তোনিও বলল— “আমি একজন স্ট্রাগলিং আর্টিস্ট।” শুনে বাহার খানিকটা দমে গেল। পেয়িং গেস্টের জন্য তারা যে রেট রেখেছিল একজন স্ট্রাগলিং আর্টিস্টের পক্ষে তা দেওয়া কি সম্ভব হবে! যদিও টাকার জন্য তো আর এই পেয়িং গেস্ট রাখা হচ্ছে না। কিন্তু, বাসুকাকা তো আর এ-সব শুনবে না! ছেলেটি, না জানি কী করে, বাহারের মনের কথা বুঝে নিয়ে বলে উঠল— “না, স্ট্রাগলিং আর্টিস্ট মানে ভাববেন না যে আমার হত-দরিদ্রের মতো অবস্থা। আমি তো আপনাদের বিজ্ঞাপনটি দেখেই এসেছি। আপনারা যা চেয়েছেন, মাস গেলে আমার পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব। আমি একটি গীর্জায় কয়ের গাই আর একটি পাবে ভায়োলিন বাজাই। তাতে যা পাই, খুব একটা মন্দ নয়। তবে আমার লক্ষ্য এইটুকু নয়। বা বলা ভালো, যা পেয়েছি তা নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। আমি শিল্পী হিসেবে আরও বড় হতে চাই। তাছাড়া কেউ যখন শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় তখন তার অর্থনৈতিক স্ট্রাগল ছাড়াও আরও অনেক স্ট্রাগল থাকে। পরিবার-পরিজনের তাকে নিয়ে অন্য কোনো পরিকল্পনা থাকতে পারে। এমনকী সে অনেক সময় বন্ধুদের কাছেও ঠাট্টা-তামাশার পাত্র হয়ে ওঠে …” বাহার তার নিজের ভাবনার জন্য বেশ লজ্জিত হল, সেই সঙ্গে অবাকও হল— ছেলেটি ঠিক ধরে নিয়েছে তো বাহারের মনে কী প্রশ্ন আসতে পারে! চার্চে কয়ের গায় আর বারে বেহালা বাজায়— কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! বাহারের একটু হাসিও পেল। কিন্তু, বাহার হাসল না। বলল— “আপনি কবে থেকে থাকতে চান।”
— “আজ থেকেই।”
— “মানে! সে কী করে হয়? পেপার্স রেডি করতেও তো একটু টাইম লাগবে। সবচেয়ে বড় কথা, আপনি তো এখনও ঘরই দেখেননি!”
— “ঘর? সে ভালোই হবে। এখনি দেখে নিচ্ছি। কিছু টাকা আমি অ্যাডভান্স হিসেবে দিয়ে দিতেও রাজী আছি। তবে, আজ থেকেই আমায় থাকতে দিন।”
— “না না, টাকাটা বড় কথা নয়। কিন্তু, আমার ম্যানেজারের সঙ্গে কথা না বলে আমার পক্ষে “হ্যাঁ” বলে দেওয়া সম্ভব নয়।”
— “দেখুন, আমাকে দেখে কী আপনার চোর-ডাকাত বলে মনে হচ্ছে? সকালে না হয় ম্যানেজারবাবুর সঙ্গে কথা বলে নেবেন। আজ আপনি আমাকে আশ্রয় না দিলে রাস্তায় রাত কাটাতে হবে। বিশ্বাস করুন, আমি ক্ষতিকর নই।”
শুনে বাহারের ভারী মায়া হল। ছেলেটির আচার-ব্যবহার-কথাবার্তা সবই বাহারের খুব ভালো লাগছিল। ছেলেটি অত্যন্ত ভদ্র। বাহার তখন বলল— “সবকিছুরই তো একটা নিয়ম-কানুন আছে। আপনিই বলুন, এভাবে কি কাউকে বাড়িতে রেখে দেওয়া যায়? একটা রাত যদি হোটেলে থেকে যান, খুব কি অসুবিধা হবে?”
— “হোটেলেই ছিলাম। খরচ টানতে পারছি না। তার থেকে পেয়িং গেস্ট থাকাটা অনেক সস্তার।”
— “আপনার বাবা-মা, পরিবার-পরিজন তাঁরা কোথায় থাকেন?”
— “পরিবার বলতে, আমার মা ছাড়া আর ইহলোকে কেউ নেই। তিনি এই কোলকাতা শহরেই থাকেন। বাবা বহুকাল আগে গত হয়েছেন। মায়ের ইচ্ছা, আমি এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা করি। ইতালিতে আমার যে মামা থাকেন, তিনিই নাকি সব ব্যবস্থা করে দেবেন। আমার ইচ্ছার কথা তো আমি আগেই আপনাকে বলেছি … এ-সব নিয়ে মায়ের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের মনোমালিন্য। প্রায় একমাস হতে চলল, মা আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকবার গিয়ে হাতে-পায়ে ধরাধরি করেও কোনো লাভ হয়নি। সেই থেকে হোটেলে হোটেলে জীবন কাটছে। দেওয়ালে পুরো পিঠ ঠেকে গেছে। না হলে কি আর এ-ভাবে বলি? … আচ্ছা, চলি। এত রাতে এসে বিরক্ত করার জন্য খুবই দুঃখিত।”
মুখে যা-ই বলুক, বাহার চাইছিল না যে আন্তোনিও চলে যাক। তাই তড়িঘড়ি করে বলল— “কোথাও যেতে হবে না। আপাতত থাকুন। ম্যানেজারবাবুর সঙ্গে আমি বুঝে নেব … আপনার জিনিসপত্র?”
— “জিনিসপত্র কিছু নেই। এই যা দেখছেন। বিজ্ঞাপনে তো দেখেছিলাম ফার্নিশড ঘর!” বাহার দেখল, ছেলেটির সঙ্গে ছোট একটি ব্যাকপ্যাক আর একখানা বেহালার বাক্স। মা বোধহয় আন্তোনিওকে একবস্ত্রে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। বাহার সংশোধন করে দিয়ে বলল— “ফার্নিচার সবই আছে। আমি জামা-কাপড়ের কথা জিজ্ঞাসা করছিলাম। সে-সব বাদ দিন। রাতে কী খাবেন বলুন।” ছেলেটি জানাল, সে খেয়ে এসেছে। আপাতত তার খাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। বাহার হরিকাকাকে ডেকে গেস্টরুমের দরজা খুলিয়ে দিল আর বলল— “হরিকাকা, আজ থেকে উনি এখানে থাকবেন।” হরিকাকার মুখ দেখে মনে হল না যে সে খুব একটা খুশি হয়েছে বলে। বাহার আন্তোনিওকে বলল— “আপনি ঘর দেখে নিন।” উত্তরে আন্তোনিও বলল— “এ তো রাজকীয় আয়োজন!” বাহার আবার বলল— “আচ্ছা, আলাপ করিয়ে দিই। ইনি হরিকাকা। আপনার যা দরকার হবে হরিকাকাকে বলবেন।” আন্তোনিও হরিকাকাকেও অভিবাদন জানাল। হরিকাকা বলল— “আচ্ছা, উনি কী খান-টান …” আন্তোনিও বলল— “আপাতত আমি কিছু খাব না। তবে, আমার খাওয়া নিয়ে আপনারা টেনশন নেবেন না। আমি সর্বভুক। যা পাই তা-ই খাই।” হরিকাকা বাহারের দিকে তাকিয়ে একটা অর্থবহ চোখের ইশারা করে সরে পড়ল, যার অর্থ― “আগেই বলেছিলাম, ব্যাটা ম্লেচ্ছ, গরু-শুয়োর সব খায়!”

রাতের খাবার খেয়ে বাহার নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ল্যাপটপ খুলে টাইপ করতে বসল। একটি পত্রিকা থেকে বাহারের ভ্রমণ-কাহিনী চেয়েছে। বাহারের ঘোরা মানে তো শুধুই ঘোরা নয়, সে যখন যেখানে যায় সেখানকার ইতিহাস, শিল্প-সংস্কৃতি, মানুষের জীবন-যাপন সব কিছু সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করে। যে বাহার বাড়িতে থাকলে একটার বেশি দুটো কথা বলে না, সেই বাহারই বেড়াতে গিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে যেচে যেচে বন্ধুত্ব করে। ভাষার প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সেসব এ-ক্ষেত্রে হার মেনে যায়। বাহার মনে করে, কোনো একটি জায়গায় গিয়ে, সে দেশেই হোক বা বিদেশে, সেই জায়গার মানুষদের না জানলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই বেড়াতে গেলেই বাহারের ঝুলিতে জমা হয় অজস্র গল্প। পেশা বলতে বাহারের যদি কিছু থাকে তা হল— ব্লগ লেখা আর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে ভ্রমণকাহিনী প্রকাশ করা। কোনো পত্রিকা পারিশ্রমিক দেয়, কোনো পত্রিকা দেয় না। এমন পত্রিকাও আছে যারা টাকা দেব বলেও দেয় না। সত্যি কথা বলতে কী, এসবে বাহারের কিছু যায়-আসে না। ভালো লাগে বলেই সে লেখে।
বাহার লিখছে, ঠিক তখন রাত বারোটা। অপূর্ব এক সুরেলা কণ্ঠে কে যেন অপেরা গাইতে লাগল, সম্ভবত ইতালিয়ান ভাষায়। এ গানের কী মানে বাহার বুঝছে না, কিন্তু, দরদটা সে অনুভব করতে পারছে। তারপর শুরু হল বেহালার সঙ্গত। লেখা থামিয়ে বাহার চুপচাপ গান শুনতে লাগল। সত্যি, গুণ আছে ছেলেটির! কিছুক্ষণ বাদে বাহার খেয়াল করল, তার দু-চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমেছে। বাহার সচরাচর কাঁদে না। বাবার মৃত্যুর পরও সে জনসমক্ষে কাঁদেনি। কেঁদেছিল, একা একা, নিজের ঘরে লুকিয়ে লুকিয়ে। তারপর থেকে আর কখনও কেঁদেছে বলে তো বাহারের মনে পড়ে না। বাহারের মনে হতে লাগল, এ যেন তার নিজের গান, এই গানের মধ্যে দিয়ে বাবার প্রতি তার যে অসম্ভব ভালোবাসা ছিল, তা-ই ব্যক্ত হচ্ছে। আন্তোনিওর গান আর বেহালা শুনতে শুনতে বাহার কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, বাহার নিজেও টের পেল না।


আজ সক্কাল সক্কাল ঘুম ভেঙে গেল বাহারের। মোবাইল হাতড়ে দেখল, এখন ভোর আটটা। দেশে থাকলে বাহার যে রুটিনে চলে তাতে করে সকাল আটটাকে “ভোর আটটা” কেন “ভোররাত” বলাটাও বাড়াবাড়ি হবে না। আসলে আগের দিন রাতে বাহার অন্য দিনের তুলনায় তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিল— যাকে বলে এক্কেবারে ভর সন্ধ্যেবেলায়।
বাহার দরজা খুলে বাইরে এসে দেখল, হরিকাকা বেজার মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। বাহার বলল— “কী গো হরিকাকা, রাতে ঘুম হয়নি নাকি? মুখখানা এমন বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছ কেন?” হরিকাকা বিড়বিড় করে বলল— “সে আর ঘুম হবে কী করে, সারারাত ধরে শ্যালের যা হুক্কাহুয়া!” বাহার বুঝল, হরিকাকা ঠিক কী বলতে চাইছে। বাহারের রাগ ধরে গেল। বাহার নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই হরিকাকা আবার বলল— “একটু আগে ওই ছেলেটাকে কত করে ডাকলাম। দরজা ধাক্কালাম। কোনো সাড়া-উত্তর নেই। কী ঘুম রে বাবা!”
— “আর ডেকো না। রাত করে ঘুমিয়েছে হয়তো। বিরক্ত করতে হবে না।”
হরিকাকা গজগজ করতে করতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল— “সারারাত শ্যাল ডাকবে, সকাল থেকে ঘুমোবে … তায় আবার মেলচ্ছ …”

দশটা নাগাদ আবার হরিকাকার আগমন। এসে বলতে লাগল— “দিদিমুনি, এবার একবার ডাকি? বাসুকাকা তো এসে পড়ল বলে।” (এখানে একটা কথা না বললেই নয়, বাসুকাকা হরিকাকাকে হরিকাকা বলে ডাকে আর হরিকাকাও বাসুকাকাকে বাসুকাকা বলে ডাকে।) শুনে বাহার বলল— “হ্যাঁ, ডাকো।”
এবারও হরিকাকা অনেকবার ডাকাডাকি করে আর দরজায় ধাক্কা মেরে আন্তোনিওর ঘুম ভাঙাতে পারল না। আবার যথারীতি বাহারের কাছে উপস্থিত হল এবং বলল— “মরে গেল নাকি বলো তো!” বাহার নির্বিকার চিত্তে বলল— “না না, মরবে কেন! কোনো না কোনো সময় ঠিকই ঘুম ভাঙবে।”

এগারোটার সময় আবার একই রকমভাবে আন্তোনিওর ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করা হল। কিন্তু, সে কুম্ভকর্ণের ঘুম আর ভাঙল না। ইতিমধ্যে বাসুকাকা এসে উপস্থিত হল। বাইরে বিশাল গোলমাল শুনে বাহার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাহার আসতেই হরিকাকা “শোনো, বাসুকাকা কী বলচে” —বলে কেটে পড়ল। বাহার বাসুকাকার দিকে তাকাতেই বাসুকাকা বলতে লাগল— “একটা রাত অপেক্ষা করা গেল না? কাকে রেখেছিলে ঘরে?” বাহার শান্ত গলায় বলল— “কী হয়েছে?”
— “তোমাদের বাড়িতে যখন ঢুকছি, তখন উল্টোদিকের বাড়ির একজন বলল— কাল ভোররাতে পাইপ বেয়ে কাকে যেন নামতে দেখেছে! লম্বা চুল। পনিটেল বাঁধা। আমি তো ভাবলাম চোর ঢুকেছিল বাড়িতে। গেস্ট রুমের জানলার পাশে যে পাইপ, সেই পাইপ বেয়ে নামছিল! তারপর তো বাড়ি এসে হরিকাকার মুখে সব শুনলাম।”
বাহার ভেতর ভেতর একটা ধাক্কা খেল— মানুষ চিনতে সে এতটা ভুল করল! কিন্তু, সে কোনো কথা বলল না। বাসুকাকা আবার বলতে লাগল— “ছেলেটির কোনো ডকুমেন্টস নিশ্চই নাওনি?”
— “না। ভেবেছিলাম, সকালে তুমি এলে …”
— “খুব ভালো কথা। না জানি, কোথায় কী ক্রাইম করে এখানে এসে গা ঢাকা দিয়েছিল!”
— “এখন কী করণীয়?”
— “কী আবার! থানায় চলো। দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে চলে গেছে। হরিকাকা, আমি দুজনেই ঠেলাঠেলি করে দেখলাম। দরজা ভাঙা ছাড়া গতি নেই। পুলিসের পারমিশন ছাড়া দরজা ভাঙব কী করে?”
— “নিজেদের বাড়ির দরজা নিজেরা ভাঙব, তাতে আবার পুলিসের পারমিশন কীসের?”
— “তাও, ব্যাপারটা পুলিসকে জানানো উচিত।”
পুলিসে খবর দিতে বাহারের মন চাইছিল না। আন্তোনিওর প্রতি তার একটা দুর্বলতা এখনও কাজ করে যাচ্ছে। বাহার বাসুকাকাকে বলল— “সত্যিই যদি ছেলেটি কোনো অপরাধমূলক কাজ করে এ-বাড়িতে এক রাত্তির লুকিয়ে থেকে থাকে তো যেচে পড়ে পুলিসকে জানালে পুলিস কি আমাদের মাথায় তুলে নাচবে? বেকার ঝামেলায় জড়ানোর কোনো মানে হয় না।”
বাহার এ-সব নিয়ে কথা আর না বাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। বাসুকাকা আর হরিকাকা দুজনে মিলে দালানে বসে ভজরং ভজরং করতে লাগল।

বাহারদের দালানে একটা সেগুনকাঠের গোল ডাইনিং টেবিল আছে, যার ওপরের অংশটা মার্বেলের। এই টেবিলের মাথায় সেই ঝাড়লন্ঠন দোদুল্যমান। বিকেলের দিকে আন্তোনিওকে নিয়ে আবহাওয়া অনেকটা ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। দরজা ভাঙার লোক ডাকা হয়েছে। সে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে। বাহার বসে বসে বাসুকাকার তত্ত্বাবধানে তখন প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্রে সই-সাবুদ করছে। এমন সময় গেস্টরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন মূর্তিমান আন্তোনিও রুসো। আন্তোনিওকে দেখে বাহার মনে মনে যারপরনাই খুশি হলেও বাইরে কিছুই প্রকাশ করল না। একমনে নিজের কাজ করতে লাগল। বলা ভালো— মন একটুও নেই, কিন্তু, মুখের সামনে একটা কাগজ তুলে নিয়ে এমন ভান করতে লাগল যেন পড়তে পড়তে তার বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়েছে। বাহার ঠিক করে নিল, যা কথা বলার বাসুকাকাই বলুক, সে মুখে কুলুপ এঁটে থাকবে। আন্তোনিওকে দেখা মাত্রই বাসুকাকা বলল— “ও আপনিই তাহলে সেই! তা কী রাজকার্য পড়েছিল যে ভোর রাত্তিরে পাইপ বেয়ে নামতে হল— জানতে পারি কি? আরেকটু দেরি হলে তো দরজা ভেঙে ফেলতাম।” আন্তোনিও যথারীতি বাসুকাকা ও বাহারকে অভিবাদন জানাল। বাহার কাগজ থেকে মুখ সরাল না। তারপর আন্তোনিও বলতে লাগল— “আসলে আমাকে একটা কাজে আসানসোল যেতে হয়েছিল।” পড়েছে বাসুকাকার হাতে। বাসুকাকা বলল— “তা বলে যেতে কী হয়? না বলে জানলা গ’লে বেরিয়ে পাইপ বেয়ে নামাটা আপনার সহজ কাজ বলে মনে হল?”
— “না মানে … অত রাত্তিরে কাউকে আর বিরক্ত করতে চাইনি।”
— “আগের দিন তো শুনলাম অনেক রাত অবধি এদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তখন বলেননি কেন ভোররাতে বেরতে হবে? হরিকাকা ঠিকই দরজা খুলে দিত।”
— “তখনও তো জানতাম না, সকালে আসানসোল যেতে হবে।”
— “সেকি! কখন জানতে পারলেন?”
— “মাঝরাতে।”
— “বাবা! কী কাজ করেন যে মধ্যরাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে কাজের খবর আসে?”
— “আমি চুরি-ডাকাতি করি না, বিশ্বাস করুন।”
বাহারের মনে হচ্ছিল, বাসুকাকা যেন আন্তোনিওর সঙ্গে বড্ড বেশি দুর্ব্যবহার করছে। “আমি নিজের ঘরে যাচ্ছি” —বলে কাগজপত্র নিয়ে বাহার ঘরে চলে গেল। ঘরে গেলেও, বাসুকাকা আর আন্তোনিওর মধ্যে কী কথাবার্তা চলছে কান খাড়া করে শুনতে লাগল। বাসুকাকা বলল— “তবে কী করেন শুনি।”
— “আমি একজন কয়ের সিঙ্গার। আসানসোলের এক গীর্জার আজ মা মেরীর জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটা অনুষ্ঠান ছিল। আমার যাওয়ার কথা ছিল না। শেষ মুহূর্তে একজন ক্যানসেল করায় গ্রুপের লোকজন আমায় ফোন করে। অনেকগুলো টাকা দেবে শুনলাম। তাই আর “না” করতে পারিনি।”
— “এখন কি তাহলে আবার পাইপ বেয়ে উঠলেন?”
— “ইয়ে … মানে … হ্যাঁ।”
— “অসাধারণ, কয়ের গেয়ে না বেড়িয়ে সার্কাসে নাম লেখালে তো পারতেন।”
— “সরি, আমার ভুল হয়ে গেছে।”
— “যাক গে, আপনার ডকুমেন্টসগুলো নিয়ে আসুন।”
বাহার যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। বাসুকাকা তাহলে আন্তোনিওর এই নিরুদ্দেশ হওয়া এবং পাইপ বেয়ে নামা-ওঠা ক্ষমা করে দিয়েছে। কিন্তু, না ফাঁড়া এখনও কাটেনি। এবার আন্তোনিওকে বলতে শোনা গেল— “ডকুমেন্টস মানে?”
— “আরে বাবা আইডি প্রুফ। ভোটার আইডি, আধার কার্ড কিছু আছে?”
— “সবই আছে। কিন্তু, এই মুহূর্তে কিছুই নেই।”
— “এটা আবার কেমন কথা হল! আইডি প্রুফ ছাড়া আপনাকে কেমন করে রাখি?”
— “সব মায়ের কাছে আছে। আমায় একটা দিন সময় দিন। আমি এনে দেব।”
বাসুকাকার না জানি কী দয়া হল, বলল— “ঠিক আছে, আপনাকে আমি ২৪ ঘন্টা সময় দিলাম। তার মধ্যে আপনি আইডি প্রুফ নিয়ে আসবেন। আর হ্যাঁ, কোনো অবস্থাতেই পাইপ বেয়ে ওঠা-নামা নয়, ঘরে আগুন লাগলেও নয়— কথাটা যেন মনে থাকে।” তারপর বাহারের উদ্দেশে হাঁক পেড়ে বলল— “এই যে বাহার মা, কাগজপত্রগুলো পড়ে ঠিক ঠিক জায়গায় অটোগ্রাফ মেরে রাখবেন, কেমন?”
বাসুকাকা সেদিনের মতো বিদায় নিল। বাসুকাকা চলে যেতেই বাহার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। আন্তোনিও তখনও দালানে দাঁড়িয়ে আছে। বাহার এসে বলল— “বাসুকাকা আসলে একটু কড়া।” আন্তোনিও বলল— “না না, ওঁর কথায় আমি কিছু মনে-টনে করিনি। উনি ওঁর দিক থেকে ঠিকই আছেন।” বাহার বলল— “সারাদিন কিছু খাওয়া-দাওয়া হয়নি নিশ্চই?”
— “না না, খেয়েছি।”
— “এখন চা-টা কিছু খাবেন?”
— “হলে মন্দ হয় না।”
— “সঙ্গে মুড়িমাখা চলবে? হরিকাকা কিন্তু দারুণ মুড়ি মাখে। অবশ্য, জানি না আপনি মুড়ি খান কিনা।”
— “হ্যাঁ হ্যাঁ, মুড়ি খাব না কেন? আমি মুড়ি খাই তো।”
বাহারের নিজেকে দেখে নিজেরই বেশ অবাক লাগছে। জন্ম-জন্মান্তরেও সে কোনোদিন এমন কেয়ারিং ছিল না। হঠাৎ যে তার কী হল!
বাহার রান্নাঘরে গিয়ে হরিকাকাকে বলল— “চা হবে? ওই ছেলেটিও খাবে। আর একটা বড় বাটিতে ভালো করে মুড়ি মেখে দাও তো।”
— “বড় বাটিতে কেন?”
— “আমরা দুজনে খাব, তাই।”
— “ছ্যা ছ্যা! কেরেস্তানের এঁটো তুমি খাবে?”
হরিকাকাকে অনেক কথাই বলা যেত। কিন্তু, বলে কোনো লাভ নেই। তাই, বাহার চুপচাপ রান্না ঘর থেকে সরে পড়ল। আন্তোনিওকে ও সেই গোল টেবিলটাতে বসাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চা আর মুড়িমাখা চলে এল— অবশ্যই আলাদা আলাদা দুটো বাটিতে। মুড়ি খেতে গিয়ে আন্তোনিও খাওয়ার থেকে ছড়াচ্ছিল বেশি। বাহার বুঝল, এ ছেলে চামচ ছাড়া খেতে অভ্যস্ত নয়। রান্নাঘরে গিয়ে বাহার হরিকাকার থেকে একটা চামচ চাইল। হরিকাকা অবাক হয়ে বলল— “বাবা! একটা হাঁক দিলেই দিয়ে আসতাম। রান্নাঘর অবধি দৌড়ে আসতে হল!”
এবারও বাহার কোনো উত্তর করল না। আন্তোনিও ধন্যবাদ জ্ঞাপনপূর্বক চামচটি গ্রহণ করল এবং এবার দেখা গেল সে মুড়িমাখাটি ঠিকমতো ম্যানেজ করতে পারছে।
মুড়িমাখা শেষ হল, কিন্তু, ওদের দুজনের গল্প আর শেষ হল না। একা আন্তোনিও নয়, বাহারও পাল্লা দিয়ে বকবক করে চলেছে। রান্নাঘরে বসে বসে হরিকাকা তাদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিল। বাহার যে এত কথা বলতে পারে হরিকাকা তা জানতই না। এর মধ্যে বাহার অবশ্য ভদ্রতার খাতিরে আন্তোনিওকে অনেকবার বলেছে— “আপনি তো রাত জেগে আছেন, আমি যাই। আপনি বরং একটু বিশ্রাম করে নিন।” আন্তোনিও সে-সব উড়িয়ে দিয়ে বলেছে— “আমি গাড়িতে ঘুমিয়ে নিয়েছি। এখন ঘুম পাচ্ছে না।” বাহার যেন এটাই শুনতে চাইছিল।
কথা বলতে বলতে যখন রাত দশটা, হরিকাকা এসে বলল— “রাতের খাবারটা কি দিয়ে দেব?” শুনে বাহার মহোৎসাহে বলল— “হ্যাঁ, দিয়ে দাও। দিয়ে দাও।” হরিকাকার আবার একবার হতবাক হওয়ার পালা— যে মেয়ে রাত এগারোটার আগে খেতেই চায় না, তার আজ হল কী!
খাওয়ার পর্ব মিটিয়ে আরও এক প্রস্থ গল্প হল। তারপর ওরা যে যার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বাহার আজ খুশিতে ডগমগ করছে। ল্যাপটপ খুলে দু-লাইন লিখে আর লিখতে ইচ্ছে করল না। সন্ধ্যে থেকে রাত অবধি আন্তোনিওর সঙ্গে কী কী কথা হল বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল। ঠিক রাত বারোটা। আন্তোনিও গান ধরল— “ও মিও বাবিনো কারো …” আগের দিন রাতেও ও এই গানটাই গাইছিল। আবার বেজে উঠল বেহালা। কিছুক্ষণ বিভোর হয়ে শুনল বাহার। তারপর ঝেড়ে-ঝুরে উঠে পড়ে ল্যাপটপ অন করল। নেটে সার্চ করে দেখল “ও মিও বাবিনো কারো” মানে হল “ও মাই ডিয়ার ড্যাডি”। গানটি ইটালিয়ান ভাষায় লেখা একটি অপেরার অংশ বিশেষ। এই গানের মাধ্যমে একটি মেয়ে তার বাবাকে বলছে যে সে একটি ছেলেকে ভালোবাসে এবং তাকেই সে বিয়ে করতে চায়। বাবা যদি তার এই বিয়েতে সম্মতি না দেন তাহলে মেয়েটি এ জীবন আর রাখবে না। এসব পড়ে বাহার বেশ স্তম্ভিত হয়ে গেল। বাহারের বাবা তখন শয্যাশায়ী, একদিন বাহারকে বললেন— “যতদিন বাসু আছে ততদিন তোমার কী হবে, এই এত সম্পত্তি তার-ই বা কী হবে, সেই নিয়ে ভাবি না। বাসু আমার ভাইয়েরও অধিক। সবকিছু ও বুক দিয়ে আগলে রাখবে। কিন্তু, বাসুরও তো বয়স হচ্ছে! বাসু চলে গেলে কী হবে তাই নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা হয়। তুমি যদি একটা বিয়ে-থা করতে, অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়ে চোখ বুজতে পারতাম।” বাহার তখনও বোঝেনি বাবা সত্যিই চলে যাবে। ও বলেছিল— “এই এক কথা বিয়ে বিয়ে আর বিয়ে। আর তোমায় এখন চোখ বুজতে দিচ্ছে কে?” বাবার কি তবে এটাই শেষ ইচ্ছা ছিল?
সন্ধ্যেবেলা আন্তোনিওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাহার জেনেছে, আন্তোনিও গান-বাজনার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছে। বিয়ে-সংসার-বাচ্চাকাচ্চা এসব কোনোটির প্রতি তার কোনো মোহ নেই। সবটাই বাহারের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সমমনষ্ক দুজন মানুষ যদি কাছাকাছি আসে এবং একসঙ্গে থাকে, তবে এর চেয়ে ভালো তো আর কিছুই হতে পারে না। বাহার তার নিজের ঘোরা-বেড়ানো নিয়ে থাকবে আর আন্তোনিও তার নিজের জগৎ নিয়ে। এসবের মধ্যে তারা যেটুকু সময় পাবে তখন তারা কাছাকাছি আসবে। দুজনে মিলে এই বিস্তর ধন-সম্পত্তি সামলাবে। পরে কখনও মনে হলে একজন বংশধর রেখে যাওয়ার ব্যবস্থাও করবে। এ-সব ভাবতে ভাবতে একটা সময় বাহারের খুব হাসি পেল— মাত্র একটা দিন পার হয়েছে তারমধ্যেই একজনকে নিয়ে সে এত কিছু ভেবে ফেলছে! এই ধরণের বোকা বোকা চিন্তা-ভাবনার জন্য বাহার নিজেই নিজের কাছে বেশ লজ্জিত হয়ে পড়ল।


পরদিন সকাল দশটা নাগাদ হরিকাকার দরজা ধাক্কানোয় ঘুম ভেঙে গেল বাহারের। ঘুম ভেঙেই বাহারের বুকটা ধরাস করে উঠল— আবার কী হল, দশটা বাজতে না বাজতেই হরিকাকা বাহারকে ঘুম থেকে তোলার জন্য এত ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল কেন! তাড়াতাড়ি করে বাহার দরজা খুলে দিয়ে হরিকাকাকে বলল— “আন্তোনিও আবার কোনো কাণ্ড ঘটাল নাকি?” শুনে হরিকাকা বলল— “না না, সে সকাল হতে না হতেই বেরিয়ে গেছে।”
— “কোথায় গেছে?”
— “ওই তো, বাসুকাকা যে-সব কাগজপত্র আনতে বলেছিল, সেইসব আনতে।”
শুনে বাহারের ধরে যেন প্রাণ এল। পরক্ষণেই বাহার বলল— “কী খেয়ে গেল?” এ-কথা শুনে হরিকাকা হাঁ করে কিছুক্ষণ বাহারের দিকে তাকিয়ে রইল— এ কোন বাহারকে দেখছে সে! তারপর বলল— “ওই চা-বিস্কুট।”
— “তুমি ওকে কিছু একটা টিফিন বানিয়ে দিতে পারলে না?” হরিকাকা এবার বোধহয় ধপ করে মাটিতে পড়ে যাবে। সেই সঙ্গে প্রবল হাসির বেগ উঠছে। তো হরিকাকা বলল— “হ্যাঁ, বলেছিলাম তো, জলখাবার খেয়ে যেতে, এক্ষুণি হয়ে যাবে। সে কথা শুনল না।”
— “ও। কখন ফিরবে কিছু বলে গেছে?”
— “বলল, বিকেল হবে।”
— “তাহলে দুপুরে কোথায় খাবে?”
— “আচ্ছা জ্বালা হল তো আমার! আমি কোত্থেকে জানব? … ওসব বাদ দাও। তুমি এদিকে এসে দেখো একবার।” বলে হরিকাকা দালানে রাখা ওই গোল টেবিলটার দিকে আঙুল দেখাল। বাহার দেখে নিজের চোখকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিল না। কাছে গিয়ে আরও ভালো করে দেখল। গোটা টেবিলটা (মার্বেল দেওয়া অংশটা বাদে) আর চেয়ার দুটো এক ইঞ্চি লম্বা লম্বা সরু সুতোর মতো ফাঙ্গাসে ভরে গেছে। প্রত্যেকটার মাথা একটু মোটা। কানে দেওয়ার বাডসগুলোর একদিক কেটে নিলে যেমন দেখাবে এ তারই একটু সূক্ষ্ম সংস্করণ। ফাঙ্গাসগুলো হাওয়ায় দুলছে। দেখে মনে হচ্ছে চেয়ার-টেবিলগুলো সাদা রঙের রোমশ কোনো জীবে পরিণত হয়েছে। দেখা মাত্রই বাহারের গা ঘিনঘিন করে উঠল। সরে এসে হরিকাকার উদ্দেশে বলল— “নিশ্চই দালানের জানলা খোলা ছিল। টেবিলে বৃষ্টির জল লেগেছে।” হরিকাকা বলল— “বাবু চলে যাওয়ার পর থেকে দালানের জানলা তো আর খোলা হয় না। তুমি পছন্দ কর না … বল যে নিচের তলার ভাড়াটেদের আওয়াজ আসছে। তাই আর খুলি না।”
— “তাহলে এগুলো হল কী করে? তাও রাতারাতি!”
— “বললে তো আর কথা শুনবে না। বলি, ঘর-দোরে একটু আলো-বাতাস ঢোকাটা দরকার। নয়ত এমন ছাতা পড়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আজ টেবিলে হয়েছে। কাল দেখবে সব ঘরে ঘরে।”
— “কিন্ত, টেবিলটার এখন কী হবে?”
— “এ আমি পরিষ্কার করতে পারব না। দেখলেই শরীর পাক দিচ্ছে।”
— “সর্বনাশ! তাহলে অন্য লোক ডাকতে হবে।”
— “না, ওই ছেলেটা বলেছে, বিকেলে এসে পরিষ্কার করে দেবে। তার জন্য কেরোসিন তেল আনিয়ে রাখতে।”
— “ওই ছেলেটা” মানে?”
— “আরে ওই ফিরিঙ্গি দাদাবাবু।”
— “ও কেন করবে?” হরিকাকা কোনো উত্তর দিতে পারল না দেখে বাহার ঘরের মধ্যে ঢুকে এল। নিজের ঘরের সব জানলা-দরজা খুলে দিল। তারপর হরিকাকাকে গিয়ে বলল— “সব ঘরের জানলা-দরজা খুলে দাও। আজ তো ভালোই রোদ উঠেছে।” হরিকাকা বলল— “এক্ষুণি খুলে দিচ্ছি। কিন্তু, ওই ফিরিঙ্গি দাদাবাবুর ঘরটা কী হবে? সে তো এত্ত বড় একটা তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চলে গেছে।” বাহার একবার গিয়ে ঘুরে এল। হরিকাকা ঠিকই বলেছে, আন্তোনিওর ঘরে তালা ঝুলছে। বাহারের বিষয়টা কেমন কেমন যেন লাগল। হরিকাকাও বাহারের পিছন পিছন এসেছিল। ভ্রু-কুঞ্চিত বাহারকে দেখে হরিকাকা বলল— “আছে তো একটা পিঠে নেওয়ার পুঁটলি আর ওই বেউলের বাস্কোখানা। তার জন্য এত ঘোর-ঘটা করে তালা দিয়ে যাবার কী দরকার বলো তো। দোর খোলা পাই না বলে, ক’দিন ঘরে ঝাঁট দেওয়া-মোছা কিছুই হচ্ছে না।” শুনে বাহার বিরক্তির স্বরে বলল— “ডাকাতি করে বোধহয় কিছু ধনসম্পদ এনে লুকিয়ে রেখেছে।” হরিকাকা বলল— “খুন-টুন করে আবার কারো বডি এনে রেখে যায়নি তো?” বাহার বলল— “সেটা হলে গন্ধে এ বাড়িতে আর আমাদের টিঁকতে হত না।”
চা-জলখাবার সবই আজ বাহার নিজের ঘরেতেই খেল। দুপুর বারোটার সময় বাসুকাকা এল। টেবিল-চেয়ারের ওই দশা দেখে বেশ খানিকক্ষণ আস্ফালন করল। তারপর বাহারের ঘরে এসে আগের দিনের সেইসব কাগজপত্রগুলো নিয়ে বসল। কাজ মিটিয়ে বাসুকাকা চলে গেল। বাহার স্নান-খাওয়া সেরে লিখতে বসেছিল। কিন্তু, কিছুক্ষণ লেখার পর তার ঘুম পেতে লাগল। চারটে নাগাদ বাহার ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম ভাঙল একটা খসখস খসখস শব্দে। ঘুম ভেঙেই দেখল কেরোসিনের গন্ধে চারদিক ম’ ম’ করছে। আনন্দে বাহারের মনটা নেচে উঠল— তার মানে আন্তোনিও ফিরেছে! বাইরে বেরিয়ে দেখল, ঠিক তাই কেরোসিন, ন্যাকড়া আর কাগজ সহযোগে আন্তোনিও টেবিল পরিষ্কার করছে। হরিকাকা সেখানে কোমরে হাত দিয়ে তদারকি করার ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে। বাহারকে দেখা মাত্রই হরিকাকা কেমন যেন মিইয়ে গেল— “আমি অনেক করে বারণ করেছিলাম, দাদাবাবু শুনলই না।” আন্তোনিও বলল— “আরে এ আর এমন কী কাজ, আরেকটু বাকি আছে। এক্ষুণি শেষ হয়ে যাবে। তারপর আমরা চা আর মুড়িমাখা খাব, কেমন?” বাহার কোনো উত্তর দিল না। দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আন্তোনিওর জন্য ওর খুব মায়া হতে লাগল।
টেবিল-চেয়ার সব চকচকে করে পরিষ্কার করে আন্তোনিও কাগজ-ন্যাকড়া সব বাইরে ফেলে এল। তারপর নিজে পরিষ্কার হতে গেল। বাহার তখনও একই ভাবে দাঁড়িয়ে। আন্তোনিও হাত-পা ধুতে ঢুকেছে দেখে বাহার হরিকাকাকে চা বসাতে বলল। আন্তোনিও বাইরে আসতেই চা আর মুড়িমাখা চলে এল— এবারও দুটো পৃথক পৃথক বাটিতে। হরিকাকা গোল টেবিলে রাখতে যাচ্ছিল। বাহার হাঁ হাঁ করে চেঁচিয়ে উঠে বলল— “আমি ওখানে খাব না। সোফার সামনে ওই সেন্টার-টেবিলটাতে দাও।” হরিকাকা তাই করল। আন্তোনিও প্রথম যেদিন এল, সেদিন যেখানে ওরা বসেছিল আজ ওরা সেই সোফাটাতেই বসল। আবার শুরু হল গল্প। ইতিমধ্যে বাসুকাকার প্রবেশ। ঢুকেই সোজা গোল টেবিলের কাছে চলে গেল। বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল— “এটা এত সুন্দর করে পরিষ্কার করল কে?” বাহার একটা বিজয়ীর হাসি হেসে আন্তোনিওর দিকে আঙুল দেখাল। বাসুকাকা বলল— “ভারী করিৎকর্মা ছেলে তো আপনি!” আন্তোনিও একটা লাজুক হাসি হেসে “ধন্যবাদ” জানাল। বাসুকাকা এসে বাহার আর আন্তোনিওর সঙ্গে ওই সোফাতে বসে পড়ল। তারপর বলল— “বাপের জন্মে দেখিনি বাবা সেগুন কাঠে এমন ছাতা পড়ে!” বাসুকাকার গলা শুনে এতক্ষণে হরিকাকাও এসে হাজির হয়েছে। হরিকাকা বলল— “একেই বলে ঘোর কলি! তা বাসুকাকা, আপনি চা খাবেন তো?” বাসুকাকা বলল— “হ্যাঁ, বসিয়ে ফেলো।” হরিকাকা তখন বাহার আর আন্তোনিওর উদ্দেশে বলল— “দিদিমুনি, তোমাদের জন্যও তাহলে আর এক কাপ করে জল নিই?” বাহার, আন্তোনিও দুজনেই ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। হরিকাকা চলে যেতেই বাসুকাকা আবার ওই ফাঙ্গাসের টপিকে ফিরে এল। আন্তোনিও বলল— “আসলে জেনেটিক চেঞ্জ। এইসব ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, অ্যালগি, ফাঙ্গি —এইসব নিম্নশ্রেণির জীবেদের মধ্যে জেনেটিক চেঞ্জটা খুব দ্রুত ঘটে। ভাবুন তো, এই ক’বছরে কত রকমের ডেঙ্গু মার্কেটে এল!” বাসুকাকা বলল— “ঠিক।” বাহার বলল— “আমি তো দু-রকমের ডেঙ্গুর কথা শুনেছি— একটা হল ডেঙ্গু আর আরেকটা হল ডেঙ্গি।” বলা বাহুল্য, হাসির একটা রোল উঠল। তারপর আন্তোনিও বলল— “আমরা তো সবাই জানি, রেপটাইল থেকে অ্যাভিস মানে পাখিরা এসেছে। রেপটাইল থেকে ম্যামেলসও এসেছে। ম্যামেলসরা বিবর্তিত হতে হতে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীতে এসে ঠেকল। কিন্তু, সরীসৃপ বা পাখি থেকে বিবর্তিত হতে হতে মানুষের মতো বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী এল না কেন?” বাসুকাকা এই প্রশ্ন শুনে বলল— “সারা জীবন কেটেছে আমার খাজাঞ্চিগিরি করে। এখন মানে মানে শাঁখা-সিঁদুর নিয়ে স্বর্গে যেতে পারলে বাঁচি। সত্যি বলছি, বাবা, আপনার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমায় ঘুরে আসতে হবে।” বাহার বলল— “এটা তো কখনও ভেবে দেখিনি!” আন্তোনিও বলল— “পৃথিবীর সব পুরাণ, উপকথা এমনকী বাইবেলেও পাখি-মানুষ, সরীসৃপ-মানুষদের কথা কিন্তু আছে।” বাসুকাকা প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল— “হ্যাঁ, আমাদের রামায়ণে যেমন গরুড়, তাকে পাখি বললে পাখি আর মানুষ বললে মানুষ। মহাভারতে আছে এক নাগকন্যার সঙ্গে অর্জুনের বিবাহ হয়েছিল।” বাহার বলল— “এই যে পরী, অ্যাঞ্জেল এরা মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী। অথচ এদের ডানা আছে।” আন্তোনিও তখন বলল— “এরা মায়াবী। অর্থাৎ এদের কাজকর্ম মানুষের চিন্তা-ভাবনার বাইরে। সুতরাং, বলা যায় এরা মানুষের থেকেও বুদ্ধিমান এবং শক্তিশালী প্রাণী।” কথাটা শোনা মাত্র বাহারের কেমন যেন গা ছমছম করে উঠল। বাসুকাকা কাজের মানুষ। কতক্ষণই বা এইসব আলতু-ফালতু আলোচনা নিয়ে পড়ে থাকবে। সরাসরি কাজের কথায় চলে এল— “যাক গে, আপনার ডকুমেনটসগুলো এনেছেন?” সন্ধ‍্যাবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই বাহার লক্ষ্য করেছিল, সোফার ওপর হলুদ রঙের একখানা ফাইলের আগমন ঘটেছে। আন্তোনিও তাড়াতাড়ি সেই ফাইলটা খুলে ফেলল। সেখান থেকে বেরিয়ে এল একতাড়া মিউজিকের নোটেশনস। তার মধ্যে থেকে একখানা জেরক্স করা কাগজ বের হল। এক ঝলক দেখে বাহারের মনে হল, ওটা একটা ভোটার কার্ডের কপি। আন্তোনিও কাগজটা বাসুকাকার হাতে দিল। বাসুকাকা খুব মন দিয়ে সেটি দেখে বাহারের হাতে তুলে দিল। বাহার ঠিকই ধরেছিল। ওটা আন্তোনিওর ভোটার কার্ডের জেরক্স। ভোটার আইডির ছবিগুলো যেমন হয় এখানেও তেমনি একটা ছবি। ছবিটি যে লম্বা চুলের কোনো ছেলের ছবি, শুধুমাত্র এটুকুই বোঝা যাচ্ছে। পিছনের পাতায় দেখা গেল, আন্তোনিওর মায়ের নামের জায়গায় লেখা আছে— মারিয়া রুসো। ঠিকানায় দেওয়া আছে কোলকাতার এক বিখ্যাত খৃস্টানপল্লীর অ্যাড্রেস। কিন্তু, যেটা দেখে বাহার ভীষণভাবে দমে গেল, তা হল ছেলেটির জন্ম-সাল। হিসেব করে দেখা যাচ্ছে বাহার আন্তোনিওর থেকে বছর ছয়েকের বড়।
জেরক্স কপিটা বাহার বাসুকাকাকে আবার ফেরত দিয়ে দিল। বাসুকাকা চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা লাগিয়ে উঠে পড়ল। যাওয়ার আগে বলে গেল— “এতে তো হবে না। অরিজিনালটা চাই।” আন্তোনিও বলল— “আপাতত এটা রাখুন। অরিজিনালটা আমি দু-এক দিনের মধ্যে এনে দেব।”
সিঁড়িতে বাসুকাকার জুতোর আওয়াজ যখন মিলিয়ে যেতে বসেছে তখন বাহার বলল— “তুমি আমার চেয়ে ছ’বছরের ছোট।” আন্তোনিও হো হো করে হেসে উঠে বলল— “আরে বাবা, ভোটার আইডিতে কি সব সময় ঠিক বয়স দেওয়া থাকে?”
— “তাহলে তোমার বয়স কত?”
— “হঠাৎ আমার বয়স নিয়ে পড়লে কেন? আমার বয়সের কোনো গাছ-পাথর নেই।”
ভোটার আইডির সূত্র ধরে বাহার আর আন্তোনিওর সম্পর্কটা তুমি-তুমিতে নেমে এলেও সেদিন ওদের আড্ডাটা আর জমল না। “অনেক লেখা বাকি পড়ে আছে” —অজুহাত দিয়ে বাহার নিজের ঘরে চলে গেল। আদৌ লেখার ধারেবারেও সে গেল না। চুপচাপ ঘরের মধ্যে বসে রইল। বয়সটা নিয়ে ওর মনের মধ্যে খচখচানি চলতে লাগল। এমন সময় আবার কেরোসিনের গন্ধ পেয়ে বাহার বাইরে এসে দেখে, সোফার কাঠের হাতল ও পায়া, সেন্টার টেবিল, সোফার সঙ্গে ম্যাচ করা আরও দুটো সোফাওয়ালা চেয়ারের হাতল আর পায়া সব কিছু আন্তোনিও কেরোসিন তেল দিয়ে মুছতে শুরু করেছে। বাহার সোজা গেল রান্নাঘরে। হরিকাকাকে গিয়ে বলল— “ও আবার সোফা মুছছে কেন? কে বলেছে ওকে এসব করতে?” হরিকাকা বলল— “রাগ করছ কেন, দিদিমুনি? আমি কি বারণ করিনি, ভাবছ? নিজের বাড়ি মনে করে যদি বাড়ির দুটো কাজ করে তাতে অসুবিধেটা কোথায়, শুনি?” বাহার উত্তর না দিয়ে ঘরে চলে এল।
রাত দশটা নাগাদ হরিকাকার গলার আওয়াজ শোনা গেল— “দাদাবাবু, খেতে দিয়ে দেব নাকি?” দাদাবাবুর কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া গেল না। পরক্ষণেই আন্তোনিওর ঘরের দরজা খোলার আওয়াজ। ঘর থেকে বেরিয়ে আন্তোনিও বলল— “হ্যাঁ, খাবার দিয়ে দাও। ম্যাডাম কোথায়? ম্যাডাম খাবে না?” ম্যাডামও সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এবং বললেন— “হ্যাঁ, আমাকেও দিয়ে দাও। খেয়ে নিই।” ডিনারের সময় ওরা মার্বেল দেওয়া গোল টেবিলেই খেতে বসল। সকালের ফাঙ্গাসের বিষয়টা ততক্ষণে বাহারের মাথা থেকে আউট হয়ে গেছে। খাওয়া শেষ হতে হরিকাকা এসে প্লেটগুলো তুলে নিয়ে গেল আর আন্তোনিওকে বলল— “দাদাবাবু, তোমার ঘরটা তো ধাওয়া-মোছা কিছুই হচ্ছে না। কাল একটা সময় করে ঘরটা একটু খুলে দিও। পরিষ্কার করে দেব।” শুনে আন্তোনিও বলল— “দরকার পড়বে না। তুমি আমায় ঝাঁটা আর ন্যাতাটা কোথায় থাকে একটু দেখিয়ে দিও। আমি নিজেই করে নেব।” হরিকাকা বলল— “ওমা এ কী কথা! তাহলে আমি আছি কী করতে?” আন্তোনিও বলল— “তোমার কাজের কি অভাব পড়েছে? সারাদিনই তো কাজ কর। আমি নিজের কাজ নিজে করে নিতেই পছন্দ করি।” সেদিনকার মতো কথাবার্তা এখানেই শেষ। তবে বাহারের একটা খটকা লাগল, আন্তোনিও কোনো ভাবেই ওর ঘরে কাউকে ঢুকতে দিতে চায় না।
রাত বারোটার সময় আবার আন্তোনিও গান ধরল— “ও মিও বাবিনো কারো …” গান শুনতে শুনতে বাহার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। এতদিন বাদে বাহারের কোনো ছেলেকে মনে ধরল আর সে কিনা বাহারের থেকে ছ’ বছরের ছোট! শুধু কী তাই? ছেলেটি বেশ রহস্যজনকও বটে।


পরের দিন বাহারের অন্য দিনের তুলনায় খুব তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেল। অনেকক্ষণ এ-পাশ ও-পাশ করার পর শেষপর্যন্ত সকাল আটটা নাগাদ বাহার বিছানা ছাড়ল। রান্নাঘরে গিয়ে দেখল হরিকাকা নেই। হরিকাকা তার মানে বাজার করতে বেরিয়েছে। এমন সময় বাহারের মাথায় একটা দুর্বুদ্ধি খেলে গেল। হঠাৎ ওর মনে পড়ল, গেস্টরুমের দরজায় একটা ফুটো আছে। সেই ফুটোয় চোখ রাখলে ঘরের ভেতরটা দেখা যায়। এতদিন কেন যে বাহারের এই কথাটা মনে আসেনি, সেটা ভেবে বাহার বেশ অবাক হল। বাহার পা টিপে টিপে আন্তোনিওর ঘরের সামনে গিয়ে হাজির হল। সেই ছিদ্রে চোখ দিয়ে সে দেখল, দরজার ঠিক বিপরীত দিকে গেস্টরুমের মধ্যে বড় বড় যে জানলা দুটো আছে তার খড়খড়ির পাল্লাগুলো হাট করে খোলা, খড়খড়ির বাইরে যে ঘষাকাঁচের জানলাগুলো আছে সেগুলো বন্ধ। জানলাগুলো যেহেতু পূর্বদিকে তাই ঘরের মধ্যে যথেষ্ট আলো ঢুকছে। কিন্তু, এসব কী দেখছে বাহার! ঘরটাকে তো আর চেনাই যাচ্ছে না। যেন অন্য কোনো জগৎ! সারা ঘর ভরে গেছে সেই সরু সরু ফাঙ্গাসে। প্রত্যেকটা ফার্নিচার থেকে থোকা থোকা ফাঙ্গাস ঝুলছে। দেখে বাহারের অন্নপ্রাশণের ভাত অবধি যেন উঠে আসতে চাইল। কিন্তু, আন্তোনিও কোথায়? সে তো খাটে নেই! তারপর বাহার যা দেখল, তাতে সেপ্টেম্বরের ভ্যাপসা গরমেও সে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। সিলিং থেকে মাকড়সার জালের মতো কী যেন নেমে এসেছে আর সেই জালের মধ্যে ডানাওয়ালা গিরগিটির মতো প্রায় ছ’ ফুট লম্বা একটা জীব শুয়ে আছে! দেখা মাত্রই, বাহার নিজের ঘরের দিকে দৌড় দিল। ঘরে গিয়েও তার কাঁপুনি থামছে না। এটা কী দেখল সে? সে কি কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে? এখন তার কী করা উচিত! “ওমা! দিদিমুনি, আজ সক্কাল সক্কাল উঠে পড়েছ তো দেখছি।” —শোনা মাত্রই বাহার চমকে উঠল। হরিকাকা বাজার করে ফিরে এসেছে। বাহারের এমন অস্বাভাবিক আচরণে হরিকাকাও একটু হতবাক হল। তারপর ঘরে ঢুকে এসে বলল— “দিদিমুনি, এমন ভয় পেয়ে গেলে কেন? তোমার শরীরটা কি খারাপ?” বাহার বলল— “না, তেমন কিছু না।”
— “তাহলে চলো, চা-জলখাবার খেয়ে নেবে চলো।”
— “আমার বমি পাচ্ছে। আমি কিছু খাব না।”
— “সেকি কথা! তাহলে ডাক্তার ডাকতে হবে তো। বাসুকাকাকে বরং খবর দিই।”
— “এর জন্য আবার ডাক্তার ডাকার কী আছে!”
হরিকাকা চলে গেল।

তখন ন’টা-সাড়ে ন’টা হবে, বাহার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। এসে দেখল, হরিকাকা রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত। বাহার আবার গেল আন্তোনিওর ঘরে উঁকি-ঝুঁকি মারতে। এ-বারে সে যা দেখল, তা আরও ভয়ঙ্কর। এই গিরগিটির মতো প্রাণীটা দেওয়ালে লিকলিক করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার মুখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে আসছে প্রায় এক হাত লম্বা জিভ। জিভ থেকে ঝরছে সবুজ রঙের লালা। বাহারের “ওয়াক” উঠে এসেছিল। কোনো রকমে মুখ টিপে ধরে সে নিজের ঘরে পালিয়ে এল। তারপর অনাবরত “ওয়াক” তুলতে লাগল। স্বাভাবিকভাবেই হরিকাকা তৎক্ষণাৎ ছুটে এল। এসে বাহারকে বেসিনের কাছে নিয়ে গিয়ে ঘাড়ে, মাথায়, মুখে জল দেওয়াল। তারপর বলল— “কোনো কথা নয়। এখন চুপচাপ শুয়ে থাকো।”
শুয়ে শুয়ে বাহারের খেয়াল হল, গোল টেবিলের যে-দিকে আন্তোনিও বসে টেবিলের সেই দিকটাতে আর আন্তোনিওর চেয়ারেই ফাঙ্গাসটা বেশি ধরেছিল। বাহার যে-দিকে বসে সে-দিকে অল্প আর বাহারের চেয়ারে নেই বললেই চলে!

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসুকাকা চলে এল। বাহারের ঘরে এসে বলল— “কী হয়েছে, বাহার মা?” বাহার বলল— “ও নিয়ে অত চিন্তা করার কিছু নেই।”
— “চিন্তা করার কিছু নেই বললে হবে?”
— “এখন ঠিক আছি … আমার ওই ছেলেটিকে নিয়ে কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে।”
— “ছেলেটি ভদ্র, ছেলেটির ব্যবহার নিঃসন্দেহে খুবই ভালো। বাকি সবটাই কেমন যেন ধোঁয়াশা। আমার তো প্রথম থেকেই ছেলেটিকে খুব একটা সুবিধের বলে মনে হয়নি।”
— “ওই কাগজটাতে যে ঠিকানা দেওয়া আছে, সেখানে গিয়ে খোঁজ নিলে হয় না?”
— “সে আমি আজই লোক পাঠাতাম।”
— “লোক নয়। চলো, আমরা দুজনে যাই।”
— “তোমার শরীর ভালো নেই। তোমায় যেতে হবে না।”
— “না বাসুকাকা, আমায় নিয়ে চলো। আমি এখন সুস্থ।”
বাসুকাকা কী যেন ভেবে রাজী হয়ে গেল। যাওয়ার আগে ওরা হরিকাকাকে বলে গেল যে ওরা একটা বিশেষ কাজে যাচ্ছে। হরিকাকা খাওয়ার জন্য বাহারকে পীড়াপীড়ি করতে লেগেছিল। বাহারকে কিছুতেই কিছু খাওয়ানো গেল না।

ঠিকানা খুঁজে পেতে আর মারিয়া রুসোর বাড়ি চিনতে বিশেষ বেগ পেতে হল না। দরজায় নক করতে কোনো সাড়া নেই। বেশ কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর বাসুকাকা আর বাহার বিফল-মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে যাচ্ছিল। দরজা থেকে সরে আসার পরই আচমকা দরজা খুলে গেল। ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন স্কার্ট-ব্লাউজ পরা মোটাসোটা এক বয়স্ক মহিলা। বেরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন— “আপনারা কারা?” মহিলা সম্ভবত বাংলা জানেন না বা বাংলায় কথা বলতে পছন্দ করেন না। তাই আলাপচারিতা চলল ইংরিজিতেই। এখানেও বাহার চুপ। যা কথা বলার বলল বাসুকাকাই। আরেকটা কথা বলার, ভদ্রমহিলার মধ্যে বিনয়ের লেশমাত্র নেই। কথা বলার ধরণটাই বেশ বাজে। বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভদ্রমহিলা ওদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।
বাসুকাকা বললেন— “আমি কি মারিয়া রুসোর সঙ্গে কথা বলছি?”
— “হ্যাঁ। কী ব্যাপার বলুন।”
— “আপনার ছেলের বিষয়ে কিছু জানার ছিল।”
— “আমার ছেলে এখানে থাকে না।”
— “হ্যাঁ, সেটা জানি। কোথায় থাকে, কী করে কিছু জানেন?”
— “না জানার কী আছে? আমার ছেলে মিলানে থাকে। এক্সপোর্ট-ইম্পোর্টের ব্যবসা করে।”
— “আচ্ছা, এখন সে কি কোলকাতায়?”
— “না, সে মিলানেই আছে।”
তারপর বাসুকাকা পকেট থেকে আন্তোনিওর ভোটার কার্ডের সেই জেরক্স কপিটা মারিয়া রুসোর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল— “দেখুন তো, ইনিই আপনার ছেলে কিনা।” মারিয়া রুসো ভ্রু কুঁচকে কাগজটা দেখলেন। তারপর বললেন— “হ্যাঁ, এই আমার ছেলে। আর কিছু?” বাসুকাকা বলল— “না, আর কিছু না।”
— “বেশ। আপনারা এখন আসতে পারেন।” বলে মারিয়া রুসো ঘরে ঢুকে মুখের ওপর দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
ইতিমধ্যে, অতি-উৎসুক এক প্রতিবেশী উঁকি-ঝুঁকি মারছিলেন। বাহার আর বাসুকাকা যে-ই গাড়িতে উঠতে যাবে তখন বাহার দেখতে পেল সেই অতি-উৎসুক প্রতিবেশী ভদ্রলোক পেছন পেছন তাদের গাড়ি অবধি চলে এসেছেন। বাসুকাকাও ব্যাপারখানা লক্ষ্য করেছিল। ভদ্রলোককে দেখে বাসুকাকা বলল— “আপনি কি কিছু বলবেন?”
ভদ্রলোক ভাঙা-ভাঙা বাংলায় বলতে লাগলেন— “আপনারা এই মহিলাকে চিনলেন কী করে?” এবারও বাহার চুপ। যা কথা বলার বাসুকাকাই বলবে। বাসুকাকা বলল— “চিনি না। চিনতে এসেছিলাম বলতে পারেন।”
— “ভদ্রমহিলা অতি অভদ্র। চার বছর হল এখানে আছে। কারো সঙ্গে মেশে না। কারো বাড়িতে যায় না। কাউকে নিজের বাড়িতে ডাকেও না। কথা বলতে গেলে বিরক্ত হয়, দুর্ব্যবহার করে।”
— “আর ওঁর ছেলে?”
— “ছেলেটি খুব ভালো। গান-বাজনা নিয়ে থাকে। যেমন সুন্দর দেখতে, তেমন ব্যবহার। মায়ের সঙ্গে তো সদ্ভাব নেই। ছেলে এলেই দুর দুর করে তাড়ায়।”
— “সুন্দর দেখতে মানে?”
— “দেখলে মনে হবে পাক্কা সাহেব। লম্বা চুল। ব্রাউন চোখ।”
— “মহিলা বললেন, ছেলে নাকি মিলানে থাকে।”
— “ডাহা মিথ্যে। ছেলে কোলকাতাতেই থাকে। কাল সকালেই তো এসেছিল।”
বাসুকাকা ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল। তারপর বাহারকে বলল— “কিছুটা রহস্যের সমাধান হল, কী বলো? মনে হচ্ছে, ছেলেটি খুব একটা খারাপ নয়।” বাহার কোনো উত্তর দিল না। ঘরে ফিরে বাহার শুনল, আন্তোনিও নাকি কোথায় বেরিয়েছে। দুপুরে ফিরে এসে লাঞ্চ করবে। বাহার দেখল, আন্তোনিওর ঘরে তালা ঝুলছে।
দুপুরে আন্তোনিও খেতে এল। বাহার হরিকাকাকে জানাল যে সে কিছু খাবে না। গোটা কয়েক সিডেটিভ খেয়ে বাহার ঘুমিয়ে পড়ল। সন্ধ্যেবেলায় হরিকাকার ডাকে বাহার ধড়মড় করে উঠে বসল। সকালে যা দেখেছে, সে আতঙ্ক তার আর কাটতেই চাইছে না। হরিকাকা ঘরের মধ্যে ঢুকে ফিসফিস করে বলল— “সে তো সন্ধ্যে থেকে দালানে ঘুরঘুর ঘুরঘুর করছে। বারবার তোমার কথা জিজ্ঞেস করছে। একটু মুড়ি-জল খাও এবার। বাইরে চলো।” বাহারের সেই এক কথা— “আমার ইচ্ছে করছে না।” হরিকাকা বাধ্য হয়ে বাহারের ঘরে জল-মুড়ি দিয়ে গেল। দু-চামচ খেয়ে বাহার আর খেতে পারল না। রাতেও সেই না-খাওয়া।

রাত বারোটার সময় আবার সেই গান— “ও মিও বাবিনো কারো …” বাহার অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, যার কন্ঠ এত সুমধুর সে কেন এমন কুৎসিত একটা জীব! একটা দানবীয় গিরগিটির সঙ্গে এক বাড়িতে থাকা— একি কম আতঙ্কের? আন্তোনিও কী সেটা বড় কথা নয়। ভয়ের বিষয় হল, আন্তোনিও কী পারে আর কী পারে না— তা বাহার জানে না। বাহার কেন, এ-পৃথিবীর কেউই জানে না। এসব ভাবতে ভাবতে বাহারের চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল। ঘরে আলো আর নেভানো হয়নি। কিছুক্ষণ বাদে চোখ মেলে দেখে লোডশেডিং চলছে। এ অঞ্চলে বড়-সড় ফল্ট না হলে সাধারণত লোডশেডিং হয় না! ঠিক সেই সময় বাহারের চোখে পড়ল, বাহারদের তো পুরোনো দিনের খাট, মশারি টাঙানোর ব্যাটম থেকে আন্তোনিও উল্টো হয়ে ঝুলে আছে! তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে সবুজ লালা-ঝরা এক হাত লম্বা জিভ। দেখে বাহার চিৎকার করে উঠল। বিছানা থেকে নামতে গিয়ে দেখল, সারা মেঝে ভর্তি হয়ে গেছে সেই সরু সরু ফাঙ্গাসে! খাট থেকেও থোকা থোকা ফাঙ্গাস ঝুলছে। বাহার পাগলের মতো চিৎকার করছে। কিন্তু, কেউ আসছে না। তারপর হঠাৎ দেখল, আলো চলে এসেছে। হরিকাকা দরজা ধাক্কাচ্ছে আর ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করছে— “কী হল? কী হল? দিদিমুনি, দরজা খোলো!” পাশ থেকে (দরজার বাইরে) আন্তোনিওর গলাও শোনা গেল— “ম্যাডাম কী হয়েছে? খুব চিন্তা হচ্ছে। দরজা খোলো।” বাহার অবাক হয়ে দেখল, খাটের ব্যাটম থেকে আন্তোনিও উধাও। সারা ঘরে কোথাও কোনো ফাঙ্গাস নেই। এটা কি তবে সত্যিই স্বপ্ন ছিল? বাহার তখনও হাঁপাচ্ছে। কোনো রকমে এসে দরজা খুলল। তারপর আরও খানিকক্ষণ হাঁপিয়ে নিয়ে বলল— “আচ্ছা, একটু আগে কি কারেন্ট চলে গিয়েছিল?” হরিকাকা আর আন্তোনিও দুজনে সমস্বরে বলল— “কই না তো!” দুজনে অনাবরত জিজ্ঞেস করতে থাকল, বাহার কেন ওইভাবে চেঁচাল। বাহার প্রথমে উত্তর দিতে চায়নি। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আন্তোনিওর চোখে চোখ রেখে বলল— “আমি দেখলাম, তুমি আসলে মানুষ নও। ডানাওয়ালা গিরগিটির মতো কিম্ভুত একটা জীব। তুমি তোমার ঘরের সিলিং থেকে মাকড়সার ঝুলের মধ্যে ঝুলে ঘুমাচ্ছ। তারপর দেওয়াল বেয়ে টিকটিকির মতো চরে বেড়াচ্ছ। তোমার এক হাত লম্বা জিভ। আর সেই জিভ থেকে সবুজ সবুজ লালা ঝরে!” শোনামাত্র আন্তোনিওর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ওদিকে হরিকাকা সব শুনে যেন ধরে প্রাণ ফিরে পেল, বলল— “অ তাই বলো! ভয়ের স্বপ্ন দেখেছ। গ্যাস গ্যাস আর কিচ্ছু না। সকাল থেকে না খেয়ে থাকবে তো আর কী হবে? এখনও বলছি, চলো, দুটি মুখে দাও।” আন্তোনিও-ও ম্রিয়মান কন্ঠে অনুরোধ করল— “প্লিজ কিছু খেয়ে নাও। তোমার কোনো ভয় নেই। বিশ্বাস করো ভয়ের কিচ্ছু নেই।” বাহার কারো কথায় পাত্তা দিল না। দরজা বন্ধ করে আরও দুটো সিডেটিভ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।


অন্যান্য দিনের মতো সকাল দশটা নাগাদ বাহারের ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠেই গত রাত্রের আন্তোনিওর সেই করুণ আকুতির কথা মনে পড়ে গেল— “তোমার কোনো ভয় নেই। বিশ্বাস করো ভয়ের কিচ্ছু নেই।” আন্তোনিওর জন্য বাহারের খুব খারাপ লাগতে শুরু করল। ঠিক তখনই মনে পড়ল, বাসুকাকা বলেছিল, অর্জুনের সঙ্গে কোন এক নাগকন্যার বিয়ে হয়েছিল নাকি! বাহার মোবাইল থেকেই গুগল সার্চ দিল। হ্যাঁ, বাসুকাকা ঠিক কথাই বলেছিল, সেই নাগকন্যার নাম উলুপি। অর্জুন আর উলুপির একটি পুত্র সন্তানও হয়। কিন্তু, বাহার এসব জেনে কী করবে? সাত-সকালে উলুপিকে নিয়ে পড়ল কেন? ভেবে বাহার নিজের মনেই হাসতে লাগল। আজ বাহার একটু ভালো আছে। উঠে দরজা খুলে বেরতে যাবে, এমন সময় চোখে পড়ল একটা সাদা রঙের খাম, দরজার তলা দিয়ে গলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাহার তাড়াতাড়ি করে খামটা খুলল। খামের মধ্যে কিছু টাকা আর একটা চিঠি। টাকাটা বাহার গুনেও দেখল না। চিঠিটা খুলল। ইংরিজিতে লেখা। কী সুন্দর হাতের লেখা! চিঠিটি বাংলায় অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায় তা মোটামুটি এই রকম—
“প্রিয় বাহার,
আমি যা হই, যেমনই হই, তোমার বা এই বাড়ির অন্য কারোর কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্য আমার ছিল না। কিন্তু, আমি তোমার ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে চাই না, তোমায় অসুস্থ দেখতে চাই না, চাই না তোমার রাতের ঘুম কেড়ে নিতে। তাই চলে যাচ্ছি। আমায় খোঁজার চেষ্টা করো না।
এ-ভাবে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা আমার ছিল না। তাই আগে থেকে কিছু জানাতে পারিনি। সেইজন্য, পুরো মাসের টাকাটাই দিয়ে গেলাম। আর ঘরটাও পরিষ্কার করে যেতে সময় পেলাম না। তাই এর সঙ্গে অতিরিক্ত আরও হাজার টাকা রেখে গেলাম। ঘরটা পরিষ্কার করিয়ে নিও।
আর একটা কথা বলে যেতে চাই, এ-ভাবে দরজার ফুটো দিয়ে অন্যের ঘরে উঁকি-ঝুঁকি মারাটা ভালো মেয়ের লক্ষণ নয়। (বলে চোখ মারার একটা স্মাইলি আঁকা) পারলে ওই ফুটোটা মেরামত করিয়ে নিও।
আমার ক্ষমা করে দিও।
ইতি তোমার বিশ্বস্ত
আন্তোনিও”
কাল দরজার ছিদ্র দিয়ে আন্তোনিওর স্বরূপ দেখে বাহার যতটা না ভেঙে পড়েছিল এই চিঠি পেয়ে সে তার থেকেও বেশি ভেঙে পড়ল। চুপচাপ মেঝেতে বসে রইল অনেকক্ষণ। বাইরে বাসুকাকার গলা শোনা যাচ্ছে। চিঠিটা নিজের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে খামটা আর টাকাগুলো নিয়ে বাহার বাইরে বেরিয়ে এল। এসে বাসুকাকাকে বলল— “ছেলেটি চলে গেছে।”
— “চলে গেছে মানে?”
— “বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।”
— “বাঁচা গেছে। ক’দিন ধরে চারবেলা অন্ন-ধ্বংস করে গেল এই যা।”
— “না, পুরো মাসের টাকা দিয়ে গেছে। সঙ্গে হাজার টাকা এক্সট্রা।”
টাকাগুলো বাহার বাসুকাকার হাতে দিল। বাসুকাকা ঝটপট টাকাগুলো গুনে ফেলল। তারপর বলল— “হাজার টাকা বেশি কেন?”
— “ঘর পরিষ্কার করিয়ে নেওয়ার জন্যে।”
ইতিমধ্যে হরিকাকা এসে উপস্থিত হয়েছে। হরিকাকা বলল— “সেকি! কখন চলে গেল? আমি তো সেই কোন ভোরে উঠেছি!” বাসুকাকা বলল— “বাহার মা জানে, বাহারকে বলে গেছে।” বাহার বলল— “না আমায় বলে যায়নি। সকালে উঠে দেখলাম এই খামটা। তারপর সবটাই আমার আন্দাজ।” বাসুকাকা তখন বলল— “ভেতর থেকে ছিটিকিনি দিয়ে আবার পাইপ বেয়ে নেমে পালায়নি তো?” হরিকাকা বলল— “হ্যাঁ, চলুন তো দেখি।”
ওরা গিয়ে দরজায় এক ঠেলা মারতেই দরজা খুলে গেল। তারপর দুজনেই আর্তনাদ করে, পিছনে সরে এল। বাহার তো সবই জানে। সে গোল টেবিলে নির্বিকার চিত্তে বসে রইল। হরিকাকা হাঁক পাড়ল— “দিদিমুনি, একবার এসো। দেখে যাও ঘরের কী অবস্থা!” বাসুকাকা স্বগতোক্তি মতো করে বলল— “আচ্ছা, তাই বলি, ঘর পরিষ্কার করানোর জন্য এক্সট্রা হাজার টাকা কেন!” বাহার নড়েচড়ে গেস্টরুমের সামনে গেল, না দেখার মতো করে ঘরটা দেখল, তারপর বলল— “চলো এখান থেকে। আমার বমি পাচ্ছে।” হরিকাকা গেস্টরুমের দরজাটা বন্ধ করে দিতে দিতে বলল— “একেই বলে, ভগবান আছে … ভগবান ঠিক স্বপ্ন দিয়ে দিদিমুনিকে স-ব জানান দিয়েছিল … ওই স্বপ্নের কথাটা শুনেই ছোঁড়াটা ভেগেছে।” বলা বাহুল্য, বাসুকাকা কিছুই বুঝতে পারছিল না। হরিকাকা তখন আগের রাতের ঘটনাটা নিজের মতো করে বলল।
হরিকাকা চলে যেতে বাহার বাসুকাকাকে বলল— “একবার ওই মারিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখবে নাকি?” বাসুকাকা বলল— “গিয়ে কোনো লাভ হবে না।”
— “তাও, রহস্যটা কিছুটা হলেও তো উদ্ধার হবে।”
— “বেশ চলো।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা বেরিয়ে পড়ল। মারিয়া রুসোর বাড়িতে পৌঁছেও গেল। গিয়ে দেখল, যথারীতি ভদ্রমহিলার ঘরে তালা ঝুলছে। সেই অতি-উৎসুক প্রতিবেশীর ঘরে গিয়ে বাহার বেল টিপল। অতি-উৎসুক বেরিয়ে এসে হেসে বলল— “আরে আপনারা!” বাহার জিজ্ঞাসা করল— “এই ভদ্রমহিলা কোথায় গেছে কিছু জানেন?” ভদ্রলোক বললেন— “হ্যাঁ, জানি তো। ভোররাতে ছেলে এসেছিল। তারপর একগাদা ব্যাগ-ফ্যাগ, ট্রলি-ফলি নিয়ে কোথায় যেন চলে গেছে।” বাহার আবার জিজ্ঞাসা করল— “কোথায় গেছে কিছু বলতে পারবেন?” ভদ্রলোক বললেন— “বলল তো “ছেলের সঙ্গে মিলানে চলে যাচ্ছি।” বাহার বলল— “আপনার সঙ্গেই কথা হয়েছে?” ভদ্রলোক বললেন— “হ্যাঁ, ম্যাডাম।” বাহার আবার বলল— “আপনিই তো বলেছিলেন ওঁর ছেলে মিলানে থাকত না। কোলকাতাতেই থাকত।” ভদ্রলোক বললেন— “আমাকে যা বলে গেছে, আমি তা-ই আপনাদের বললাম।” বাহার তখন বাসুকাকার দিকে সরে এল। বাসুকাকা বলল— “পুলিসকে এবার খবর দেওয়া দরকার। তুমি আর “না” করো না।” পুলিসকে জানানোর ব্যাপারে বাহার মন থেকে তখনও সায় পাচ্ছিল না। তাও সে বলল— “হ্যাঁ, তুমি যেটা ভালো বোঝ তাই করো।”
বাহারের বাবা কোলকাতার একজন বিশিষ্ট ধনীব্যক্তি ছিলেন। আর সেই অঢেল সম্পত্তি সামলাতে সামলাতে বাসুকাকার পুলিসের ওপরমহল অবধি জানা-শোনা হয়ে গেছে। বাসুকাকার একটা ফোনেই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এক ভ্যান পুলিস এসে হাজির হল। অতি-উৎসুক প্রতিবেশীটি পুলিস দেখা মাত্রই ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। একজন ইন্সপেক্টর গদগদ ভঙ্গীতে বাসুকাকার সব কথা শুনল। বাহারের এসবে মন নেই। সে রাস্তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে, জানে অসম্ভব, তাও ভাবছে, আন্তোনিও যদি আরেকবার ফিরে আসে। এমন সময় শোনা গেল, সেই ইন্সপেক্টরটি বলছেন— “দরজা ভেঙে ফেলতে হবে।” দরজা ভাঙব বললেই তো আর ভাঙা যায় না। তার জন্য নাকি কীসব কাগজপত্র রেডি করতে হবে। বাসুকাকা বাহারকে বলল— “তুমি কি বাড়ি ফিরে যাবে?” বাহার ঘাড় নেড়ে “না” বলল। বাসুকাকা তখন বলল— “তাহলে গাড়িতে গিয়ে এসি চালিয়ে বসো। এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছ তো! আবার শরীর খারাপ করবে।” বাহার এবারে কোনো উত্তরই দিল না। বাসুকাকা তারপর এরকম প্রায় জোর করে নিকটবর্তী এক ক্যাফেতে বাহারকে কোল্ড কফি খাওয়াতে নিয়ে গেল। ফিরে এসেও বেশ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। তারপর প্রয়োজনীয় নথিপত্র এল। এবার দরজা ভাঙার পালা। দরজা ভাঙার আওয়াজ শুনে আসে-পাশের ঘর থেকে অনেকেই বেরিয়ে এলেন। অবশেষে দরজাটি ভাঙা পড়ল। ভেতরে যা দৃশ্য দেখা গেল, তাতে অনেক প্রতিবেশীই “হালেলুইয়া হালেলুইয়া” করতে করতে নিজের ঘরের দিকে ছুটল। পুলিসেরাও আঁতকে উঠে চার পা পিছিয়ে আসল। গোটা ঘরের সিলিং থেকে মাকড়সার ঝুলের মতো কী এক পদার্থ ঝুলছে। সারা ঘরময় সেই সরু সরু ফাঙ্গাস। ইন্সপেক্টরটি বললেন— “আপনারা নিশ্চিত, এই ঘরে আজ ভোর অবধিও মানুষ বাস করেছে?” বাসুকাকা বলল— “বিশ্বাস না হলে এখানকার অধিবাসীদের জিজ্ঞাসাবাদ করুন। আর একবার আমাদের বাড়িতেও চলুন। সেখানে গিয়ে একবার সচক্ষে দেখে আসবেন যে আমাদের ঘরটিকেও কী করে দিয়ে গেছে।” ইন্সপেক্টর বললেন— “অবশ্যই দেখে আসব। যেমন আছে তেমনই রেখে দিন। আপাতত পরিষ্কার করাবেন না … কিন্তু, এরা কি আদৌ মানুষ?” বাসুকাকা বলল— “সে নিয়ে আমারও সন্দেহ আছে।”

বাড়ি ফিরে বাহার খাওয়া নিয়ে আবার অশান্তি শুরু করল। “বমি পাচ্ছে” “বমি পাচ্ছে” করে দরজা বন্ধ করে দিল। বাহার বুঝতে পারছে সবকিছুই হাত থেকে বেরিয়ে গেছে। বিকেলে পুলিস এসে ঘুরে গেল। হরিকাকাকেও কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করল। পুলিস চলে যাবার পর বাহার জেমসকে ফোন করে বলল— “জুঁইফুল হবে?” জেমস হল মারিহুয়ানার ডিলার। বাইরে তার একখানা সাজানো-গোছানো ফুলের দোকান আছে। সরাসরি মারিহুয়ানার কথা বললে জেমস তেড়ে খিস্তি দিয়ে ফোন কেটে দেয়। তাকে কোডে বলতে হয়। কোয়ালিটি অনুযায়ী জেমসের মারিহুয়ানার বিভিন্ন নাম অর্থাৎ কোড আছে। যেমন— “জুঁইফুল” মানে হল, জলপাইগুড়ি থেকে আনা উৎকৃষ্ট মানের মারিহুয়ানা। বনগাঁয়েরটার নাম “বেলফুল”। আরও কী কী যেন বেশ আছে। সবচেয়ে সস্তারটার নাম “গাঁদা”। বাহার নিলে “জুঁইফুল”-ই নেয়। জেমসের ডেলিভারি-বয় এসে কিছুক্ষণের মধ্যেই “জুঁইফুল” দিয়ে চলে গেল। তারপর থেকে বাহার নেশায় মত্ত। রাতের দিকে হরিকাকা এসে দরজা ঠেলেছিল। বাহার ভেতর থেকে বলেছে— “তুমি যাও, আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।”
নেশার ঘোরে বাহার তখন প্রায় বেহুঁশ। ঠিক রাত বারোটা। আবার সেই গান— “ও মিও বাবিনো কারো …” বাহার বুঝল, এ তার অতিরিক্ত নেশার ফল। সে ভুল শুনছে। প্রকৃতপক্ষে কেউ এখন গান গাইছে না। এমন সময় বাহারের দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। বাহারের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। কিছুটা ভয়ে, কিছুটা আনন্দে, টলমল করতে করতে বাহার দরজার কাছে গেল। জিজ্ঞাসা করল- “কে?” বাইরে থেকে হরিকাকার গলার স্বর শোনা গেল— “আমি হরিকাকা। একবারটি দরজা খোলো।” বাহার দরজা খুলল। হরিকাকা বলল— “ও দিদিমুনি, শুনতে পাচ্ছ?” বাহার বলল— “আমি যা শুনছি, তুমিও কি তাই শুনছ?” হরিকাকা বলল— “ছাদের ওপর থেকে আওয়াজটা আসছে। মানে সে ছাদে!” দুজনে দালানের মধ্যে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বাহারের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। সে মনে মনে বলতে লাগল— “আমাকে ক্ষমা করে দিও, আন্তোনিও। শুধু বলা হল না, আর কোনোদিন বলা হবেও না— তোমাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। খুব।”

Spread the love

Check Also

ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’

 সৌমিককান্তি ঘোষ   কাশীনাথ বামুন গত সংখ্যার পর—   ২ “ঠাকুর এসেছে গো” উঠোন থেকে …

ধারাবাহিক ‘ভাষার ভাসান’, আজ ‘ভটভটিতে ভটচাজের বউ, আর্যর বাংলায় আগমন’

 সংকল্প সেনগুপ্ত: বাংলা ভাষা জীবনানন্দে (দাশ) যা সতীনাথে (ভাদুড়ী) তা না, হুতুমে যেমন তার থেকে …

রবিবারের কবিতা, মিহির সরকার

 মিহির সরকার মৃত  চন্দ্রবোড়া তখন আমাদের নিত্য-নতুন ভাঙা-গড়ার খেলা আমাদের নিয়ে বাতাসে বাতাসে রঙিন গল্প-বেলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *