Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / গল্প / ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’

ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’

 সৌমিককান্তি ঘোষ

 

কাশীনাথ বামুন

কাশীনাথ দরজা খুলতেই পশ্চিমের পড়ন্ত আলোয় মায়ের মুখটা চিক্ চিক্ করে উঠলো। “কী রে বেটি তোর রাগ হয়েছে নাকি? সকালে আসতে পারিনি,, শরীরটা ভালো নেই, ঠিক যুত পাচ্ছি না।” নিজের মনেই বিড়বিড় করতে থাকে কাশীনাথ। চাবি যুদ্ধ তালাটা ভিতরের জানলার নিচে রাখে। হাঁটুতে চাপ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, বয়স হয়েছে। আজকাল হাঁটু, কোমর কোনটাই আর বশে থাকে না। বড় করে একটা শ্বাস নেয়, জানলার উপরে ঝোলানো চামরটায় হাত বোলায়। একবেলা আসিনি তাতেই আবার ধুলো পরে গেল নাকি; আড় চোখে দেখে নেয় কোশাকুশিগুলো মায়ের পায়ের কাছে উপুর করা, যেমনি কাল রেখেছিল তেমনি আছে। মায়ের ডানদিকের জানলাটা খুলে দেয় সে।

দূর দিগন্ত বিস্তৃত শুধুই সবুজ মাঠ, কোথাও কোথাও শুকনো মাটি কাটা খেত, বেঁকে যাওয়া খালের পাড়, লাল মোরামের রাস্তার পাশে কলা পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে সদানন্দ চাষির মাটির দোতলা বাড়ি; খানিকটা পরে কয়েকটা পাকা বাড়ি, আরও দূরে চাইতে চায় সে, নাহ্ ধোঁয়া ধোঁয়া লাগে। জানলার লম্বা লম্বা জেলখানার মতো রড ধরে শরীরটাকে নিচু করে উপরের আকাশ টাকে দেখার চেষ্টা করে। ঈশান কোণে কালো মেঘ, কয়েকটা সাদা বক কার উপরে ভেসে চলেছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কাশীনাথ বামুন। বিদ্যুত ঝলকে ওঠে, হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে কাশীনাথ। দুটি গোলাকার বিশাল মেঘপুঞ্জীর মাঝখান চিড়ে বিদ্যুতের ঝলকানি যেন সাঁওতাল মেয়ের পেলব স্তন যুগলের মাঝে একটুকরো সাদা কাপড়। বড়ো ভালো লাগে প্রকৃতির এই খেলা। বর্ষার শুরু, মেঘ তো জমবেই, অনেক সময় বিনা মেঘে গর্জন হবে, আবার বৃষ্টিও হবে। আলো আঁধারির লুকোচুরি মানুষের জীবনের মতোই ভালো-মন্দে, উচিত-অনুচিতে বয়ে যাবে। শুধু সময় কারুকে রেয়াত করে না। মায়ের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে না। এ বেটি সব জানে, সব দেখে, তবুও পাষাণ; নাহ্ সে তো আর রামকৃষ্ণ বামাখ্যাপা নয় যে মা তাকে সব বুঝিয়ে দেবে, সে পাপি-তাপি মানুষ। তার দেহে মনে খিদে থাকে তাতে সে সাড়া দেয়। মনে পড়ে যায় অনেক কিছুই। সে সব সে মনে আনতে চায় না। নয় নয় করে তিন কুড়ির উপর বয়স হল তার। এই জানলা দিয়েই জীবনের অনেকটা সে দেখেছে। মা তার সাক্ষী। এই গ্রাম, গ্রামের মানুষ, খালবিল, ঝড়-ঝঞ্ঝা, জীবন-মৃত্যু সবই বড় চেনা কাশীনাথের। গ্রামের মানুষ, ছেলে বুড়োদের আড্ডা, সবই তো এই মন্দিরের লাল শান বাঁধানো দাওয়ায়। সবই তার কানে আসে। সে তো শুধু মায়ের পূজারী নয়, সে মায়ের ছেলে, বেটা বটে।

জানলা থেকে সরে আসে কাশীনাথ। মায়ের বিগ্রহের পিছন দিক দিয়ে বাঁ দিকের জানলার নীচে কলসি থেকে জল নেয়, কান পাতে, বন্ধ জানলার ওপাশ থেকে কোন শব্দ-গন্ধ আসছে কি না; আজ বোধ হয় একটু শান্তই থাকবে। হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়ায় কাশীনাথ। মায়ের সন্ধ্যা আরতির ব্যবস্থা করতে হবে। মায়ের গা থেকে কয়েকটা শুকনো ফুল ঝেড়ে দেয় সে। হঠাৎ কাঠ পড়ার আওয়াজ আসে, এ বড় পরিচিত আওয়াজ, দিনের চার-পাঁচবার এ আওয়াজ কানে আসবেই কাশীনাথের। সকালে কাশীনাথ আসেনি আওয়াজও পায়নি, পড়ন্ত বিকালে এই প্রথম। ভিতর থেকে বেড়িয়ে আসে কাশীনাথ। কালু তখন ভ্যান রিক্সো থেকে মরা পোড়া কাঠগুলো শশ্মানের মাঝ বরাবর ছুঁড়ছে। ‘আহ্ একটু আস্তে আস্তে ছোঁড়া যায় না! তোর সবেতেই তাড়াহুড়ো।’

‘হ্যাঁ তা তো বলবেই, সকাল থেকে একটাএ মরেনি। এই এখন সবে একটা হল। এর মধ্যে আরও একটা খবর এসেছে। নিতাইদের পাড়ায়। আমার এখন একদম সময় নেই ঠাকুর, তোমার ডোমটা গেল কোথা? পর পর পোড়াতে হবে তো। শালা আজকে যা মাল খাবে না।’ কালু আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ‘তুই থামবি, যা এখন,’ বলে কাশীনাথ মায়ের ঘরে ঢোকে।


অনাড়ম্বর ভাবেই শুরু হয় আরতি। গ্রামের প্রান্তেই শশ্মান কালী। গেরস্থ খুব একটা আসে না। মূলত শশ্মান যাত্রীরাই এখানে ভিড় করে, তাও দায় পরে। নাহলে এদিকটা নির্জনই থাকে। এক হাতে ঘন্টা আর এক হাতে পঞ্চপ্রদীপ নিয়ে কোনরকমে উঠে দাঁড়ায় কাশীনাথ। মায়ের বুকের কাছে প্রদীপ ঘোরাতে ঘোরাতে ঘন্টা নাড়তে থাকে। খানিক পরেই ছন্দহীন ঘন্টার আওয়াজকে বাতাসে মিলিয়ে হরিবোল রব ওঠে। ‘ওই এল বোধ হয় মরা মানুষ’। সারা জীবনের সব ক্লেদ, মেদ, জ্বালা যন্ত্রণা নিমেষে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। অস্থি নিয়ে বাড়ি চলে যাবে কাছের মানুষজন। একদিন তারও শেষ। ভুলে যাওয়া, হয়তো বা নিতান্তই ভয় ভীতি কিম্বা কর্তব্যের বশে তা বিসর্জিত হবে কোনও এক মজে যাওয়া খাল-বিলে। এভাবেই মানুষের জন্ম-মৃত্যু, মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া।কাশীনাথের দীর্ঘ জীবনে এ উপলব্ধি এখন দৃঢ়তা পেয়েছে। সে বোঝে জন্ম মৃত্যু নিতান্তই কাকতালীয়। সম্পর্কই শেষ কথা, ভালবাসাই পরিনতি। যে ভাবে মা তার শিশুকে ভালোবাসে, যেভাবে বৃদ্ধ পিতাকে সোমত্ত ছেলে কাঁধে নিয়ে দৌড়ায়! কাশীনাথের হঠাৎই চোখ পরে মায়ের দিকে, মা মিটিমিটি হাসে। কাশীনাথ লজ্জা পায়, ‘জানি মা আমি অনেক পাপ করেছি, তুই আর লজ্জা দিস না।’ ধীরে ধীরে কাশীনাথ আসনে বসে, ‘কি গো ঠাকুর আরতি হলো?’ দরজায় হেলান দিয়ে সাধু ডোম উঁকি দেয়। পিছন ফিরেই হাতটা নাড়ে কাশীনাথ। ইঙ্গিত স্পষ্ট, সাধু বোঝে এখন নয়, আর একটু অপেক্ষা করতে হবে। আরতি শেষ হবে তারপর। মৃতদের বাড়ির লোকেদের হাত নেড়ে সেকথা বুঝিয়ে দেয় সাধু ডোম। সাধু ভাবে আশ্চর্য এই কাশীনাথ বামুন। তার সম্মতি ছাড়া একটাও মরা মানুষের পোড়বার অধিকার নেই ,অথচ সে একটি বারের জন্যও শশ্মান পানে আসে না। একটা মরারও মুখ দেখে না। এক পয়সা নেয় না, এমনকি মায়ের ওদিককার জানলাও খোলে না। তবু কেন জানি না কী কারণে লোকটাকে দেখলেই ভক্তি জাগে, তাকে নমস্কার করতে ইচ্ছা হয়। ঠাকুর বলে ডাকতে ভালো লাগে এই সাধু-কালুদের মতো মরা ঘাঁটা লোকগুলোর।

আকাশ ঘোর কালো করে এল। টিপটিপ করে মনে হয় দু’ফোঁটা পরতেও শুরু করেছে। চামর বুলিয়ে মায়ের আরতি শেষ করে কাশীনাথ। দরজায় হেলান দেয় সাধু ডোম ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে তার আজ বড় ভালো লাগছিল। কালোপানা মুখে প্রদীপের আগুন দুই গালে চকচক করে উঠছিল। এ মা বড় জাগ্রত। সব দেখতে পায়, সব কথা শোনে। এই তো সেদিন একটু বেশি রাতে সাধু যখন শশ্মানের ছাইগুলোকে টেনে টেনে জড়ো করছিল তখন ঐ অশ্বত্থ গাছের তলায় এই মা যেন আবছা হয়ে উঠল। সাদা সাদা ধোঁয়ায় মায়ের কালো ল্যাংটা গা, যেন এদিকেই তাকিয়ে আছে। এমন তেলপানা কালো মুখে টকটকে লাল জিভ। সাধুর গায়ে যেন কাঁটা দেয়। ‘যা শুরু করে দে, কাঠ ভিজে যাচ্ছে। পুড়তে সময় লাগবে, পারলে কালুকে ডেকে নে।’ কাশীনাথের গলার আওয়াজে ঘোর কাটে সাধু ডোমের। সে এক লাফে সিঁড়ি টপকে শশ্মানের ভিড়ে হারিয়ে যায়। মায়ের পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায় কাশীনাথ। ‘পোড়াতে এসেও এত হ্যাপা, তার উপর যদি কাঠ ভিজে যায় আরেক কেলো। শালা বেঁচে থাকতেও কষ্ট দিয়েছে, পোড়াতেও কষ্ট! মানুষের অভিযোগের শেষ নেই।’ নিজের মনেই আওড়াতে থাকে সে। ‘বাঁচা, মরা সবই চলে, অভিযোগও অন্তহীন। মা এদের শান্তি দে মা। তোর শশ্মান দিয়েই তো ওরা স্বর্গে যাবে। সারাজীবন অনেক পাপ, অনেক কষ্ট করেছে এবার অন্তত এদের ছেড়ে দে মা। কেউ জেনে পাপ করে না, বড়ো জ্বালা সেখানে, দেহ-মনের তাড়নায় পাপ আসে। শরীর মনে লেপ্টে থাকে। সময় হলে তবেই শরীরটাকে ছাড়ে। সবই তোর লীলা। কেন আমাদের নিয়ে এমন খেলা খেলিস! আমাদের বোধ-বুদ্ধি কম, অভাব-অনটনের সংসার। যদি আর না পাই, সাদা হাতে তো সব পাওয়া যায় না। সবাই সমান হয় না মা। আর এই যে দেহটা দিয়েছিস, মন দিয়েছিস, আগল খুলে রেখেছিস, বেঁধে তো দিসনি।’ কাশীনাথ চামর ঝুলিয়ে বন্ধ জানলার দিকে এগিয়ে যায়।


জানলা টা খুলবে কিনা সে একবার ভাবল। আঙটায় হাত দিয়ে একবার টেনে দেখল। নাহ্, শশ্মানের পোড়া মানুষের গন্ধ সে আর সইতে পারে না। মায়ের দিকে আর একবার তাকিয়ে বেড়িয়ে এল কাশীনাথ। মন্দিরের দরজায় হুড়কো টেনে চাবি দিল। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় শশ্মানের দিকটায় চোখ গেল তার। ভিড় খানিকটা পাতলা হয়ে এসেছে, মৃতদেহের হালকা কাঠামোটা তখনও দাউ দাউ করে জ্বলছে। কালু তার ভ্যান রিক্সোর উপরে বসে। সাধু হাতে লম্বা বাঁশের লাঠিটা নিয়ে অপেক্ষা করছে। একটু পরেই এই লাঠির খোঁচাতেই সে পোড়া দেহ থেকে ছাই খসিয়ে দেবে। খুঁজে বেড়াবে অস্থি, নাভি। এ দৃশ্য কাশীনাথের নিত্যদিনের, তবু কেন জানি না মনে হয় এ বুঝি এখনি হল। মনের বিভিন্ন অলিগলি, চোরা পথ কাশীনাথ জানে না। মনের গভীরে কত কী চলে সব কি সে বুঝতে পারে! কত তার রঙ, সাদা, কালো, হলদে। সবেরই আলাদা আলাদা মানে আছে। জন্ম, মৃত্যু, যৌবন সবের সঙ্গে সঙ্গে ঐ রঙগুলোর পরিবর্তন ঘটে। বেড়ে কমে ছেয়ে যায় সারা শরীরে মনে।

মন্দির থেকে বেড়িয়েই মোরামের লাল রাস্তা। কাদা কম। কাশীনাথ ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে। খানিকটা পথ গেলেই তার বাড়ি। সদানন্দের বাড়ির পরেই। সদানন্দ তার ছোটবেলার বন্ধু। স্যাঙাতও বলা চলে। কিন্তু জীবন তো আর এক ভাবে চলে না। সদানন্দ গেরস্থ জীবনে গেল আর কাশীনাথ ভট্টাচার্য এল পারিবারিক পুরুত গিরিতে। হাঁটতে হাঁটতে কত কী মনে পরতে লাগলো। সেই আল ধরে সদানন্দের সঙ্গে দৌড়ানো, হাজরাদের বাড়িতে ফুল চুরি করা, গায়ে তেল মেখে লাঠি খেলা, খেজুর গাছে উঠে হাঁড়ির রস খেয়ে নেওয়া।  আর, আর ঐ মুসলমান পাড়া। নাহ্ সে কথা মনে আনতে চায় না কাশীনাথ। মা, আমায় ক্ষমা কর মা। মনটা বড় অস্থির লাগে তাই ঐ সব মনে আসে। কাশীনাথ ঘাড় তুলে তাকায়, দূর প্রান্তে ধূ ধূ করছে মাঠ আর মাঠ। গোয়ালাদের ছেলেটা মাঠের আল দিয়ে গরু চরিয়ে ফিরছে, হাতে তার লাঠি। দিগন্ত রেখায় তখন সাদা কুয়াশার আস্তরণ। মাঝে মাঝে দু’এক জায়গায় শুধু ঘন হয়ে থাকা কিছু লম্বা গাছের সারি। মনটা আনচান করে ওঠে। সদানন্দের দাওয়ায় একটু বসলে হয়, এক ছিলিম বা একটা বিড়ি খাওয়া যেতে পারে। এগিয়ে যায় কাশীনাথ। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় সদানন্দের বাড়ির উঠোনে বাঁধা বাছুরটা চেঁচিয়ে ওঠে। কাশীনাথ তার গায়ের কাপড়টা শক্ত করে চেপে ধরে। সদানন্দের ঘরের সামনে গিয়ে হাঁকে, ‘সদা আছিস না কি রে?’

(ক্রমশ)

Spread the love

Check Also

ধারাবাহিক কাহিনি, ‘কাশীনাথ বামুন’

 সৌমিককান্তি ঘোষ   কাশীনাথ বামুন গত সংখ্যার পর—   ২ “ঠাকুর এসেছে গো” উঠোন থেকে …

ধারাবাহিক ‘ভাষার ভাসান’, আজ ‘ভটভটিতে ভটচাজের বউ, আর্যর বাংলায় আগমন’

 সংকল্প সেনগুপ্ত: বাংলা ভাষা জীবনানন্দে (দাশ) যা সতীনাথে (ভাদুড়ী) তা না, হুতুমে যেমন তার থেকে …

রবিবারের কবিতা, মিহির সরকার

 মিহির সরকার মৃত  চন্দ্রবোড়া তখন আমাদের নিত্য-নতুন ভাঙা-গড়ার খেলা আমাদের নিয়ে বাতাসে বাতাসে রঙিন গল্প-বেলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *