সুদর্শনচক্রের স্রষ্টা কে? বিষ্ণুই বা সেটা পেলেন কেমন করে? পড়ুন আশ্চর্য কাহিনি।

Tuesday, December 18th, 2018

পার্থসারথি পাণ্ডা : 

অসুরেরা বড্ড ভুঁইফোড় জীব। জল-রক্ত যথা তথা থেকেই তারা যখন তখন গজিয়ে ওঠে। সেভাবেই একদিন জল থেকে জলন্ধর নামের এক অসুর জন্ম নিল। জন্ম নিয়েই অসুরের যা কাজ, তাণ্ডব করার জন্য ব্রহ্মার কাছ থেকে তাবড় একখানা বর বাগাতে ঘোর তপস্যা শুরু করল। কারও তো জানতে বাকি নেই যে, ঠাকুর-দেবতাদের মধ্যে ব্রহ্মা বড় তাড়াতাড়ি তুষ্ট হয়ে তাড়াহুড়ো করে বর দিয়ে বেগড়বাই করার ব্যাপারে এক নম্বর লোক। জন্মসূত্রে বুড়ো হলে যা হয় আর কি! কাজেই ব্রহ্মাকে ভজিয়ে জলন্ধর ত্রিলোক বিজয়ের বর হাসিল তো করলই, এমনকি দেব-মানব-দৈত্য কেউই তাকে মারতে পারবে না, এই টাইপেরও একটা মোক্ষম বর ফতে করে ছাড়ল। আর তারপরই সে স্বজাতীয় মূর্তি ধারণ করল। পাতালের একছত্র অধীশ্বর তো হলই, মর্ত্যলোকও ছারখার করে ছাড়ল। দু’দুটো লোক গোল্লায় পাঠিয়ে শুরু হল তার আসল খেলা!

Ads code goes here

সুমেরু পর্বতের মতো আকার ধারণ করে কয়েক লক্ষ কদাকার দৈত্য আর ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র নিয়ে সে দেবলোক আক্রমণ করল। দেবরাজ ইন্দ্র যে সহজেই পরাজিত হতে আর পালিয়ে গিয়ে ত্রিদেবের সাহায্য ভিক্ষা করতে ওস্তাদ—এটা ত্রিলোকের সবার জানা। এক্ষেত্রেও তিনি সেটাই করলেন। জলন্ধর ছোটখাটো দেবতাদের আর গন্ধর্ব-অপ্সরাদের ফটাফট বন্দি করে ফেলল। শচীকেও সে নিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ইন্দ্র কেঁদেকেটে এমন অবস্থা করলেন যে, জলন্ধরের মতো অসুরও তাঁকে ক্ষমাঘেন্না করে ছেড়ে দিল। ইন্দ্রের গদিতে বসে তার মনে অন্তত এটুকু উদারতা জাগল। ত্রিদেবের মধ্যে ব্রহ্মা বিপদ বাঁধাতে যতটা দড়, অাপদকালে ততটাই নাচার। ওসব যুদ্ধটুদ্ধ তাঁর ধাতে সয় না। এক্ষেত্রে হাত উল্টে বসে থাকাই তাঁর স্বভাব। এমনকি তাঁর পাকা মাথা থেকে নতুন কিছু আইডিয়াও আর পাওয়া যায় না। সেই আদি ও অকৃত্রিম ফিকির—‘চলো বিষ্ণুর কাছে, চলো মহাদেবের কাছে’!

শেষ অব্দি ব্রহ্মার ফিকিরেই গরুড়বাহন বিষ্ণুকে ভিড়িয়ে দেওয়া হল জলন্ধরের সঙ্গে যুদ্ধে। কিন্তু তখন বিষ্ণুর হাতে অস্ত্র বলতে কেবলমাত্র গদা। তাই দিয়ে আর কতটুকু কীই বা করা যায়! দু’য়েক কিস্তির পর বাহনশুদ্ধ বিষ্ণুকে নাগপাশে অবলীলায় বেঁধে বন্দি করে ফেলল জলন্ধর। এরকমভাবে বিষ্ণুকে হারাতে পেরে জলন্ধরের আস্ফালন দ্বিগুণ হল! সে ভাবল, দেবকুলে বাকি তো আছেন শুধু মহাদেব, এবার হয়ে যাক তাঁর সঙ্গে একহাত। তাঁকে পেড়ে ফেলতে পারলেই মিশন দেববিজয় কমপ্লিট! যেমন ভাবা তেমন কাজ, হাজির হল গিয়ে সে একেবারে কৈলাসে। তেন করেঙ্গা তেন করেঙ্গা পঞ্চাশ রকমের গা জ্বালানো কথা বলে মহাদেবকে সরাসরি যুদ্ধের জন্য উত্তেজিত করতে লাগল। তার বিচকুটে কথায় মহাদেবের খুব রাগ হল, তাতেই তাঁর তিন নম্বর চোখ খুলে গেল। সেই চোখ থেকে বেরুল দারুণ আগুন, সেই আগুনেই জলন্ধরের সঙ্গে দৈত্যদানো রথটথ যা ছিল সব মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল। তবু ব্যাটার দেমাক যায় না! মহাদেবকে হাতাহাতি করার জন্য কষে হাঁকাহাঁকি করতে লাগল, বিষ্ণুকে পেড়ে এসে তার তখন হেব্বি জোশ!

মহাদেব সর্বজ্ঞ ঠাকুর, তিনি জানেন ব্যাটাকে হাতাহাতি করে হবে না, হাওরে ফেলতে হবে। তাই ভেবে তিনি করলেন কি, পায়ের আঙুল দিয়ে সামনের হ্রদের জলে একটা চক্র আঁকলেন; তারপর জলন্ধরকে বললেন যে, এই চক্র যদি সে জল থেকে তুলে আনতে পারে, তাহলে তিনি তার সঙ্গে লড়াই করবেন, নতুবা নয়। এই টুকু যে পারবে না, তার সঙ্গে আর লড়াই কীসের! ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই অসুরেরা হেব্বি খচে যায়, এটা তাদের জন্মগত ফল্ট। তাই জলন্ধরও ক্ষমতা জাহির করতে রেগেমেগে জলে নেমে পড়ল। অনেক চেষ্টার পর অসম্ভব ভারি সেই চক্র কোনরকমে ঘাড়ে তুলেও ফেলল। সেটা ঘাড়ে নিয়ে দম্ভ দেখিয়ে হাসতে হাসতে সে যেই না পাড়ে এসে উঠেছে, অমনি চক্রটা সোনার হয়ে গেল, তাতে ঝলসে উঠল হাজার সূর্যের আলো এবং তা দুরন্ত গতিতে ঘুরতে শুরু করল। চক্র ঘাড়ের ওপর থাকায় জলন্ধরের মুণ্ডুটিও কচাত করে কাটা গেল। এতেই জলন্ধর মরে গেল। কেউ তাকে মারল না, পাকে পড়ে চক্রে মারা গেল সে। তখন চক্র গেল জলে আর জলন্ধরের কন্ধকাটা শরীর গেল নরকে, তার রক্ত দিয়ে সেখানে তৈরি হল রক্তকুণ্ড। নরকে তেমন তেমন পাপীদের সেই কুণ্ডেই এখন চোবানো হয়।

বিশ্বে অসুরদের তো আর কমতি নেই, এক গেলে আর এক আসে। এবার এলো ধুন্ধু নামের এক অসুর। নিজের ধুন্ধুমার ক্ষমতায় সে পটাস করে ত্রিলোক জয় করে ফেলল। দেবতাদের সমস্ত অস্ত্রই ফেল করল, কিছুতেই তাকে বধ করা গেল না। পরাজিত দেবতারা প্রতিবারের মতো ব্রহ্মার কাছে গিয়ে হত্যে দিলেন, ব্রহ্মা তাঁদের নিয়ে গেলেন বিষ্ণুর কাছে। সব শুনে বিষ্ণু বললেন যে, গদাযুদ্ধে জলন্ধরের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা মোটেই ভালো না। ধুন্ধুকে ধুয়ে ফেলতে একখানা অটোমেটিক অস্ত্র তাঁর চাই, জলন্ধর কাণ্ডের সময় মহাদেব সোনার যে চক্রটা নির্মাণ করেছিলেন, সেটা পেলে ধুন্ধুকে তিনিও একহাত দেখে নিতেন!

কিছু পেতে গেলে সাধনা করতে হয়। ফলে, আয়োজন হল শিব সাধনার। অর্ডার পেয়ে বিশ্বকর্মা শিবলিঙ্গ তৈরি করে দিলেন। সেই লিঙ্গ ঘি-মধু-দুধ দিয়ে ধুইয়ে বিষ্ণু তাতে হাজারখানা পদ্ম দিয়ে শিবের হাজার নামের মাহাত্ম্য গাইতে গাইতে উৎসর্গ করতে শুরু করলেন। ভক্তকে ছলনা করতে শিব একটি ফুল লুকিয়ে ফেললেন। পরমভক্ত বিষ্ণুও কম যান না, তিনি আসন ছেড়ে উঠলেন না। ফুলের অভাব মেটাতে পদ্মের মতো সুন্দর নিজের একটি চোখ উপড়ে অঞ্জলি দিয়ে পুজো শেষ করলেন। তখন শিব তুষ্ট হয়ে কয়েক হাজার সূর্যের তেজ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন। বর দিলেন যুদ্ধে জয়ী হবার। এই ফাঁকে বিষ্ণু যুদ্ধের জন্য তাঁর সোনার চক্রটি চেয়ে বসলেন। এতে তুষ্ট শিব খুশিই হলেন। তিনি আহ্বান করতেই সামনে হাজির হল সেই সুন্দর দর্শন সুবর্ণ চক্র। শিব সেই চক্রের নাম দিলেন, ‘সুদর্শন’। তারপর তা নিজের হাতে বিষ্ণুকে দান করলেন চিরদিনের জন্য। এরপরই শিব ভয়ানক এক রুদ্ররূপ ধারণ করলেন। বিষ্ণুকে বললেন, ওহে বিষ্ণু, যুদ্ধ জয় করতে হলে তোমাকেও এমন রুদ্ররূপ ধরতে হবে। শান্তশিষ্ট ভাব নিয়ে যুদ্ধ করতে গেলে যুদ্ধ জেতা যায় না। শান্তভাব ভক্তের জন্য, রুদ্ররূপ শত্রুর জন্য। সেই রূপেই শত্রু আদ্দেক ঘায়েল হয়, বাকিটা অস্ত্রের কাজ! মনে পালনকর্তার মায়া রাখলে আর যাই হোক, যে শত্রুর শেষ রাখতে নেই, তাকে দমন করা যায় না!

শিবের উপদেশ আশীর্বাদের মতো মাথায় নিয়ে বিষ্ণু রুদ্ররূপ ধরে যুদ্ধ করতে গেলেন ধুন্ধুর সঙ্গে। প্রথম থেকেই তিনি তেড়ে সুদর্শন চালিয়ে সৈন্যসমেত ধুন্ধুকে কচুকাটা করে ফেললেন। সুদর্শনের জন্য অনায়াসেই যুদ্ধ জয় করে ফেললেন তিনি। এরপর থেকেই তাঁর পরম সঙ্গী হয়ে উঠল এই মোক্ষম অস্ত্র, হয়ে উঠল তাঁর হাতের শোভা। ভক্তের বন্দনা গানে তাঁকে বিশেষিত করা হতে লাগল, শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারীরূপে।

গল্পসূত্রঃ লিঙ্গপুরাণ

Spread the love

Best Bengali News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is Bengal's popular online news portal which offers the latest news Best hindi News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is popular online news portal which offers the latest news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement