ফুলচোর মান্যবর হৃদয়ের বয়স অনন্ত (রবিবারের গদ্য)

Sunday, January 20th, 2019

 শাশ্বত কর

 

Ads code goes here

জোর বাঁচা বেঁচে গেছি! এমনিতেই বড় জোর এক বিঘত চওড়া বুক আমার, পাঁজরার হাড় সেই হাফ প্যান্টের সময় থেকে হারমোনিয়ামের রিড, সেই ছোট্ট খাঁচায় এক কামরা ফ্ল্যাটের মধ্যবিত্ত সংসারের মত কাঁকড়া জড়াজড়ি করে মাথা গুঁজে আছেন মান্যবর হৃদয় আর মহামতি ফুসফুস! এমনিতে সে মহাজনেরা শান্তিতেই থাকেন, কিন্তু ঈষৎ বেচাল হলেই হাঁপটান! দু হপ্তা জল না পালটানো ট্রান্সপারেন্ট বয়ামে গোল্ডফিশের মত নাকের ডগা উঁচিয়ে খাবি খেতে হয়। হাঁপের টান জোরালো হলে হিচকি টু হিটকি মায় চোখে অন্ধকার দেখে ঠাস হয়ে পড়া পর্যন্ত যা খুশি হতে পারে! কিন্তু দুঃখের কথা বলি কী আর! বেচালের নমুনা বলতেও সংকোচ হয়! বাজারে ইলিশ সস্তা হল তো পাতে দুটি টুকরো বেশি পড়বেই। ব্যস! অমনি বেচাল! আর সপ্তাহান্তে পাতে খাসি খানিক বেশি উঠল তো বেচাল অবধারিত! মাঝে মাঝে মনে হয়, খাসির মাংসে যেন রোধ বেশি! অপাচ্য বস্তুর স্বাভাবিক নিম্ন প্রবাহে যেন কচি পাঁঠার টেন্ডন অবরোধকারক! আর দিন দুয়েকের বাহ্য অবরোধ হলেই তো বাঙালির জাতীয় রোগ অবধারিত! রোগা শরীরে টিংটিঙে পেট! পেটে উকুন মারা যায়! টোকা দিলে শূন্য কলসের অ্যাম্পলিফায়েড সাউন্ড হয়! হাওয়ার আতিশয্যে প্রাণ আঁইঢাঁই! লোক সমক্ষে আরও সমস্যা! এ বিড়ম্বনা না রাখা যায়, না যায় ছাড়া! পুরো ছুঁচো গেলা দশা!

যাই হোক খাদ্য জনিত উত্তেজনাই শুধু নয়, সে সব ছাড়ান দিলেও অন্য যে কোনও কিসিমের হড়বড়ানিতেও পরাণ চড়াই আমার আগাগোড়াই ছটফটায়! তবে দীর্ঘ দিনের সাথী বলে হয় তো হাড্ডি-খাঁচার মায়া ছাড়ায় না, তবে ফড়ফড়ায় জব্বর!

এত যে হাবিজাবি কইছি, তার কারণ হল এই মুহূর্তেও বুকে আমার হাতুড়ি পিটছে! গত রাতে নিরামিষ গেছে, কাজেই গুরুপাক অথবা লাগামছাড়া দাম্পত্য ঝটাপটির সম্ভাবনা নেই, ছেলেপুলের সঙ্গে খটাখটি দাঁতখিঁচুনিও হয়নি! তবুও এই শ্রাবণের বরিষপ্রাতে আধাঘণ্টা যাবৎ এই অবস্থা!

আসলে যা হয়েছে, তা হল ভয়! ভয়টা কীসের বলুন তো? খালি গায়ে তেল ডলে দাঁড়ালে মামদো ভূতের সমগোত্র বলে অন্তত ভূতের থেকে ভয় পাওয়ার সম্ভাবনা আমার এক্কেবারে নেই। এক কাঠাও জায়গা জমি বলে কিছু নেই টেই, কাজেই বাইক বাহন প্রোমোটারের ধমক চমকের ভয় নেই! ছাপোষা মাস্টামশাই বলে সাধারণত ‘কিছুই দেখি না’, অতএব রাজনৈতিক মুষ্টাণ্ডাদের থেকেও ভয়ডর নেই। তবে!

বলছি, বলছি! ল্যাংটার বাটপারির ভয় না থাকলেও, আমার মতন সাধারণ পাব্লিকের মনে মানের ভয়টা বেদম থাকে। তলিয়ে দেখলে দেখবেন, যে বেটা যত সাধারণ, তত অসাধারণ তার সম্মানবোধ! ভাঙবে তবু মচকাবে না! ঠিকই আছে, এমনটাই হওয়ার কথা! আরে বাবা, এই মানের ডরকে কাঁচকলা দেখাতে পারলেই তো তিনি মহাপুরুষ! লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা বেমালুম ঝেড়ে দিয়ে পান চিবুতে চিবুতে বিলেত চলে যাবেন! সেখানে টুকুস টুকুস গলফ খেলবেন, ঝুকুস ঝুকুস পার্টি দেবেন, ডুরা ডুরা জোয়ার তুলবেন, ছুঁচলো চিবুকে রঙ বিরঙ্গি দাড়ি নাচিয়ে মাখন মাখন সখিদের সুডৌল কাঁধে মাংসল হাত ঝুলিয়ে ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালে লটকাবেন, আড়াই বছরের এই রকম ঢাক পেটানো অজ্ঞাতবাসের মাথায় সাতাশ হাজার পৃষ্ঠার উকিলের চিঠিতে আত্মপক্ষ সমর্থন দেবেন- তারপর তারিখ পে তারিখ, তারিখ পে তারিখ! অতঃপর, রেফারির হুইশেল আর দ্য প্লে মাস্ট গো অন! প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সম্মাননীয় আসামী! যাক গে যাক, এ সব হল গিয়ে বড় বড় মানুষের বড় বড় ব্যাপার! আদার ব্যাপারী হয়ে আর্মেনিয়ান জাহাজের এ সব খোঁজ নিতে যাওয়া পান্তাভাতে ঘি খাওয়ার সমতুল! আমরা যারা আপোষকামী ছাপোষা মানুষ, তাদের বাবা অত হ্যাঙ্গাম সয় না! ডাল ভাত খাব, সড়ক দিয়ে হেঁটে যাব- এই আমাদের মুখের কথা। অবিশ্যি মনের কোণের গোপন কথাটি যে কী, তা কেবল গোবিন্দই জানেন।

যাই হোক, আসল কথাটা হল- আজ আমার মান খোয়ানোর ভয় হয়েছিল! হাটের মাঝে যদিও নয়, তবুও এমন চমকান চমকেছিলাম যে চড়চড়িয়ে অ্যাড্রিনালিন রাশ!

ঘটনাটা খুলেই বলি। সে অবশ্য আপাত ভাবে এমন কিছু নয়। হাতির নাদন দেখে ফইটকার কোতন! আশপাশের কয়েক বাড়ির কত্তাদের দেখে বৌ বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছে ইদানিং। তাদের সবার বেশ ভারি ভরকম বপু। মেদের পরে মেদ জমেছে ভুঁড়ির আশেপাশে! দেখলেই খাতাপিতা ঘরকা আদমি মালুম হয়। সেখানে আমার ঊনপুষ্ট চামচিকাসুলভ ধাঁচা! হাওয়া না জমলে পেটে পিঠে সাকুল্যে আড়াই ইঞ্চি ফাঁক! কাজেই তেনাদের পাশে আমায় দেখলে বৌয়ের মনে ডিপ্রেসানের বাতাস লাগাই স্বাভাবিক। ফলত হৃত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার তো নয়, বলা চলে মেদ অর্জনের হেতু কয়েকদিন দুধে ঘিয়ে মাখনে পনিরে মাখামাখি ডায়েট! ফলস্বরুপ একেবারে ছড়াছড়ি দশা! সকল প্রাণির পেটে কি আর এ সব সয়! লোম ঝরল না বটে, কিন্তু ওজনের বেশি ভোজন কেন্দ্রীক অম্লজ্বালায় জীবন ভোলে ব্যোম হয়ে উঠল। গ্যাস তো হালকা পদার্থ, ঊর্ধ্বমুখী তার গতি। আর সৎসঙ্গে স্বর্গবাস। কাজেই গ্যাস সঙ্গে মনটিও ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠল। সাংসারিক বাঁধন মুক্তির নানান পথ উঁকি দিল চোখের বহরে। গোদের উপর বিষ ফোঁড়া- পরমাত্মীয়ের আটমাসীয় ছানা কোলে গৃহে আগমন। একে আঁইঢাঁই, তার উপরে সে কান্দুইনার ক্রমাগত চ্যাঁ ভ্যাঁ! একেবারে গিয়ার দিয়ে দিয়ে কান্নার ডেসিবেল বাড়ে! বেশ মালুম হলো সিদ্ধার্থ কেন ঘর সংসার ছেড়েছিলেন! কাজেই বিবাগী হবার নানান উপসর্গ! সারাক্ষণ চিড়বিড়ে হয়ে থাকে মন। কেউ অদরকারের দুটো কথা বেশি বললেই মনে হয় কামড়ে দিই। নিদেন খামচে দিই। গতিক সতিক দেখে পুরনো মেনুতে প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি বউ-এর প্রেসক্রিপসন, সূর্য উঁকি দেবার আগে ধাঁইধপর মর্নিং ওয়াক!

হু ইজ দ্য বস? বৌ ইজ দ্য বস! বৌ যদি আলাদিন হয় তো আমি তার টিংটিঙে জিনি! ঘষে দিলেই সুরসুর করে বেড়িয়ে পড়তেই হবে আকার ডাকে। আকার উইশ ইজ মাই কম্যান্ড! হাই কম্যান্ডের সেই ইচ্ছে মতই দিন তিনেক হল বেরোচ্ছি। তা মিথ্যে বলব না, বেড়িয়ে মনটা বেশ ফুরফুর করছে। তবে হাঁটার জন্য নয়। সে তো মিনিট ছয়েকের মামলা কেবল! মানে ফ্ল্যাট থেকে ওই মিশনের মাঠটুকু কেবল হেঁটে আসা। এসে উঠলেই তখন আমি মুক্ত বুদ্ধ পুরুষ! বুদ্ধ পুরুষ সকল কর্মে অকর্ম আর অকর্মে কর্ম দেখেন! কাজেই আমিও হন্টনে পণ্ডশ্রম আর বিশ্রামে শান্তি দেখি। কাজেই বড় মাঠটার এক কোণে টুক করে বসে পড়ি। সারা রাত ঘুমিয়ে টুমিয়ে লম্বা লম্বা ঘাসগুলোও কেমন নরম হয়ে থাকে। বসলে বেশ রাজার গদিতে বসার ফিলিং হয়! সঙ্গে সঙ্গে আর্দালির মত সার সার ইউক্যালিপটাসের পাতা ছুঁয়ে ঝিরঝিরে বাতাস! আহা! সেই সঙ্গে মনোরঞ্জনের জন্য চোখের সামনে নানান মাপের ভুঁড়িওয়ালাদের ক্যাতকেতে কসরত! পিঠ সোজা করতে তাদের ঠোঁট বেঁকে লাল ঝরে। সতেরো পা থপথপ দৌড়ের পর বুকে হাপরের আওয়াজ শোনা যায়। তারপর আবার আশেপাশে নাক টিপে প্রাণায়াম- ফসসসসস ফোঁসসসস! হরি ওম তৎ সৎ!

যাই হোক, সেই সব দেখে টেখে সুয্যিমামা যখন উঠব উঠব করে তখন মাঠ ছাড়ি। রাস্তার ধারে একটা বড় বাড়ি। লোক টোক কোনোদিন দেখি না। আছে হয় তো কোনো কেয়ারটেকার! বাড়িটার বাইরের দিকের গাছ ঝেঁপে টগর আর ঝুমকো জবা ফুটে থাকে। কাল পাশ দিয়ে যাবার সময় গন্ধ পেয়ে চেয়ে দেখি, শিউলিও ফুটেছে। ভোরবেলা নির্জন রাস্তায় অমন সুন্দর ফুল দেখে লোভ হয়। হবে নাই বা কেন? দশ টাকার ফুল কিনি, তাতে পাঁপড়ি পচা গাঁদা আর নীলে চোবানো অপরাজিতা! আহা! ছেলেবেলায় বকুল টুকিয়ে নিজে মালা গেঁথেছি! হাতের পাতায় তার গন্ধ! সাজি ভর্তি হয়ে গেছে স্থলপদ্ম, ঝুমকো জবায়! সেই ফুল ঢেলে এসে ফের নতুন করে সাজি ভর্তি টগর তুলেছি। টগরের ডালে ভোর বেলায় সবুজ মশা থাকে, পাঁচিলের উপর থেকে গিরগিটি গলা ওঁচায়। দিদি বলে রক্ত চোষা, বুকে থুথু দিয়ে দে! তারপর ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে পাড়ায় বেরোলেই চাঁপা আর কাঠ গোলাপের মাঠ। নিচে পড়ে আছে সব টাটকা ফুল। সেই সব ফুলের কাছে এখনকার প্লাস্টিক ভর্তি ওই পচা গাঁদা! ধুস!

ছেলেবেলায় এক কাকুকে রোজ দেখতাম সকাল বেলায়। ধপধপে ধুতি পাঞ্জাবি, টকটক করছে গায়ের রঙ। হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে পিউদের বাড়ির গাছের থেকে টপাটপ ফুল পাড়ছে। পিউদের বাড়ি তখন ঘুমে কাদা। তার মানে উনি ফুল চুরি করছেন! কিন্তু ব্যক্তিত্ব দেখে কিছু কইবার সাহসেও কুলায় না! উনি করতেন কী, সব ফুল পেড়ে দুটো ভাগ করে একটা ভাগ অন্য একটা প্যাকেটে ভরে ওদের তুলসি তলায় রেখে চলে যেতেন। বাবাকে এক দিন বলাতে বললেন, উনি নাকি মস্ত পন্ডিত মানুষ। বিলাতে অধ্যাপনা করতেন।

শ্রাবণের সক্কাল বেলায় শিউলির গন্ধে আমার চোখেও সেই ছবি ফুটে উঠল। মুহূর্তে সেই কাকুর  স্থানে নিজেকে ভেবে নিয়ে বুক ফুলিয়ে ডাল টেনে টেনে ফুল পেড়ে থলে ভরতে লাগলাম। নির্জন সেই রাস্তায় ফুল চুরির সে যে কী আনন্দ সে আর কী বলব! আমিও পাড়া ফুলের দু ভাগ অরলাম, এক ভাগ ঝুলিয়ে দিলাম বন্ধ গ্রিলের আংটায়। তারপর বীরের মত প্যাকেট নাচাতে নাচাতে চলে এলাম বাড়িতে।

কালকের পর আজও। আজ টানটা আরও বেশি। মাঠে আর মন টিকছেই না! ধুত্তোর! কোঠায় ফুলের সুগন্ধ আর কোথায় ঘেমো মানুষের থপথপানি! আসতে আসতে গিয়ে দাঁড়ালাম বাড়ীটার সামনে। আঃ! শিউলি যেন আজ আরও বেশি ফুটেছে। হবেই। সাধে কী রবি ঠাকুর বলেছেন, “গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম সুন্দর! সুন্দর হলো সে”। গোলাপের জায়গায় এ না হয় শিউলি; হোক না, আদতে তো ফুল! কাজেই কাল যখন প্রশংসা করে হাতে নিয়েছি, আজ তো বেশি ফুটবেই!

খানিক সুরভিত বাতাস বুকে টেনে হাত বাড়ালাম সামনের ডালটায়। সবে আলতো টান দিয়েছি, অমনি ভিতর থেকে ‘কে র‌্যা!’

অমন বেমক্কা চিল্লানিতে চমকে উঠে রিফ্লেক্সে পালাতে গিয়েই ধপাত! সি.ই.এস.সি. গর্ত খুঁড়েছে নেওয়ার আগে দেখেছিলাম! ছোট্টো লাফে পাড় হয়েই এখানে এসেছি। কিন্তু পালানোর সময় আর মনে নেই। হুড়মুড় করে পড়েছি সেই গর্তে! আর কী বলি, রিফ্লেক্স আর ফিটনেস দেখলাম আমার আজ! পড়েই মুহূর্তের মধ্যে দু হাতে ভর দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়েছি গর্ত থেকে, তারপর ভোঁভা দৌড়! গলির শেষে এসে থেমে দেখলাম, নাঃ! কোনো হাঁপটান নেই। যা আছে তা কেবল বুকের পাটায় দমাস দমাস! আর গোড়ালির কোণে টনটনে ব্যথা!

তবে আর যা আছে সে হলো এক বুক সতেজ বাতাস। যে বাতাস ব্যথা বিষ রোগ বালাই মান সম্মান সব ভুলিয়ে এক লহমায় নিয়ে ফেলে দিল তিরিশ বছর আগের ভোর বেলায় যে ভোরে হরি ওম ধাঁই ধপর নেই, ফেসবুক হোয়াটস্যাপ মোবাইল পেজার ফ্যাক্স কিচ্ছু নেই! আছে কেবল শিউলির গন্ধ আর স্থল পদ্মের হাসিভরা মুখ, ধপধপে ধুতি পাঞ্জাবীর টকটকে অধ্যাপকের সাজিভরা ফুলের পিছনে গালে ব্রাশ ভরে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা টিংটিঙে ছেলে! সেই ছেলেটা যে আমার কত প্রিয়, আজ তা বেশ করে বুঝে নিলাম।

Spread the love

Best Bengali News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is Bengal's popular online news portal which offers the latest news Best hindi News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is popular online news portal which offers the latest news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement