মেঘ, মেঘদূত ও রবীন্দ্রনাথ: বাঙালির বৃষ্টি-ঋতুর স্টাফ

Sunday, June 30th, 2019

 কিশোর ঘোষ:

আষাঢ়শ্য প্রথমদিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং/ বপ্রক্রীড়পরিণতগজপ্রেক্ষণীয়ং দদর্শ (মেঘদূত, পূর্বমেঘ, কালিদাস)।

Ads code goes here

মেঘদূতের এ’ দু’লাইন পুরোটা জানে না অনেকেই। এমনকি প্রথম লাইন ঠিকঠাক বলাও কঠিন। কিন্তু প্রথম দুই শব্দ? সব্বাই জানে। আসলে ‘আষাঢ়শ্য প্রথমদিবসে’ আওড়ালেই মন ভালো হয়ে যায়! ভালো তো হবেই, আষাঢ়-শ্রাবণ মানেই যে বৃষ্টি। আর বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে এসে জোটে বৃষ্টিবান্ধবী—প্রেম। পথে-পার্কে-স্টেশনে-বাসস্টপে এইবার দুষ্টু বৃষ্টি এসে বুদ্ধি করে প্রেমিক-প্রেমিকাকে ঢুকিয়ে দেবে এক ছাতার তলায়! লাল-নীল-হলুদ-গোলাপি… ছাতা চুঁইয়ে জল গড়াবে অনন্তে! ছাতার আড়ালে কী চলছে দেখা যাবে না! তারপর বাজ পড়বে, মেঘ ডাকবে বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে—‘দেখলো মেঘোদয় ধূমল গিরিতটে একদা আষাঢ়ের প্রথমদিন/ বপ্রকেলি করে শোভন গজরাজ আনত পর্বতগাত্রে।’

তবে এ রোমান্টিকতার উল্টো দিকও কিন্তু আছে। যেমন ধরুন, দোলাদুলি-ঠেলাঠেলি করে চলেছে লোকাল ট্রেন, গাড়ি ভর্তি নিম্ন মধ্যবিত্ত, ডেলি প্যাসেঞ্জার বাঙালি। তাঁরা আষাঢ় শ্রাবণের অত্যাচারে তিতিবিরক্ত। তাঁদের বক্তব্য—বর্ষাকালের ঝক্কি জানেন? তাঁদের অভিজ্ঞতা বলছে—ছাতার চরিত্রই হল ‘এই আছে, এই নেই’! সুন্দরী বউ-এর মতো। সঙ্গে থাকলে দারুণ। কিন্তু সাবধান, যখন তখন হাত ফসকাতে পারে! অন্য মতও গজাচ্ছে। যেমন আষাঢ় পড়ল বলেই যে বৃষ্টি হবে, কে গ্যারিন্টি দিচ্ছে? সত্যি তো, কে দিচ্ছে মশায়? এই এবারই তো, আড়াই হপ্তা লেটে ঢুকল মৌসুমী। শুনেছি মৌসুমী চ্যাটার্জির আমলে মৌসুমী বায়ুও ছিল গোলাগাল, নাদুসনুদুস সুন্দর। গালে নাকি টোলও পড়ত। কিন্তু গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এ সব ঘেটে ঘ হয়ে গেছে! তবু রথযাত্রার মজা যে এ’ ঋতুতেই। সামনেই সেই উৎসব!

আসলে আষাঢ়ের আনন্দ যেমন বৃষ্টি ভেজায়, তেমনি পাপড় ভাজায়। আমরা যে যেখানে থাকি আশপাশে এক পিস রথের মেলা পেয়ে যাব নিশ্চিত। এবং আনন্দে মজিব। হাজার বিষাদ ধামাচাপা দেব সেদিন। জানি ভিড়-কাঁদা-ঘাম! তবু। জানি ধাক্কা-ধাক্কি, চেঁচামেচি! তাও। তবু আনন্দ জাগে! নামি দোকানের কোয়ালিটি জিলিপি দুচ্ছাই করে চিনির ডেলার জিলিপি কিনব। ঠোঙা খুলে দু’আঙুলে তুলে মুক্তির কামড় বসাব আড়াই প্যাঁচে। কারণ রথের মেলার জিলিপির স্বাদই আলাদা! এবং ছেলেরা নাগোরদোলায়, মেয়েরাও ভয় খেতে খেতে…। তারপর দশ টাকায় পাঁচটা বুলেট। বেলুন ফাটিয়ে কাউবয় পোজে হাঁটব মনে মনে! এবং কাঁচের চুড়ি, আচার, খেলনা, ঘুঘনি, ফুচকা—-ভরপুর লা-লাল্লা জীবন! ফেরার পথে চটি খুলে ভক্তি ভরে ভগবানকে প্রণামটিও সারব নিশ্চিত, শ্রীশ্রীজগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার চরণে।

এবার হয়নি কিন্তু কোনও কোনও বছর রথ আর ঈদ গায়ে গায়ে পড়ে। তথাপি আকাশে একটাই চাঁদ। তবে রাস্তায় ডাবল ভিড়, খুশির ঈদ আর রথযাত্রার আনন্দে দেখেছি মানুষ জ্যোৎস্নার মতো হাসছে, অন্ধকার গাঢ় হতে পারছে না, বরং হেরে যাচ্ছে!

আর একটা কথা, রথের দিন কিন্তু বৃষ্টি হয়। প্রতিবার। এবারও হবে। আমাদের সময় কিন্তু তাই হত ভাই।

এবার বর্ষার আরেক দিক। সেই দিকের নাম রবীন্দ্রনাথ। মেঘ-ঋতু নিয়ে লিখতে বসে কালিদাস আওড়াচ্ছি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তুলব না, এ হতে পারে না। বাঙালির তাতে পাপ লাগবে। অতএব, ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে/ আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে/ এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি/ পুলকে দুলিয়ে উঠিছে আবার বাজি।’ দেবব্রত বিশ্বাসের মেঘমন্দ্র কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের এ গান শুনলে যে আমাদের অনেকের বুকেই গুরুম গুরুম মেঘ ডাকা শুরু হয়, সে কথা স্বীকার করাই ভালো। গান যত এগোয় ততো বাড়তে থাকে মেঘরাজির পরিমাণ , বিদ্যুৎ চমকায়, আকাশ ঝেপে নামে… সৃষ্টির আশির্বাদ। তারপর আষাঢ়-শ্রাবণময় সবুজের অভিযান দিকে দিকে।

ছিন্নপত্রের ৮৭ নং চিঠি। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন—‘কাল সমস্ত রাত তীব্র বাতাস পথের কুকুরের মতো হুহু করে কেঁদেছিল—আর বৃষ্টিও অবিশ্রাম চলছে। মাঠের জল ছোটো ছোটো নির্ঝরের মতো নানা দিক থেকে কল কল করে নদীতে এসে পড়ছে—চাষারা ও পারের চর থেকে ধান কেটে আনবার জন্যে কেউ বা টোগা মাথায় কেউ বা একখানা কচুপাতা মাথায় উপর ধরে ভিজতে ভিজতে…, খেয়া নৌকোর মাথার উপর মাঝি হাল ধরে বসে বসে ভিজছে—আর মাল্লারা গুণ কাঁধে করে ডাঙার উপর ভিজতে ভিজতে চলেছে—এমন দুর্যোগ তবু পৃথিবীর কাজকর্ম বন্ধ থাকবার জো নেই।’ শেষ লাইনে—‘এই ভরা বাদরে ভরা নদীর মধ্যে দিয়ে নৌকো করে যেতে বেশ লাগবে—বাঁধা বোট ছেড়ে দেবার জন্যে মনটা অধীর হয়ে আছে।’ শিলাইদহ। ৩ জুলাই ১৮৯৩।

এভাবেই চিঠি, গানে গানে, কবিতাময়… রবীন্দ্রনাথ জুড়ে আছে আষাঢ়-শ্রাবণ। এ’ নতুন কথা নয়। তাঁর সাড়ে আশি বছরের জীবনে তিনি সব থেকে বেশি সৃষ্টিশীল ছিলেন বর্ষায়। আশ্চর্য, মায়ামুক্তোও হয়েছিলেন এক শ্রাবণদিনেই! শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় যখন ‘উদ্যানে ছিল বরষা পিড়িত ফুল/ আনন্দ ভৈরবী।’

কিন্তু এই যেমন লিখলাম তেমন বর্ষা, সেই আষাঢ়-শ্রাবণ আর কি হয়? হবে? ছিটেফোঁটা নতুন বর্ষার আবেগে কি পুরাতন বর্ষার স্মৃতিই লেখককে দখল করল শেষমেশ!

উষ্ণায়ণ কেড়ে নিচ্ছে সব! ঋতুর চরিত্র বদলাচ্ছে, যেখানে যা হবার তা হচ্ছে না, যেখানে হবার নয় সেখানে হচ্ছে। হয়তো অপ্রিয় কিন্তু সত্যি—প্রেয়সী অবৈধ ও অপূর্বা হওয়া সত্ত্বেও ‘এমন দিনে তারে বলা যায়/ এমন ঘণ ঘোর বরিষায়’ জাতের গান আর বাঁধা হবে না কোনও বাঙালি কবির!

কারণ বৃষ্টি-মেঘদূত-রবীন্দ্রনাথ ক্রমশ মিথ হয়ে যাচ্ছে! যত দিন যাবে তা আরও আরও করে বাঙালির ‘ঐতিহাসিক সত্য’ হয়ে উঠবে! গবেষণার বিষয় হয়ে উঠবে! পার্কস্ট্রিটের মিউজিয়ামে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেখবে—একটি জাতির ফেলে আসা বৃষ্টিঋতুর স্টাফ!

Spread the love

Best Bengali News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is Bengal's popular online news portal which offers the latest news Best hindi News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is popular online news portal which offers the latest news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement