Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / গল্প / লাল ডায়রি, দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প

লাল ডায়রি, দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প

 দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়

লাল ডায়রি 

অফিসে পৌঁছে রিসেপসনে রোজই খানিকটা সময় কাটায় মেঘ। রিসেপসনিস্ট রায়না, ওর সঙ্গে গল্প করে। রায়না মেয়েটি সুন্দরী। এক ধরনের পবিত্র সৌন্দর্য আছে ওর চেহারায়। মেঘ যা করে, সেটাকে গল্প না বলে ফ্লার্টও বলা যায়। রায়না বিষয়টা ভালোই বোঝে। তবে ও জানে, মেঘের ওই পর্যন্তই। এমনিতে সে দারুন বন্ধু। অফিসিয়ালি বস হলেও বেসিকালি মেঘ সবার বন্ধু। তার ফ্লার্ট করার ধরনটাও মজার। অনেক পুরুষের তাঁকে নিয়ে সমস্যা থাকলেও, কোনও মহিলার তাকে নিয়ে তেমন কোনও সমস্যা নেই। সে ক্ষতিকর নয়।
সেদিনও রায়নার সঙ্গে বাক্যালাপ শুরু করেছিল মেঘ। কথা শুরুর আগেই রায়না একটা খাম ধরাল তাঁর হাতে। মেঘ সেখানেই খুলল খামটা। দেখল তার ট্রান্সফার অর্ডার। এইচ আর হেড পাঠিয়েছে। অফিসের এই মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রীও মহিলা। এবং সুন্দরী। মাখনে গড়া শরীর। এই সুন্দরীর নাম যুথীকা। সেখানে দাঁড়িয়েই যুথীকাকে ফোন করল মেঘ। যুথীকা ফোন ধরেই বলল, মেঘ আমি চেয়ারম্যানের সঙ্গে। তোমায় একটু পরে কল করি প্নিজ্! যুথীকার কিনকিনে গলা রিনরিনিয়ে বাজল ফোনে। মেঘ সম্মতিই জানাত, চেয়ারম্যানের সঙ্গে যখন, তখন সম্মতি জানানো ছাড়া কি আর বলার থাকতে পারে! তবে তার আগেই ফোনটা কেটে দিল যুথীকা। অফিসের মধ্যে না গিয়ে রিসেপসনের সোফায় সে বসল। ভাবল চেয়ারম্যানকে ফোন করবে। করল না। কারন যুথীকা বলেছে ও চেয়ারম্যানের সঙ্গে। চেয়ারম্যানের সঙ্গে মিটিংয়ে না মেটিংয়ে সে বিষয়টা খোলসা করেনি যুথী। যুথীকাকে অফিসে যুথীকা বললেও, কফিশপে মেঘ তাকে যুথী বলেই ডাকে। যুথী মেয়েটি বেশ। বুদ্ধিমতী তো বটেই। একরকম আদুরে অথচ দৃপ্ত সৌন্দর্য আছে তার। বোর্ড মিটিংয়ে কখনও খোলা পিঠ কখনও বিভাজিকা দেখিয়ে সে বোরিং মিটিং গুলোকে রমনীয় করে তোলে। কিছুদিন আগে চেয়াম্যানস অফিসে হুলুস্থুল পড়ে গেছিল। চেয়ারম্যানের সহধর্মিণী অফিসে এসে চিৎকার জুড়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ যুথী নাকি তাঁর স্বামীর সঙ্গে কি সব করে বেড়াচ্ছে। কিংবা উল্টোটা, তাঁর স্বামী যুথীর সঙ্গে…
রিসেপসনের সোফায় সে অনেকক্ষণ বসে আছে দেখে প্যানট্রি বয় তাকে সেখানেই কফি দিয়ে গেল। ছেলেটির নাম রাজু। বলল, স্যার ভেতরে যাবেন না? মেঘ বলল, হুম। যাব। তার জন্যে স্ট্রং কালো কফি দিয়ে গেছে রাজু। ধোঁয়া উঠছে। কফিতে চুমুক দিল মেঘ। পারফেক্ট। চিনি ছাড়া কালো কফি। বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা আর ঘৃণার মিশেল। পল গগাঁর কফি সম্পর্কে এরকমই একটা কি উক্তি আছে। সঠিক মনে পড়ছে না। উক্তিটা ভাবতে লাগল মেঘ। ফোনটা বেজে উঠল। রাজ্য সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। নিশ্চয়ই কোনও খবর খাওয়াতে চায়। কিংবা দলের মধ্যে চাপে আছে। তাকে দিয়ে কোনও কার্যোদ্ধার করতে চায়। ফোনটা ধরল না মেঘ। কফি শেষ করে উঠে দাঁড়াল। পা বাড়াল স্মোকিং জোনের দিকে। সেখানে দু’তিনটে নতুন ছেলে মেয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। মেঘকে দেখে গুড মর্নিং স্যর বলে চলে গেল। তাদের ধুমপানে ব্যঘাত হল সম্ভবত। মেঘ সিগারেট ধরিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করল। তিনি ধরলেন না। এসএমএস করল মেঘ। লিখল, আমায় পশ্চিমবঙ্গের বাইরে পাঠাতে চাইছে। দ্রুত জবাব এল, কোথাও যাবে না তুমি। ঠোঁটের কোণে মৃদু হেসে সিগারেট শেষ করল মেঘ।
এই অফিসে পদমর্যাদায় মেঘের ওপরে আছে দু’জন। তার মধ্যে একজনের সঙ্গে মেঘের এখন বিরোধ চলছে। তাদের বিরোধ অফিসে রীতিমত চর্চার বিষয়। আর একজন যিনি তাঁকে কয়েকদিন আগে মেঘই রেফার করেছে চেয়ারম্যানের কাছে। এমনকি তাঁর ডেজিগনেসন কী হবে, সেটাও চেয়ারম্যানকে মেঘই বলে দেয়। ফলে এই দুজনের কারও কাছেই এই বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। মেঘ অবশ্য বিলক্ষণ জানে ওই প্রথমজনই এই সবের অন্তরালে আছে। কয়েকদিন আগে চেয়ারম্যান তাঁর চাকরি খেয়ে নিচ্ছিলেন। চেয়ারম্যানকে বুঝিয়ে তাঁর চাকরি রক্ষা করে মেঘ নিজেই। আর আজ তাকেই সে বেকায়দায় ফেলতে চাইছে! মেঘের ভুরুটা কুঁচকে গেল।
নিউজ চ্যানেলগুলোতে টিআরপির জন্যে লড়ে যাওয়াটাই দস্তুর। যে কোনও পেশাদার নিউজ চ্যানেলের কাছে টিআরপি হল ভগবান। এই টিআরপির চক্করে সূর্যশঙ্কর এমন একটা কাণ্ড করেছে যার জন্যে প্রবল চাপে চ্যানেলের মাদার কোম্পানি। মেঘের অবশ্য সন্দেহ আছে, যে শুধু টিআরপি নয় সূর্য যা করেছে তার মধ্যে একটি রাজনৈতিক অভিসন্ধিও আছে।
বিধানসভা নির্বাচন শেষ। প্রত্যেকটা নিউজ চ্যানেল দেখাচ্ছে রাজ্যে পালাবদল হতে চলেছে। শাসকদল কোণঠাসা। এমন একটা সময় সূর্য বলল, আমরা অন্য কিছু দেখাব। অন্য? অ্যসাইনমেন্ট হেড, ইনপুট এডিটর দুজনেই বিস্ফারিত নেত্রে তাকাল সূর্যর দিকে। পালা বদল হবে না। বিরোধী ঝড় যতই তুফান তুলুক শেষ রক্ষা হবে না। মেঘ জিজ্ঞাসা করল, কিসের ভিত্তিতে তোমার এমন মনে হচ্ছে? সরাসরি উত্তর দিল না সূর্য। বলল, তুমি কথা বলে দেখ। কংগ্রেস, লেফট এমনকি প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গেও কথা বলে দেখ। মেঘ বলল, সে নয় বলা যাবে, কিন্তু তোমার জেলার রিপোর্টাররা কি বলছে? তোমার নিজের সোর্স কি বলছে? সেফোলজিস্টরা কি বলছেন? সূর্য বলল, আমার সোর্স বলছে অপোজিসন পারবে না। মেঘ দেখল সূর্যর সোর্স যদি সঠিক হয় আর ওর প্রেডিকসন যদি মিলে যায় তাহলে তাদের চ্যানেল সুপারহিট। সূর্য যেরকম চার্জডআপ হয়ে রয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছিল বেশি উপদেশ দিয়ে কোনও লাভ হবে না। তবু মেঘ বলল, দেখ প্রেডিকসন নিজেরা করতে যেও না। কোনও পেশাদার সংস্থাকে দিয়ে করাও। তুমি জানো এটাই সিস্টেম। সূর্য তাঁর ব্যাকব্রাশ করা চুলে একবার হাত বুলিয়ে বলল, ওক্কে, ডান। এরপর আবার কিছুদিন কথা হয়নি মেঘ আর সূর্যের।এখন আর মিটিং ছাড়া কথাও হয় না। আগের মতো বারে বসে রাজা উজির মারা কিংবা ওর বান্ধবীকে নিয়ে ওর পিছনে লাগা সেই সব এখন অতীত। দুজনে এখন দুই পক্ষ।
ফোনটা বেজে উঠল। মেঘ এতক্ষণে নিজের অফিস থেকে বেরিয়ে চেয়ারম্যানস অফিসের দিকে যাত্রা করেছে। পিছনের সিটে নিজেকে এলিয়ে সাম্প্রতিক অতীত ভাবতে ভাবতে একটু হারিয়ে গেছিল মেঘ। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। মেঘ দেখল কবীর দা ফোন করছেন। পেশার জগতে কবীর দা মেঘের গুরু। শুধু মেঘ নয় বহু মানুষের গুরু এই কবীর দা। কেরিয়ারের শুরুতে যেমন হত আজও কবীরদার ফোন দেখলে মৃদু প্যলপিটিসন হয় মেঘের। সে ফোনটা ধরে বলল, দাদা বলুন।
হ্যাঁ রে তুই নাকি বাবুয়াকে ঢুকিয়েছিস তোদের চ্যানেলে।
মেঘ কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছিল না। বলল, সে রকম নয় দাদা। চেয়ারম্যান একজনকে খুঁজছিলেন যে একই সঙ্গে চ্যানেলের মাথা ও মুখ হবে। আমি ওর নামটা প্রস্তাব করি। চেয়ারম্যানও সম্মত হন। এইটুকুই। সূর্যর ওপর উনি মারাত্মক চটে।
তোর খবর কি? জিজ্ঞাসা করলেন কবীরদা।
কবীরদা মেঘের গুরু। শুধু গুরু নয় স্নেহ ও শাসনের ব্লেন্ডিংয়ে কবীরদা অগ্রজ সমান। কবীরদার কাছে কথাটা গোপন করতে পারল না মেঘ। বলল ,আমাকে ট্রানসফার করেছে দাদা।
কবীরদা বললেন, চলে যা। কূপমণ্ডুক হয়ে কলকাতায় পড়ে থাকিস না। টেক ইট অ্যজ্ অ্যান অপরটুনিটি।
মেঘ বলতে যাচ্ছিল, দাদা দিল্লি পাঠালে না হয় বুঝতাম কিন্তু…
কথা শেষ করার আগেই কবীরদা বললেন, কে তোর পেছনে লাগছে? সূর্য?
মেঘ বলল, হতে পারে দাদা। জানি না।
কবীরদা বললেন, হতে পারে না। সূর্য ইজ্ নট হার্মফুল। তুই তো আমারই মত খাল কেটে কুমীর এনেছিস অফিসে। তোর পিছনে সে কি করছে দেখ।
কবীরদার সঙ্গে কথা বলতে বলতে গাড়ি পৌঁছে গেল চেয়ারম্যানের অফিসে। চেয়ারম্যান অফিসেই রয়েছেন। সঙ্গে এমডিও। যুথীকার চিহ্নমাত্র নেই। চেয়ারম্যান বললেন, মিস্টার মেঘ, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?
মেঘ বলল, আপনি ইতিমধ্যেই যা করার করেছেন। আমাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন সেটা জানতেই আমি এলাম।
চেয়ারম্যান বললেন, আরে আমি কি আপনার জন্য খারাপ বন্দোবস্ত করেছি কিছু? এখানে সূর্যর সঙ্গে আপনার বনিবনা হচ্ছে না। ওখানে আপনিই সব। পুরো দায়িত্ব আপনার। তাছাড়া ওখানকার সরকারের সঙ্গেও আপনার সম্পর্ক ভাল।
মেঘ বলল, এটা আপনাকে বোঝাল কে? সূর্য?
না মিস্টার মেঘ। এই সাজেসনটা মিস্টার চৌধুরীর।
মেঘ বলল, চৌধুরী? ও আচ্ছা বাবুয়া দা।
চেয়ারম্যান বললেন, আপনি ওকে আনলেন। এখন ও বলছে আপনাকে বায়রে পাঠাতে…
চেয়ারম্যানের শেষের কথাগুলো মেঘ শুনতে পেল না। একজন সাংবাদিক, বিভিন্ন কোম্পানির ফাইল বয়ে বেড়াচ্ছিল। এই মন্ত্রী ওই আমলার ঘরে বিভিন্ন কোম্পানির জন্যে তদ্বির করে বেড়াচ্ছিল। পেশা হিসেবে কাজটা খারাপ নয়। সৎ ভাবে বেঁচে থাকারই চেষ্টা। তবে একজন সাংবাদিক যদি সাংবাদিকতাটাই না করতে পারে তাহলে তার গ্লানি, তার বেদনা যারা কোনওদিন সাংবাদিকতা করেনি তাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।
বাবুয়াদাকে খুব ভালবাসে মেঘ। কেন বাসে? তা সে ভাল করে জানে না। কবীরদার কথাগুলো মনে পড়ল, খাল কেটে কুমীর। চেয়ারম্যানের মুখে বাবুয়াদার নামটা শুনে সে বিস্মিত, ব্যথিত, স্তম্ভিত।
কিছুক্ষন চুপ থাকার পর মেঘ বলল, তাহলে আমার কিছু বলার নেই। বলছিও না। আপনি এইটুকু পারলে মনে রাখবেন, আপনার চ্যানেলের যে সিগনেচার তৈরি হয়েছে, এই কয়েক বছরে আপনার চ্যানেলের নাম বড় দুটো চ্যানেলের সঙ্গে উচ্চারিত হয় তা আমাদের জন্যে। মিস্টার চৌধুরীর এখানে কোনও ভূমিকা নেই।
চেয়ারম্যান বললেন, আমি জানি মিস্টার মেঘ। কিন্তু আমার কোনও উপায় নেই।
চাকরি চলে যাবার বা চাকরি ছাড়ার মুখে দাঁড়িয়ে মেঘের নিজেকে এতটা অসহায় মনে হল না যতটা অসহায় মনে হল চেয়ারম্যানকে। মেঘ হাসল। বলল, কয়েকদিনের মধ্যে সে চেয়ারম্যানকে জানিয়ে দেবে যে সে চাকরিটা ছাড়বে না চেয়ারম্যানের প্রস্তাব গ্রহন করবে।
চেয়ারম্যানের অফিসের বাইরে এসে দাঁড়াল মেঘ। সিগারেট ধরাল। সেক্টর ফাইভে তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। পাখিরা বাড়ি ফিরছে। তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ল মেঘের। মনে পড়ল মেয়ের কথা। তবে বাড়িতে এখনই জানানো ঠিক হবে না। সে আর একজন সিনিয়র সাংবাদিককে ফোন করল। যাঁকে কয়েকদিন আগে সে চেয়ারম্যানের সঙ্গে বসিয়েছিল। তবে তাঁর সঙ্গে কথা বলে চেয়ারম্যানের পছন্দ হয়নি। তাঁর চাকরিও হয়নি। বাম রাজনীতির মহলে এই ভদ্রলোকের খুব খাতির। খুব প্রভাব। পার্টির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের মধ্যে ঢুকে গিয়ে তিনি পার্টি সম্পাদককে বলতে পারেন, জরুরী কথা আছে। মিটিং থামিয়ে সম্পাদক তাঁর কথা শোনেন। তিনি বলেন, এই যে বায়োডেটা। এই মেয়েটির চাকরি করে দিতে হবে। বিস্মিত সম্পাদক বলেন, এই তোমার জরুরী কথা! তিনি বলেন, হ্যাঁ। এটাই আমার জরুরী কথা। এক সপ্তাহের মধ্যে মেয়েটির চাকরি হয়েও যায়। এ হেন সিনিয়রকে ফোন করল মেঘ। পুরো ঘটনাটা বলল। শুনে তিনি খুব হাসলেন। বললেন, আমিই তোকে কনট্রোল করতে পারি না, আর বাবুয়া কি করবে!
সেদিন রাত্তিরে বাড়ি ফিরে এসে তার ডায়রি নিয়ে বসল মেঘ। যেদিন প্রথম রিপোর্টারি শুরু করেছিল সেদিনই কেউ একজন তাকে বলেছিল, সাংবাদিকের জীবনে প্রচুর অভিজ্ঞতা হয়। যা শুনবে, যা বুঝবে, তার সব কিছু তো কপিতে লিখতে পারবে না। ডায়রিতে লিখবে। কাজে লাগবে। ঠিক কি কাজে লাগবে তা না বুঝলেও সেদিন থেকে ডায়রি লেখা শুরু করেছিল মেঘ। রোজ লেখে। রাত পর্যন্ত লেখে। এদিনও লিখছিল। এমন সময় বেজে উঠল তাঁর মোবাইল। অচেনা নম্বর। ফোনটা ধরল মেঘ। উল্টোদিকে পুরুষ কণ্ঠ বলল, মেঘ মুখোপাধ্যায় কথা বলছেন?
মেঘ বলল, বলছি।
ফোনের ওপারের কণ্ঠ বলল, নমস্কার মেঘবাবু। আমার নাম গৌরীপ্রসাদ সেন।
মেঘ থমকাল। নামটা তার চেনা। তার বর্তমান যে সংস্থা তার প্রতিযোগী সংস্থার কর্ণধার ইনি।সাম্প্রতিক জনশ্রুতি ভদ্রলোক যেখানেই যান সেখানেই একটা করে মিডিয়া হাউস কিনে ফেলেন। লোকে মজা করে বলে, ইনি নাকি বুকে পোস্টার সেঁটে ঘোরেন। যে পোস্টারে লেখা থাকে, আমি দুঃস্থ সংবাদমাধ্যম ক্রয় করিয়া থাকি।
মেঘ বলল, বলুন গৌরীপ্রসাদবাবু। আমাকে ফোন করলেন হঠাৎ, কার কাছে পেলেন আমার নম্বর?
গৌরীপ্রসাদ সঠিক উত্তর এড়িয়ে বললেন, আরে আপনি স্বনামধন্য। একদিন আসুন আমার অফিসে। আমি শুনেছি আপনার চ্যানেলে একটা সমস্যা হয়েছে।
মেঘের সমস্যা হল সে বড় অলস। তার মাথা চললেও শরীর চলে না। গৌরীপ্রসাদ সেনের ফোন পাওয়ার পরেও চার দিন কেটে গেল, মেঘ তাঁর সঙ্গে দেখা করার বা তাঁকে একটা ফোন করার প্রয়োজন মনে করল না। এলিয়ে গড়িয়ে, চায়ের পর চা, কফির পর কফি খেয়ে চারটে দিন কাটিয়ে দিল মেঘ। রাজশেখর বসুর মহাভারত বার করে আদি পর্বটা আরও একবার পড়তে শুরু করল। এই নিয়ে কতবার পড়ল তার ঠিক নেই। টানা চারদিন বৌয়ের সঙ্গে নিবিড় ভাবে কাটাল। সময় কাটাল মেয়ের সঙ্গে। সন্ধেবেলা জার্তুতো খুড়তুতো পিস্তুতো ভাইদের সঙ্গে বসে স্কচ খেল। মা’র অনন্ত স্মৃতি কথা শুনল মন দিয়ে। চারদিনের মাথায় গৌরীপ্রসাদ আবার ফোন করলেন।
গুড ইভনিং। কেমন আছেন?
ফোনের ওপার থেকে বললেন গৌরীপ্রসাদ। কুশল বিনিময় পর্বের পর গৌরীপ্রসাদ বললেন, চলে আসুন আমার অফিসে। মেঘের তখন তিন পেগ হয়ে গেছে। তাছাড়া এত রাতে যাওয়ার কোনও প্রশ্মই ওঠে না। মেঘ বলল, আজ আর নয়। কাল সকালে যাব। গৌরীপ্রসাদ বললেন, সকালে নয়। সন্ধের পর আসুন। এই ধরুন ন’টা। মেঘ বলল, ঠিকাছে।
পরের দিন রাত দশটা নাগাদ মেঘ পৌঁছল গৌরীপ্রসাদের অফিসে। অফিসের নিচের পার্কিংয়ে ও সামনের রাস্তায় অসংখ্য ছোট বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। প্রেস লেখা গাড়ি। লিফটে করে ওপরে উঠে নির্দিষ্ট ফ্লোরে পৌঁছেই মেঘের মনটা অদ্ভুত একটা শান্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। লিফটের দরজার সামনেই দেওয়াল জুড়ে মা সারদার অতি সুন্দর একটি শান্তিময়ী ছবি টাঙানো। ছবিটা দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। রিসেপসনে একজন শীর্নকায় ভদ্রলোক। মেঘকে দেখে চিনতে পেরেছেন। টিভিতে কাজ করার এ একপ্রকার সুবিধে আবার কখনও অসুবিধেও। ভদ্রলোক নমস্কার করে বললেন, স্যরের সঙ্গে দেখা করবেন তো। উনি এখনই আসবেন। মেঘ বলল, হ্যাঁ উনি আমায় আসতে বলে ছিলেন। অবশ্য আমার ঘন্টা খানেক দেরি হয়ে গেছে।
গৌরীপ্রসাদ এলেন একটু পরেই। এমনটা যে কারও অফিসের পোষাক হতে পারে মেঘের ধারণা ছিল না। চকচকে একটা সোনালী রঙের পাঞ্জাবি আর সোনালী রঙের পাজামা। ভদ্রলোক সুপুরুষ তাই খারাপ লাগছে না ঠিকই কিন্তু অফিসে বড় বেনানান। মেঘ রিসেপসনের সোফায় বসে আছে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এসে গৌরীপ্রসাদ বললেন, আপনি এখানে কেন? ভেতরে চলুন!
অফিসে বেমানান অনেক কিছুই। রিসেপসনের টেবিলে বসানো চাল, আটা, ময়দার প্যাকেট। সবই নাকি এই কোম্পানির প্রোডাক্ট। তার ওপর নিচের তলা থেকে ভেসে আসা ভাত রান্নার গন্ধ। বোঝা যায় কম দামী চাল। সঙ্গে আলু দিয়ে কোনও তরকারি রান্নার গন্ধ। অফিসে আলো কম। সবাই কাজে ব্যস্ত। গৌরীপ্রসাদ মেঘকে নিয়ে ঢুকলেন তাঁর কেবিনে। বড় কেবিন। বড় সেক্রেটারিয়েট টেবিল। টেবিলে সঙ্গে দুটো বড় বড় চেয়ার। বোঝা যাচ্ছে এই ঘরের মালিক একজন নয় দু’জন। গৌরীপ্রসাদ চেয়ারে বসেই আপনি থেকে তুমিতে নেমে এলেন। বললেন, মেঘ তোমায় আমি আমার মিডিয়া প্রোজেক্টে চাই। আমি তোমায় জানি। সত্যি বলতে কি আমার যে কয়েকটা মিডিয়া হাউস চলছে তার মধ্যে উৎকর্ষ যদি বলো আছে দুটিতে। এক ওই আদ্যিকালের চ্যানেলটা আর দুই ওই ম্যাগাজিনটা। আমি কোয়ালিটি চাই মেঘ। ক্লাস চাই ক্লাস।
মেঘ ঠোঁট কাটা। যিনি চাকরি দেওয়ার জন্য ডেকেছেন, তাঁকে বলল, নির্দিষ্ট পলিটিকাল পারপাস থাকলে ক্লাস কিছু করা অসম্ভব নয় তবে চাপের।
গৌরীপ্রসাদ বললেন, পারপাস! ওসব যেমন হচ্ছে হোক। ওসব তুমি দেখ না। আলটিমেটলি আমি চাই মিডিয়া ফর মিডিয়া সেক। মেঘ হাসল। ভদ্রলোক রসিক। হাস্যময়। মুখে মাখানো রয়েছে হাসি। মেঘ দেখতে পাচ্ছে এই হাসির পরতের নিচেই অসম্ভব কঠিন একটা মুখ আছে। সবুজ দুটো চোখ। বর্ণনার অতীত।
মেঘ তীক্ষ্ণ ভাবে তাঁকে দেখছে। এটা লক্ষ্য করেছেন গৌরীপ্রসাদ। মেঘের সাংবাদিকতার ধরনটাও এরকম। সে কোনও প্রশ্ন না করে, কোনও কথা না বলে কত কত বিকেল কাটিয়েছে রাজ্যের বিরোধী নেত্রীকে পর্যবেক্ষণ করে। তিনি বলছেন তার চেয়েও বেশি করে বুঝতে চেয়েছে তিনি কি বললেন না। মেঘের এমনটাই স্টাইল। গৌরীপ্রসাদকেও সে ওই দৃষ্টি দিয়ে দেখতে লাগল। অনেকদিন আগে সে একজন যাবজ্জীবন জেল খেটে আসা আসামীকে দেখেছিল। তার নাম প্রিন্স। একশটা খুনের মামলা ছিল তার নামে। তার সঙ্গে একবার রাস্তার ধারের দোকানে চা খেয়েছিল মেঘ। প্রিন্সের চোখ দুটো সেদিন সে দেখেছিল। ওই চোখ মানুষের হয় না। ওই চোখ বাজপাখির। গৌরীপ্রসাদের হাসি মাখা চোখের ভেতর সেই চোখ দুটো আবার দেখল মেঘ। পাতলা ঠোঁটের পিছনে ছোট ছোট দাঁত। ইঁদুরের মত। মেঘ কুটকুট শব্দ পেল। কি যেন কুরে কুরে খাচ্ছে ওই দাঁত।
টেবিলে কিছু রাখার শব্দে সম্বিত ফিরল মেঘের। কাপ আর প্লেট। কাপে গ্রিন টি। গৌরীপ্রসাদ বললেন, মেঘ ম্যাগি খাবে?
মেঘ প্রথমে বুঝতে পারেনি। বলল, আজ্ঞে?
গৌরীপ্রসাদ বললেন, ম্যাগি খাবে?
এমন সময় একজন মহিলা ঢুকলেন গৌরীপ্রসাদের ঘরে। মহিলা বললে যদি একটু বয়স্ক বোঝায় তাহলে মহিলা শব্দটা ঠিক হবে না। মেয়ে বললেই হবে। একটি মেয়ে ঢুকল গৌরীপ্রসাদের ঘরে। মেয়েটি সুন্দরী। টানা টানা আবেশময় চোখ। ফর্সা। মোমের তৈরি শরীর। মেয়েটি স্লিভলেস সালোয়ার কামিজ পরেছে। কালো রঙের কামিজ। সামনেটা অনেকটা অবারিত। গভীর বিভাজিকা অতল আহ্বান নিয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি বলল, স্যর সবকটা টয়লেট বন্ধ। আমি কোথায় যাব? মেঘ বিষম খাচ্ছিল। শেষ মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিল। গৌরীপ্রসাদ বললেন, আরে কিঙ্কিণী তুমি এখনও যাও নি? মেয়েটি আদুরে স্বরে বলল, না তো!

গৌরীপ্রসাদ বললেন, যাও আমার টয়লেটে যাও। খুব মিষ্টি করে থ্যাঙ্ক ইউ বলে
মেয়েটি টয়লেটের দিকে
এগলো। যেতে যেতে মেঘের দিকে একবার ঘন করে তাকাল। মেঘ স্মিতহাস্য ছুঁড়ে দিল টয়লেট-তাড়িত কিঙ্কিণীর দিকে। কিঙ্কিণীও পাল্টা হাসি দিতে দেরি করল না। মেঘ লক্ষ্য করল, গৌরীপ্রসাদ কিঙ্কিণীর টয়লেট যাওয়া দেখছেন। মেঘ বসে
আছে সে দিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই।
চা শেষ করে শার্টের
বুক পকেটে হাত দিল
মেঘ। তারপর ট্রাউজার্সের পকেটে। গৌরীপ্রসাদ বুঝতে পারলেন। বললেন, সিগারেট?
লজ্জিত ভাব করে মেঘ বলল, গাড়িতে ফেলে এসেছি। গৌরীপ্রসাদ একটি ক্লাসিক মাইল্ড এগিয়ে দিলেন। মেঘ সিগারেট ঠোঁটে ধরতে বাড়িয়ে দিলেন আগুনও। মেঘ ধোঁয়া ছাড়তেই গৌরীপ্রসাদ বললেন, তোমার তো দিল্লিতে দারুন। মানে ইয়ে আর কি। খুব খাতির! মেঘ বলল, আমার তো তেমন মনে হয় না। গৌরীপ্রসাদ বললেন, আমি সব জানি। তারপরেই উৎসাহিত হয়ে বললেন, দাঁড়াও তুমি এসেছ সেটা মৃণালকে জানিয়ে রাখি।
মৃণাল মানে একাধারে
সাংবাদিক ও রাজনীতিক। ক্ষমতার অলিন্দে টাট্টু ঘোড়া নিয়ে দাপিয়ে বেড়ানো এক যুগপুরুষ! মৃণালের নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কেন কে জানে যুগপুরুষ শব্দটাই মনে এল মেঘের। নিমপাতা চিবিয়ে খাচ্ছেন, এমন একটা ভাব নিয়ে তিনি মৃণালের সঙ্গে কথা বললেন। কথা বললেন বলার চেয়ে বলা ভাল কথা শুনলেন। ফোন রেখে গৌরীপ্রসাদ বললেন, ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়াই
ভাল। একা কারও হাতে ক্ষমতা দেওয়া ঠিক নয়। বুঝলে মেঘ…
মেঘ কিছুই বোঝেনি। এমন সময় অনেক বই আর ফাইলপত্তরের ভিড়
থেকে একটা ডায়রি বার করলেন। লাল কালিতে কিছু লিখলেন। মেঘ বলল, আপনিও ডায়রি লেখেন নাকি? গৌরীপ্রসাদ বললেন, তুমি লেখ? মেঘ বলল, আমার এমনই একটা লাল ডায়রি আছে। গৌরীপ্রসাদ বললেন, কি লেখ ডায়রিতে? মেঘ বলল, যা দেখি। আর আপনি? গৌরীপ্রসাদ হাসলেন। বললেন, আমি যা দেখি তা লিখি না। যারা আমায় দেখে আমি তাদের কথা লিখি।
আমার কথাও লিখবেন? মেঘ জিজ্ঞেস করল। তুমি যদি আমায় দেখ তাহলে অবশ্যই লিখব। মেঘ বলল, আজ তাহলে উঠি? গৌরীপ্রসাদ বললেন, গাড়ি আছে তো? মেঘ মাথা নেড়ে বলল, আছে। গুড নাইট। মেঘ কেবিন থেকে বেরিয়ে আসার মুহুর্তে গৌরীপ্রসাদ বললেন, মেঘ, আমি ডায়রিতে লাল কালিতে লিখি ঠিকই। তবে আমার ডায়রির রং কিন্তু লাল নয়। দেখ ভাল করে ব্রাউন।
ঢিমে আলোয় মেঘ দেখল বাসি শুকনো রক্তের মত রং ওই ডায়রির কভারের।
মেঘ দ্রুত বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

 

………………………………………….

(গল্পটি সম্পূর্ণত কাল্পনিক। বাস্তবের কোনও ঘটনা বা চরিত্রের সঙ্গে  বিন্দুমাত্র মিল নেই। যদি মিল থেকেও থাকে তবে তা কাকতালীয়।) 

Spread the love

Check Also

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্য গল্প, দ্বারকানাথের মেজদাদু

 দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়:   দ্বারকানাথের মেজদাদু দ্বারকানাথ ভূতে বিশ্বাস করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস …

তামাকপাতার দেঁজাভু সম্মাননা

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়: হরেন দে ওরফে এবং হৃদয় এখন একজন মস্ত বড় কবি। তো দীর্ঘদিন কবিগিরি …

বামেশ্বরের সেকেন্ড ম্যারেজ

 নীলার্ণব চক্রবর্তী রোজই দ্বিপ্রহরে ঝিলে স্নান করতে যান বামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। আর তার পিছন পিছন ধাওয়া …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *