Breaking News
Home / সান-ডে ক্যাফে / গল্প / হলুদ বসন্ত, তন্ময় কোলের গল্প

হলুদ বসন্ত, তন্ময় কোলের গল্প

 তন্ময় কোলে

 

হলুদ বসন্ত

ট্রেন ছুটছে। দৃশ্য গুলো পাল্টে যাচ্ছে প্রতি মূহুর্তে। পাশে বসে শেলি চঞ্চল হাতে তৃষানুর হাত ধরে।শেলির কানে হেডফোন।হেডফোনে চলছে মর্ডান গান। শেলির অনুরোধেই দ্বিতীয় বার বসন্ত উৎসবে যাচ্ছে তৃষানু। বসন্ত উৎসব! তৃষানুর কাছে বসন্ত উৎসব মানে মিতালি, গুঞ্জা, হলুদ শাড়ি, খোঁপায় পলাশ, “ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল “গানে গুঞ্জার নাচ, চোখে সমুদ্র গভীরতা, ঠোঁটের নীচে বাঁ দিকে ছোট্ট তিল। ট্রেন ছুটছে, তৃষানুর জানলার বাইরে চোখ। মনে পড়ে যাচ্ছে কিছু দৃশ্য পরপর।
রিকশা স্ট্যান্ড। রিকশা চালকের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তৃষানুর তর্ক।
-বোলপুর থেকে শান্তিনিকেতন একশো টাকা। এত হয়। উৎসব আসলেই আপনাদের রেট বুঝি বাড়াতে হয়। কী ভাবেন মানুষকে?
-এটাই এখন রেট দাদা। দিদি আপনি কোথায় যাবেন? “এক অল্প বয়সী মহিলা। পোশাক, চেহারায় বোঝা যাচ্ছে আভিজাত্য। কচি কলাপাতার রঙের শাড়ি পড়ে।
-আমি শান্তিনিকেতন।” মেয়েটি বলল।
-“তাহলে দাদা আপনি… দিদি একসাথে চলুন। অর্ধেক অর্ধেক ভাড়া দেবেন।”
-আমার আপত্তি নেই।” মেয়েটি স্পষ্ট কন্ঠে বলে দিল।
দুজনে উঠে পড়ল রিকশায়। একটু চুপ থাকার পর তৃষানু কথা শুরু করল। ‘আপনি কোথা থেকে আসছেন? ”
-আমি কলকাতা। আপনি?
-বর্ধমান ।কি করেন আপনি?
-আমার নিজস্ব একটা ছোট নাচের স্কুল আছে। বিশ্বভারতীতে পড়েছি নৃত্যকলা নিয়ে। তাই প্রতি বছর বসন্ত উৎসব আসলে কলকাতাতে থাকতে পারি না। চলে আসি। আপনি কী করেন?
-আমি আপাতত বেকার। ছবি আঁকি আর কিছু ছোট ছেলে মেয়েদের শেখাই। চাকরির চেষ্টায় আছি।
-আপনার নামটাই তো জানা হল না , আমার নাম গুঞ্জা সেনগুপ্ত।
-তৃষানু ব্যানার্জী। আপনি একাই এসেছেন?
-হ্যাঁ একাই আসি। কিন্ত আসার পর পরিচিত অনেক বন্ধু বান্ধবী পেয়ে যাই।
-কাল তো উৎসব। আজ প্ল্যানিং কী?
-বিশ্বভারতীর চারপাশ একটু ঘুরে দেখব। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে। ইচ্ছা ছিল এখানেই চাকরি করে থেকে যাবার, হল না!
-হল না কেন?
-সে অনেক ইতিহাস।
-যদি কিছু মনে না করেন একটা রিকোয়েস্ট করতে পারি।
-হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই।
-আমি কি আপনার সাথে বিশ্বভারতী ঘুরে দেখতে পারি? আমি একাই এসেছি, আর এই প্রথম, আপনি তো সব জানেন তাই…।
-অবশ্যই, আপনি কোন হোটেলে উঠছেন?
-সোনার তরী, আপনি?
-আমি আমার এক বন্ধুর বাড়িতে, ও এখন এখানে নেই। কাকু-কাকিমা আছেন, ওঁরা আমায় খুব ভালবাসেন। আপনি তাহলে বিকাল চারটের সময় বড় গেটের কাছে অপেক্ষা করবেন।
রিকশা থামল হোটেলের সামনে। সময় গড়িয়ে দুপুর, তৃষানু রিকশার পুরো ভাড়া দিতে গেল। আপত্তি করল গুঞ্জা, ‘না না আপনি আপনার টাই দিন”।
তৃষানু পঞ্চাশ টাকা দিল। রিকশা চলে গেল গুঞ্জার বন্ধুর বাড়ির দিকে। তৃষানুর আগেই বুকিং করা ছিল। তাই নাম বলতেই রুমের চাবি নিয়ে কেয়ার টেকার দরজা খুলে দিল। তৃষানু রুমে গিয়ে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল ঘাটে। “ক্লান্ত লাগছে, কোন সকালে বেরিয়েছি”। বাড়িতে ফোন করে সিগারেট ধরাল। কিছুক্ষণ পর ফ্রেস হয়ে মায়ের করে দেওয়া পরোটা-আলুভাজাতে মন দিল, খিদেও পেয়েছে খুব। দুটো সন্দেশ ছিল, খেতে খেতে তৃষানু ভাবল খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যাবে, কিছুটা সময় আছে এখনও।

|| ২||

তৃষানু গেটের কাছে দাঁড়িয়ে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। ” গুঞ্জা যদি না আসে, তখন হয়তো না করতে পারেনি। তারপর বাড়ি গিয়ে ভেবেছে …” ভাবতে ভাবতে তখনই দেখে গুঞ্জা আসছে ।
-আপনি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছেন বুঝি?
– না না, বেশিক্ষণ না মিনিট দশ
– আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি এখন ভাবছিলেন আমি আসব না ।তাই আসতে দেখে চোখে মুখে অদ্ভুত খুশি দেখতে পেলাম । ”
সত্যিই গুঞ্জাকে আসতে দেখে তৃষানুর মনে একটা হালকা খুশি ফুটে উঠেছিল। তৃষানু অস্বীকার করার চেষ্টা করল- ‘ না না ,তা নয়।চলুন ।”
– আপনার হাতে ক্যামেরা, ছবিও তোলেন নাকি?
– শখে কোন কোন সময় ।
– আপনার তো মশাই অনেক কিছুর শখ আছে। গানও করেন নিশ্চয়ই ?
– কী করে বুঝলেন আমি গান জানি ।
– মেয়েদের চোখ। ভুল বেশি করে না ।”হাসল একটু গুঞ্জা।
– হয়ত করে না ।আমার মেয়েদের নিয়ে তেমন অভিজ্ঞতা নেই।
– না থাকাই ভাল। আচ্ছা আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?
– বাবা মা,দাদা- বৌদি ।আর তোমার?
– ভাল লাগল আপনি থেকে তুমি শুনে । অনেকক্ষণ আপনি আপনি শুনতে ভাল লাগে না ।আমার জীবনে অনেকেই আছেন আবার অনেকে থেকেও নেই । বাদ দাও আমার কথা । জানো ঠিক এই জায়গায় পাঁচ বছর আগেও কত গাছ ছিল ।এখন অনেক মরে গেছে আবার অনেক কেটেও দিয়েছে ।এই যে গাছ টা দেখছ এটা আমি বসিয়েছিলাম ।আমি এর নাম দিয়েছিলাম মিতালী ।
– এটা তো পলাশ গাছ ।
– হ্যাঁ দেখছো পলাশ ফুলে গাছ টাকে কত সুন্দর লাগছে ।ইচ্ছা করছে উবড়ে কলকাতা নিয়ে চলে যাই ।
-বাড়িতেও তো বসাতে পার আর একটা মিতালি ।
– আমি ফ্ল্যাটে থাকি । আমার হ্যাজবেন্ড বেশির ভাগ দিনই কাজের সূত্রে দেশের এ প্রান্ত- ও প্রান্ত ছুটে বেড়ায় ।
কথাটা শুনে তৃষানু দুমড়ে-মুছড়ে গেল ।তারপর একটু থেমে বলল- আপনি বিবাহিত! আমি তো….।”
– হ্যাঁ ।তিন বছর হতে চলল ।তা একপ্রকার বাধ্য হয়েই করতে হয়েছে ।অবাক হলে খুব দেখছি!
– সত্যিই ।আর বাধ্য হয়েছেন কেন বলছ?
– বাবার শরীর তখন খুব অসুস্থ ছিল , বাবা চাইছিলেন আমার বিয়েটা যত শীঘ্র সম্ভব দিয়ে যেতে ।আমিও বাবার কথা ভেবে আপত্তি করিনি ।
– তোমার বাবা এখন কেমন আছে?
– বাবা তার ঠিক ছ’মাস পরই এক্সপায়ার করেন।মা এখন আমার কাছেই থাকে ।
– হ্যাজবেন্ড কী করেন?
– এক সিমেন্ট কম্পানির মার্কেটিং ডির্পামেন্টে আছে। তুমি পলাশ ফুল কুড়োচ্ছো কী করবে?
– তোমায় দেবো বলে ।কাল খোঁপায় দিও, খুব ভাল লাগবে ।
স্মিত হেসে গুঞ্জা বলে- তোমার ভাল লাগবে, না আমায় দেখতে ভাল লাগবে ।কোনটা?”
ফুল গুলো গুঞ্জার হাতে দিয়ে তৃষানু বলল- ‘দুটিই “।
– তাহলে কালই বলবে কেমন লাগছে ।
– সন্তান নেননি কেন এখনও ।যদিও প্রশ্ন টা করা হয়ত ঠিক হল না “।
– না না।ঠিক আছে, আসলে ও চায়না সন্তান নিতে ।আমিও তেমন জোর করিনি ।নাচের স্কুল, মা কে নিয়ে দিব্যি ভাল আছি ।
-সত্যিই কি ভাল আছো?
– ভাল আছি কতটা জানিনা, তবে ভাল থাকার চেষ্টা করি।”গুঞ্জা বলল।
তৃষানু গুঞ্জার মুখের দিকে চেয়ে উত্তরের সত্যতা বোঝার চেষ্টা করল।তারপর বলল- ভাল থাকা তো মনের খুশি ।জোর করে কি হয়? ”
– এত কঠিন ভাবে ভাবিনি, বলতে পার ভাবতে চেষ্টা করিনি ।
সময় তখন বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা হবো হবো ।তবে সূর্য এখনও পুরোপুরি ডোবেনি। আবছা অন্ধকার গ্রাস করছে ।
-তৃষানু আমার এখন একটা গান শুনতে ইচ্ছা করছে ।করো না প্লিজ “।
তৃষানুকে আগে কেউ এত মিষ্টি করে এমন ভাবে বলেনি। না করতে পারবেনা  তাও বলল- আমি কিন্ত বেসুরো ।
-সুর এসে যাবে, শুরু তো করো।
তৃষানু একটু ভেবে শুরু করল- ”ভালবেসে সখী নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখ, তোমার মনের মন্দিরে।

-বাহ্ কী সুন্দর গান করো, আর একে তুমি বেসুরো বলছো ।তোমার যে প্রেমিকা কিংবা বউ হবে সে খুব লাকি ।তোমার মত একজন রোমান্টিক মানুষ পাবে ।সবচেয়ে বড় যেটা তোমার মন বোঝার মন আছে ।কিন্ত আমার না আছে ভালবাসা, না মন বোঝার কেউ।
” ধন নয়, মান নয়, কিছু ভালবাসা, করেছিনু আশা।”
কলকাতাতে ভীষণ একা লাগে ।এখানে যে কটা দিন থাকি বাঁচার রসদ নিয়ে যাই।মাঝে -মধ্যেই তাই পালিয়ে আসি ।আজকের দিনটা সত্যিই দারুণ কাটলো ।”গুঞ্জা বলল।
– গুঞ্জা এবার চল, না হলে আরও বেশি অন্ধকার হয়ে যাবে ।
– তোমার সাথে কিভাবে সময়টা কেটে গেল এত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারিনি।
– কাল সকালে দেখা হবে তো?
– হ্যাঁ, ওই জন্যই তো আসা ।কাল দেখা হবে ,আমি এসে গেছি ।
– পলাশ ফুল গুলো পড়ো ,শুভরাত্রি ।”তৃষানু মনে করিয়ে দেয় আবার ।
– হ্যাঁ মনে থাকবে ,শুভরাত্রি”।মিষ্টি হেসে গুঞ্জা বন্ধুর বাড়িতে ঢুকে গেল।
যাবার সময় খাবার হোটেল থেকে রুটি তরকা কিনে নিল তৃষানু রাতের ডিনারের জন্য ।

|| ৩||

তৃষানুর আজ খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল ।এত সকালে তৃষানু ওঠে না ।আজ দিনটা তৃষানুর কাছে স্পেশাল ।কাল রাত থেকেই উত্তেজনা ছিল আজ সকালের জন্য ।যতটা না বসন্ত উৎসবের জন্য তার চেয়েও বেশি পলাশ ফুলে খোঁপায় সাজা গুঞ্জাকে দেখার।স্নান করে হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে তৃষানু বেরিয়ে পড়ল।
গিয়েই মাঠে ভিড়ের মধ্যে একলা দাঁড়িয়ে থাকা গুঞ্জাকে দেখতে পেল।হলুদ রঙের শাড়ি, গলায় হার,খোঁপায় হলুদ পলাশ ,এখনও আবির দেয়নি কেউ ।তৃষানু গুঞ্জার কাছে গিয়ে তন্ময় হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড ।তারপর বলল- ” যা ভেবেছিলাম তার থেকেও বেশি সুন্দর ।শুধু একটা জিনিস মিস আছে এখনও “।
গুঞ্জা একটু আশ্চর্য হয়ে বলল- ” কী?”
তৃষানু আবির নিয়ে গুঞ্জার গালে মাখিয়ে দিয়ে বলল- “এবার সম্পূর্ণ “।
নাচ শুরু হয়েছে ।সবাই “ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল “গানের তালে নেচে চলেছে।এই প্রথম তৃষানু রবীন্দ্রনাথের গানে নাচলো গুঞ্জার সঙ্গে ।
– গুঞ্জা তোমার আজকের এই রূপ নিজের হাতে তুলির টানে আঁকতে ইচ্ছা করছে।
– তোমার কাছে রঙ,তুলি আছে?
– হোটেলে আছে, আমার ব্যাগে সবসময়ই থাকে।
– চল যাওয়া যাক হোটেলে।
গুঞ্জার এই কথা শুনে একটু আশ্চর্য লাগল- “তুমি যাবে?”
-হ্যাঁ,চল ।
দুজনে হোটেলে আসলো ।দূর থেকে ভেসে আসছে “তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা”। গুঞ্জা চুপটি করে বসে আসে। তৃষানু ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছে গুঞ্জার মুখ, চোখ,নাক, ঠোঁট, গলা, চুল । তৃষানুর মনে হচ্ছে সে যেন সত্যিই স্পর্শ করছে গুঞ্জাকে।তুলির টানে সেজে উঠেছে গুঞ্জা ।তৃষানু গুঞ্জার চোখের দিকে তাকাল ,এগিয়ে গেল গুঞ্জার কাছে।কোন বাঁধা এল না, গুঞ্জা সমর্পণ করল নিজেকে।
গুঞ্জা নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলল- “আজ আমি নিজেকে প্রথম খুঁজে পেলাম।আমি জানি না আর কোনদিন আমাদের দেখা হবে কিনা।তবে আমি চাই না আর আমাদের দেখা হোক” ।
গুঞ্জার মুখে এই কথা শুনে তৃষানু আশ্চর্য হয়ে গেল । “তুমি চাওনা আর আমাদের দেখা হোক ।কিন্ত কেন? ”
– হলে অনেক কিছু শেষ হয়ে যাবে। আমি যে আজ থেকে শুরু করলাম ,এর শেষ চাই না” ।

||৪||

ট্রেন এসে থামল বোলপুর স্টেশনে।ট্রেন থেকে নেমে তৃষানু এগিয়ে যাচ্ছিল রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে।শেলি হাত টেনে বলল- “টোটো তো আছে, রিকশা তে দেরি হবে” । তৃষানু টোটোতে উঠল।রিকশা স্ট্যান্ডটা তাও একবার ভাল করে চোখ বুলিয়ে নিল তৃষানু । গিয়ে উঠল ‘সোনার তরী’ হোটেলে।রুম পেল ৮।
– দাদা রুম ৭দেওয়া যাবে না, দেখুন না একটু ।
– না স্যার, ওই রুম আগে থেকে বুকিং। “একটু হতাশ কন্ঠে বলল ম্যানেজার ।
– “চেঞ্জ কি কোনভাবেই হবে না । এর আগে আমি এসেছিলাম, ওই রুমে ছিলাম।তাই বলছিলাম ..।”
– “না, উনি বারবার আমাদের ওই রুমটার কথাই বলে রেখেছেন , কিছু করা যাবে না।
এতক্ষণ ধরে শেলি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল,দেখে বোঝা যাচ্ছে শেলি ক্লান্ত আর দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত ।রেগে তৃষানুকে বলল- “কী আছে একটা রুমের জন্য, ছাড় এবার, আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না “।
কেয়ার টেকার দরজা খুলে দিয়ে গেল ।তৃষানু তাকাল রুম নাম্বার ৭ এখনও চাবি দেওয়া, দরজা বন্ধ ।
– ” ওই রুমটা এর চেয়ে ভাল ছিল”। রুম পছন্দ হল না তৃষানুর।
-” একটা তো রাত , এমন করছ কতদিন এখানে থাকতে এসেছ”।
তৃষানু আর কথা বলল না এই নিয়ে।এসে একটু ঘুমিয়ে যখন উঠে তখন বিকাল ।
– “শেলি ঘুরতে যাবে তো, চল ঘুরে আসি একটু” ।
– হ্যাঁ চলো।
বিশ্বভারতী ক্যাম্পাস ঘোরার পর তৃষানু শেলিকে নিয়ে গেল সেই পলাশ গাছটার কাছে । আজও সেইদিনের মত গাছটা হলুদ পলাশ ফুলে সেজে আছে। গুঞ্জা এর নাম রেখেছিল মিতালী ।মনে করল তৃষানু ।তারপর নীচু হয়ে পলাশ ফুল কুড়োতে লাগল তৃষানু।
– তৃষানু কী করছ?
– তুমি কাল খোঁপায় দেবে।
– নোংরা ফুল ।আমি মাথায় দিতে পারব না , ফেলে দাও ।
তৃষানু ফুলগুলো ফেলল না।বলল- না থাক, চল এবার যাওয়া যাক ।
হোটেলে ফিরে এসে রুম ঢোকার সময় দ্যাখে রুম নাম্বার ৭ দরজা খোলা। ভেতর থেকে একটা ছোট মেয়ের গলা শোনা গেল । ঠিক তেমনি শান্ত, স্পষ্ট। রুমে টেবিলের এক পাশে পলাশ ফুলগুলো রেখে দিল তৃষানু।
– তৃষানু তোমায় আজ ট্রেন থেকে দেখছি অন্য মনস্ক, উদাস, মনে হচ্ছে সব সময়ই কিছু যেন ভাবছ ।কী হয়েছে? ”
– না, তেমন কিছু না।মাথাটা ধরেছে একটু ।আমি ঘুমিয়ে পড়ছি আজ আর কিছু খাব না, ডাকবে না”। তৃষানু শুয়ে পড়ল চোখ বন্ধ করে।

|| ৫||

সকাল হল ।তৃষানু শেলি রেডি উৎসবে যাবার জন্য ।তৃষানু দ্যাখে বারান্দায় হলুদ শাড়ি পড়ে পাশের রুমের ছোট মেয়েটা। তৃষানু এগিয়ে গেল মেয়েটার কাছে ।
– কী নাম তোমার?
– মিতালী।
– বাহ্ খুব সুন্দর নাম, তুমিও খুব মিষ্টি , উৎসবে যাবে তো?
– যাবো তো, মা রেডি হচ্ছে ।
– আমরা এগোচ্ছি, তুমি মায়ের সঙ্গে এসো ।

শেলি আজ হলুদ শাড়ি পড়েনি ।শেলির হলুদ রঙ পছন্দ নয় ।তাই গোলাপি রঙের শাড়ি পড়েছে । তৃষানু জোর করনি। তৃষানুর হাতে ক্যামেরা , গায়ে হলুদ পাঞ্জাবী।এসেই ছবি ক্যাপচার করছে ।হঠাৎ হোটেলের সেই ছোট মিতালি আবির নিয়ে এসে বলল- “নিচু হও, আবির মাখাব “।
তৃষানুর গালে আবির মাখিয়ে দিল বেশ ভাল করে।তৃষানু বলল- “তুমি তো এত ছোট, মা বকেনি আবির মেখেছ “।
– মা বকবে কেন, মা-ই তো প্রথম মাখাল ।
তৃষানু আবির নিয়ে মিতালীর গালে মাখিয়ে দিয়ে বলল- তোমার মা কোথায়? “।
মিতালী হাত দেখাল মায়ের দিকে। তৃষানু দেখল হলুদ রঙের শাড়ি, খোঁপায় পলাশ, গলায় হার, সারা মুখ জুড়ে আবির । “ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল ” গানে নেচে চলেছে । শেলিকে মিতালী আবির মাখাতে চাইল, শেলি মাখেনি , আলার্জির অজুহাত দিয়েছে । তারপর মিতালী ছুটে গেছে মায়ের কাছে ।

-আচ্ছা শেলি তুমি কেন এসেছ বলবে ।না তুমি আবি মাখবে, না নাচবে “। বিরক্ত হয়ে বলল তৃষানু ।
– আমি এসেছি বলে তোমার সমস্যা হচ্ছে বুঝি”।
এর উত্তর দেয় না তৃষানু । মেয়েরা সব বোঝে, কেউ বলেছিল। তৃষানুর সত্যিই মনে হচ্ছে পাশে যদি শেলি না থাকত একবার সে ছুটে যেত মিতালীর মায়ের কাছে ।
-তৃষানু রোদ উঠে গেছে ।অনেকক্ষণ হল, এবার চলো ।
– আর একটু ।
– না, আর না চল ।
তৃষানু শেলির সাথে চলে এল হোটেলে ।শেলি ওয়াসরুমে গেলে তৃষানু আবির আর পলাশ রেখে দিয়ে আসল রুম নাম্বার ৭এর দরজার পাশে।
এরপর মাঝে মাঝেই তৃষানু সিগারেট খাওয়ার বাহানা দেখিয়ে বারান্দায় গিয়ে দেখেছে রুম নাম্বার ৭ এর কেউ এসেছে কিনা।কখনও তৃষানু দরজা খোলা দেখেনি ।তারপর একবার খেয়াল করল দরজার পাশে রাখা আবির আর পলাশ নেই ।বুঝতে পারছিল না তৃষানু কেউ ফেলে দিয়েছে না গুঞ্জা এসেছিল ।সন্ধ্যা হয়ে আসছে ,কিছুক্ষণ পর ট্রেন ।শেলি রেডি হয়ে গেছে ।
– তুমি একবার প্যাকিংটা চেক করে নাও, আমি পেমেন্ট করে আসি “।তৃষানু ম্যানেজার রুমের দিকে গেল।
-আচ্ছা রুম নাম্বার ৭ এর কেউ আসেনি সকালের পর?” তৃষানু ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করল ।
– এসেছিল বিকেলে একবার, তবে বেশিক্ষণ থাকেনি।যাবার সময় ম্যাম আপনার জন্য এই প্যাকেট আর কাগজটা দিয়ে গেছেন “।ম্যানেজার প্যাকেট আর কাগজটা তৃষানুর হাতে দিল ।
তৃষানু দেখল প্যাকেটে আবির আর হলুদ পলাশ ফুল ।আর চিঠিতে লেখা – “দরজার পাশে রাখা তোমার আবির আর পলাশ সঙ্গে নিয়ে গেলাম। আর তোমার জন্যও রেখে গেলাম এই আবির আর পলাশ ।তুমি আমায় আমার মিতালী দিয়েছ ।তাই তোমায় দিয়ে গেলাম আমার মিতালি গাছের হলুদ পলাশ আর একটু আবির দিলাম আজকের এই শুভ বসন্ত উৎসবের জন্য ।এর থেকে বেশি কিছু দেওয়ার নেই আমার আজ ।মিতালী তোমার মতই গান করতে, আঁকতে ভালবাসে । আমি আর কখনও একা থাকি না, মিতালী সবসময় থাকে আমার কাছে। ভাল থেকো “। শেষে “তোমার মিতালীর মা”। পেমেন্ট করে তৃষানু শেলিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল স্টেশনের উদ্দেশ্যে।
ট্রেন ছুটছে ।বাইরে সকালের মত আলো নেই ,অন্ধকার ।তবুও তৃষানু চেয়ে আছে বাইরের দিকে। ট্রেনে এক ফকির গাইছে-
“তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন,মন রে আমার।
তাই জনম গেল, শান্তি পেলি না রে, মন, মন রে আমার ।
তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন, মন রে আমার “।

Spread the love

Check Also

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রহস্য গল্প, দ্বারকানাথের মেজদাদু

 দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়:   দ্বারকানাথের মেজদাদু দ্বারকানাথ ভূতে বিশ্বাস করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস …

তামাকপাতার দেঁজাভু সম্মাননা

 সীমিতা মুখোপাধ্যায়: হরেন দে ওরফে এবং হৃদয় এখন একজন মস্ত বড় কবি। তো দীর্ঘদিন কবিগিরি …

বামেশ্বরের সেকেন্ড ম্যারেজ

 নীলার্ণব চক্রবর্তী রোজই দ্বিপ্রহরে ঝিলে স্নান করতে যান বামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। আর তার পিছন পিছন ধাওয়া …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *