রবিবারের গল্প

Sunday, March 10th, 2019

 কিশোর ঘোষ

 

Ads code goes here

সুন্দর কান্না

 

ঢেউ হল সমুদ্রের ঠোঁট।

সেই নোনতা জলের ঠোঁট এখন রিয়ার নগ্ন পায়ে আদরের কামড় বসাচ্ছে। ফিরে যাচ্ছে, আবার আসছে আদিগন্ত শব্দ তুলে। যে স্পর্শের অপেক্ষায় রাতের পর রাত একা কাটিয়েছে সে, যে আদরের অভাবে ঘুমের ওষুধ না খেলে, নেশা না করলে বাঁচা অসম্ভব, সেই স্পর্শ! আহ, কতদিন পর! আশ্চর্য জ্যোৎস্না রাতে আকাশের গোল চাঁদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রিয়া। মনে মনে বলল, না, আজকের রাতটায় অন্তত বিষাদের দাগ থাকবে না, কোথাও, কোনওখানে। কারণ সে আজ সমাজ সভ্যতা থেকে দূরে, লাজলজ্জার বাইরে।

অলস ভঙ্গিতে কুলকিনারাহীন সমুদ্রের দিকে যেমন খুশি পা ছড়িয়ে বসল রিয়া। দু’হাতে ভেজা বালিতে ভর দিল। আজ তার অপূর্ব শরীরে দু’ টুকরো গোলাপি আড়াল কেবল। চুল খোলা। সাগর-হাওয়ায় সেই চুল রিয়ার মনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ছে।

নুপূর পড়া পা দিয়ে জল ঘাঁটতে ঘাঁটতে অর্ককে খুঁজল রিয়া। পেয়েও গেল। ওই তো, ছেলেটা মন দিয়ে ঝিনুক কুড়াচ্ছে। কখন যেন অনেকটা দূর চলে গেছে! কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে থাকল রিয়া। তার মনে হল, এ অর্ক না, এই যুবক অলীক! হয়তো মানুষ না, অন্য গ্রহ থেকে এসে নেমেছে এই জ্যোৎস্নাবিচে! হয়তো রিয়ার সঙ্গে একটা রাত কাটিয়েই ফিরে যাবে নিজের গ্যালাক্সিতে!

মায়াবী আলো-আঁধারে অর্ককে মনে হচ্ছে নগ্ন। ওর স্কিন টাইট সর্টস সুঠাম শরীরে যেন হারিয়ে গেছে, যেন এঞ্জেলোর নগ্ন ডেভিড! তবে পাথরের না, রক্তমাংসের এই মূর্তি। যেমনটা চেয়েছিল রিয়া, ঠিক তাই। রিয়া খুশি। খুব। বহুদিন পর ছোটবেলার মতো আনন্দ ঢুকে পড়েছে তার ভিতরে। অতিরিক্ত ভালো লাগায় গা শিরশির করছে। এই রিয়াকে দেখে কে বলবে যে সে জীবনক্লান্ত, কে বলবে এই মেয়ে একবার না, দু’ দু’বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে! দু’বারের কারণ দু’রকম।

প্রথমটা বিয়ের আগে। ঋতমের সঙ্গে তিন বছরের সম্পর্কটা ভাঙার পর।

ওদের যোগাযোগ জানাজানি হতেই হয়েছিল বিপত্তি। গরিব ক্লার্কের ছেলে ঋতমকে তাদের সুন্দরী বিদূষী মেয়ের উপযুক্ত বলে মনে করেনি রিয়ার অর্থবান অভিজাত পরিবার। প্রেম তো ভাঙলই, সেই সঙ্গে বন্ধ হল পড়াশুনো। কলেজে গেলে যদি ওই ছেলের সঙ্গে মেয়ের দেখা হয়! সেলফোনটাও কেড়ে রাখা হল। তোড়জোড় শুরু হল বিয়ের। বাধ্য হয়ে এক সন্ধেবেলা ছেলেপক্ষের সামনে সেজেগুজে বসে রাতে গলায় দড়ি দিল রিয়া। কিন্তু মরল না! ওড়না ছিড়ে পাথরের মেঝেতে পড়ে হাত ভাঙল। দ্বিতীয়বারের ঘটনা বিয়ের পর।

অনেক সহ্য করার পর যেদিন আর পারল না। বর অনুরাগকে সরাসরি বলল, ‘তোমার গায়ে অন্য মেয়ের গন্ধ কেন?’

অনুরাগের এক হাতে তখন কাচের গ্লাস ভর্তি হুইস্কি। আরেক হাতে সে রিয়ার কোমর জড়িয়ে কপালে চুমু খেল। হাসতে হাসতে বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়ো বেবি, সুইট ড্রিম।’

কিন্তু বরের মিথ্যে আদর থেকে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল রিয়া।

বউয়ের রাগ দেখে বিচ্ছিরি হাসল অনুরাগ। বলল, ‘তোমরা মেয়েরা না… পারও বটে… অন্য মেয়ের গন্ধ!’

কিন্তু রাগে তখন কাঁপছে রিয়া। অনেক দিনের চাপা ক্ষোভ উথলে উঠলে যা হয়। বলল, ‘কথা ঘুরিও না অনুরাগ। সব জানি। গত মাসে বিজনেস ট্যুর বলে পিএ মেয়েটার সঙ্গে ব্যাংককে যাওনি তুমি? বল, যাওনি?’

এবার গম্ভীর হয়ে গেল অনুরাগ। বলল, ‘গেছিলাম। তো?’

প্রচণ্ড চিৎকার করল রিয়া, ‘মানে?’

অনুরাগ আরও জোরে চেঁচাল, ‘স্টপ ইট নাউ। গেছি তো গেছি, বেশ করেছি।’

কষ্টে, যন্ত্রণায় কাণ্ডজ্ঞানশূন্য রিয়া ঠাস করে চড় বসাল বরের গালে।

এরপর সোফা থেকে উঠে রিয়ার গলা টিপে ধরেছিল অনুরাগ। অনেক চেষ্টা করেও ওই শক্ত হাত ছাড়াতে পারছিল না রিয়া। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

গলা খামচে ধরে রিয়ার মুখের কাছে মুখ এনে শুনিয়ে দিয়েছিল অনুরাগ, ‘ঘরের বউ, ঘরের বউয়ের মতো থাকবে। অনুরাগ বসু কোনও মাগির দেমাক পছন্দ করে না, বুঝলে।’

রিয়াকে মুক্তি দিয়ে অনুরাগ আরও বলেছিল, ‘লিসেন, কলকাতার ওয়ান অব দ্য টপ বিজনেস ম্যান এই শর্মা। আই অ্যাম সাকসেসফুল। হোয়াই? ডু ইউ নো? প্রচুর হেডেক নিই, শাল্লা টু মাচ চাপ। একটু রিল্যাক্স করব না? আর তুমি? কী কর সারাদিন? আমার পয়সায় খাচ্ছ আর ঘুমোচ্ছ।’

রিয়ার শরীর মনের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা নেই তখন। সে দেওয়ালে হেলান দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। সেই কান্নায় শব্দ ছিল না, শুধু বাঁধ ভাঙা জলে ভেসে যাচ্ছিল চোখ।

ততক্ষণে হুইস্কির নেশায় গলা জড়িয়ে গেছে অনুরাগের, ‘অ্যান্ড দিজ আর মাই রিল্যাক্সসেশন। ইচ্ছে করলে তোমার মতো দশটা বউ পুষতে পারি, জানো! সেটা তো করছি না, ব্যাস। ইন ফিউচার এসব নিয়ে বলতে এসো না। ভালো না লাগলে জাস্ট গেট আউট অব মাই প্রপার্টি। গো টু হেল।’

এই ঘটনার পর বাপের বাড়িতে ফিরতে চেয়েছিল রিয়া। পরদিন সকালে ফোনও করেছিল। সব শুনে বাবা বলল, ‘ভেঙে পড়িস না মা, কদিন এখানে ঘুরে যা।’ ঘটনা শুনে প্রথমটায় কেঁদে ফেলেছিল মা। রিয়ার সঙ্গে সমান তালে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলেছিল, ‘অ্যাডজাস্ট কর। সব সংসারে হয়। একটা বাচ্চাকাচ্চা হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। মেয়ে হয়ে জন্মেছিস, একটু তো সহ্য করতে হবে মা।’

মা বাবার এ হেন বক্তব্যের পর অভিমানী রিয়া নিজের কষ্ট নিজের ভেতরেই রেখে দেওয়া অভ্যাস করেছিল। তবে মা’র ওই কথাটা মনে ধরেছিল রিয়ার— সত্যি তো, একটা বাচ্চা এলে তাকে নিয়েই থাকতে পারত সে! এতদিনে এসে যাওয়ারও কথা! পাঁচ বছর হতে চলল বিয়ের! কেন হচ্ছে না?

ডাক্তারের কাছে গেল রিয়া। জানল তার কোনও সমস্যা নেই। তবে কি অনুরাগের! ব্রেকফাস্ট টেবিলে একদিন সাহস করে অনুরাগকে অনুরোধ করল রিয়া। নিজের ডাক্তার দেখানোর কথা জানিয়ে বলল, ‘তুমিও একবার ডাক্তারের পরামর্শ নাও প্লিজ। তুমি তোমার মতো থেকো। কথা দিচ্ছি, আমি তোমার কোনও বিষয়ে নাক গলাবো না। শুধু একটা সন্তান চাই আমার। ওকে নিয়ে থাকব, বড় করব।’

কিন্তু এ কথা যতবার বলেছে রিয়া ততবার খেপে গেছে অনুরাগ। একদিন তো গায়ে হাত তুলল। মেধাবী রিয়া যা বোঝার বুঝে গিয়েছিল। বুঝেছিল সে আটকে পড়েছে এক গোলকধাঁধায়। পথ নেই।

সেবার এক খটখটে দুপুরে ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল রিয়া। এক সঙ্গে এক পাতা। যমে-মানুষে টানাটানি হল। তিন দিন ভর্তি ছিল নার্সিংহোমে। এবং বেঁচে গেল! এরপরই বদলে নেয় সে নিজেকে। এতদিনের কম কথা বলা লাজুক মেয়েটা নিজেকে পাল্টে নিল বেমালুম! মদ ধরল। কাজের মধ্যে সারাদিন সোশ্যাল সাইট খুলে বসে থাকা। নানা পোশাকে, ভঙ্গিতে সেলফির পর সেলফি আপলোড। সেই ছবি দেখে হামলে পড়তে শুরু করল ভণ্ড প্রেমিকের দল। সবাই ডেসপারেট। ঝোপ বুঝে কোপ মারতে তৈরি। কিন্তু অর্ক অন্যরকম, আলাদা।

ছেলেটা সেকেলে টাইপ, ভিতুমার্কা। কদিনের আলাপেই রিয়া বুঝেছিল বোকা বোকা অর্ককে ভালো লাগল রিয়ার। ওদের চ্যাট বক্সের আড্ডার সময় বাড়তে থাকল ক্রমশ। প্রথমে শুধু রাতে, পরে দিনে দু’বার। অর্ক মূলত শ্রোতা। রিয়া উল্টো। সে বমি করছিল, শব্দবমি। কতদিনের কত না বলা, বুকের মধ্যে দলা পাকিয়ে থাকা কথারা হুরমুর করে বেরোতে শুরু করল অর্ককে পেয়ে! একদিন তার আর আনুরাগের অসুখি দাম্পত্যের কথাও বলে ফেলল। শুনে অর্ক পরামর্শ দিল, ‘একটা এনজিও জয়েন করো।’ বলল, ‘ভালো স্টুডেন্ট ছিলে। গরিব ছেলেমেয়েদের পড়াও। দেখবে সময় কেটে যাবে, মনও ভালো থাকবে।’

তাই করল রিয়া। সত্যি সত্যি অর্কর পরামর্শে সে আগের থেকে ভালো আছে এখন। কিন্তু কথায় কথা বাড়ল। দিনকে দিন একে অপরের কাছের মানুষ হয়ে উঠছিল ওরা। অল্প কাছের না, বিপজ্জনক বেশি কাছের। তবে সরাসরি না, সবকিছুই চলত ইঙ্গিতময় ভাষায়। দু’জন দু’জনকে কী চোখে দেখে স্পষ্ট করে বলেনি কখনও ওরা। যদিও ইদানীং ‘তোমাকে একটা কথা বলার আছে, জরুরি কথা, না বললেই নয়’ ইত্যাদি গাইতে শুরু করেছে অর্ক। রিয়ার ভালো লাগছে, শুনতেও ইচ্ছে করছে সেই অমোঘ উচ্চারণ, তবু এড়িয়ে যায় সে। কিন্তু আজকের দিনটা আলাদা।

আজ সে নাম পরিচয় গুলিয়ে ফেলতে চায়, ইচ্ছে করে। তবু ভিতরে ভিতরে খচ খচ করে রিয়ার, সে কি অন্যায় করছে? অর্কর মতো একটা ছোট ছেলে…? ভাবনা ভেঙে যায় অর্করই ডাকে।

ঝিনুক তোলা থামিয়ে খানিক দূর থেকে অর্ক বলল, ‘তোমার নাম আজ মৎসকন্যা।’

হাসল রিয়া। অর্ক যাতে শুনতে পায়, সমুদ্রের শব্দ ডিঙিয়ে যাতে তার কণ্ঠস্বর পৌঁছোয় অর্কর কাছে, তাই চিৎকার করে উত্তর দিল, ‘তাই বুঝি?’

অর্ক বলল, ‘মৎসকন্যা, আমরা এখানেই থেকে যাব। সারা জীবন। এই সমুদ্রের পাড়ে। ঝাউডাল-পাতার কুটির বানাব। সেই গরিব কুটির প্রাসাদ হয়ে যাবে, যেই তাতে তুমি ঢুকবে। আমার তৈরি প্রাসাদে থাকবে তো মৎসকন্যা?’

‘ঠিক থাকব।’

রিয়ার আদুরে উত্তর সমুদ্রহাওয়ায় উড়ে উড়ে অর্কর কাছে পৌঁছতেই অর্ক শিশুর মতো দৌড়ে এসে রিয়ার গা ঘেঁষে বসল। হাঁপাতে হাঁপাতে আদর করতে শুরু করল রিয়াকে। তারপর মুঠো থেকে একটা একটা করে ঝিনুক বের করে ছড়িয়ে দিল প্রায় উন্মুক্ত রিয়ার শরীরে।

মিষ্টি হেসে হাত বাড়াল রিয়া। অর্ক হাত ধরতেই উঠে বসল। রিয়া জাপটে ধরল অর্ককে, শরীরের সব ভার ছেড়ে দিল তরুণ প্রেমিকের শরীরে। টাল সামলাতে পারল না অর্ক। রিয়াকে জাপটে ধরে শুয়ে পড়ল বালির বিছানায়। অসমবয়সি দুই নারী-পুরুষ একে অপরের মধ্যে হারিয়ে গেল গভীর রাতের অলৌকিক জ্যোৎস্না-সৈকতে।

হুস ফিরতে কেঁদে উঠল রিয়া।

অর্ক বলল, ‘কী হল, কী হয়েছে তোমার?’

থতোমতো রিয়া বলল, ‘গাড়িটা? দেখা যাচ্ছে কেন? যেটায় করে পালিয়ে এখানে এলাম আমরা!’

অর্ক বলল, ‘আমরা তো কোথাও আসিনি!’

রিয়া চেঁচিয়ে উঠল, ‘আসিনি মানে? এই সমুদ্র, আকাশ, চাঁদ, তুমি, আমি… স-ব মিথ্যে?’

নিজের চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল রিয়ার।

বালিশের তলা থেকে ফোন হাতড়ে বের করল সে। সাড়ে নটা। মনে পড়ল, আজ শনিবার। দশটার মধ্যে বস্তির স্কুলে পৌঁছতে হবে। ছেলেমেয়েগুলো অপেক্ষা করছে। জলদি বিছানা ছাড়ল রিয়া।

কিন্তু সেলফোন জ্বলে উঠল।

চ্যাটবক্সে অর্কর মেসেজ, ‘তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।’

প্রতিবারের মতো আজ আর না বোঝার ভান করল না রিয়া। সরাসরি বলল, ‘জানি।’

‘জানো!’

‘হ্যাঁ।’

‘কী জানো?’

‘আজ থাক।’

‘কেন?’

‘বললেই তো বলা হয়ে যাবে অর্ক। যত দিন না বলা…’

‘বুঝলাম না।’

‘বড় হলে বুঝবে।’

অর্ক লিখল, ‘ছোট ভাবছ আমাকে?’

রিয়া লিখল, ‘পরে কথা হবে, কাজ আছে। এখন বাই প্লিজ।’

ফোনটা বিছানায় ছুড়ে এক দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার খুলে দিল রিয়া। ফের কান্না লুকোতে হবে তাকে। তবে এবারের কান্না আলাদা। আগের দু’বারের মতো কুৎসিত না, কষ্টের হলেও সুন্দর এই কান্না।

নোনতা জলের সমুদ্রে নিজেকে হারাতে হারাতে রিয়া ঠিক করে, সুন্দর কান্নার কথা সে কাউকে বলবে না, অর্ককেও না।

 

Spread the love

Best Bengali News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is Bengal's popular online news portal which offers the latest news Best hindi News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is popular online news portal which offers the latest news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement