মৃণাল সেনের সিগারেটে গাঁজা পুরে দিয়েছিলেন নাসিরুদ্দিন

Monday, December 31st, 2018

 কমলেন্দু সরকার

নাটকের নামটি স্মরণে নেই। অ্যাকাডেমির জল খাওয়ার জায়গার পাশেই দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম বিভাসদার সঙ্গে। বিভাসদা অর্থাৎ বিভাস চক্রবর্তী। নাটকের দশ মিনিটের বিরতি। অনেকেই প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরোতে শুরু করেছেন। উদ্দেশ্য চা-সিগারেট খাওয়া। কারওর কারওর হাত-পা ছাড়িয়ে নেওয়া। সেদিন বেশ ঠান্ডা পড়েছিল কলকাতায়। বিভাসদা বললেন, “দাও একটা সিগারেট খাই।”
দু’জনে সিগারেট ধরিয়ে নানান গল্প করছি। দীর্ঘদেহী মৃণাল সেনকেও বেরোতে দেখলাম হল থেকে। বিভাসদাকে দেখে এগিয়ে এলেন। সম্ভবত মৃণাল সেনকে দেখিনি সিগারেট হাতে। বিভাসদার সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন। কথার ফাঁকে বিভাসদা আমার সঙ্গে পরিচয়ও করিয়ে দিলেন। সেই প্রথম মৃণাল সেনের মুখোমুখি। এ-কথা সে-কথার পর গাঁজা খাওয়ার ঘটনার স্মৃতি উসকে দিলেন বিভাসদা। মৃণালদা জানালেন, “সেদিনের ওই ঘটনা মনে পড়লে এখনও হাসি আসে। খুব মুশকিলে পড়েছিলাম। সিগারেটে গাঁজা পুরে নাসিরুদ্দিন আমাকে দিয়েছিল। হোটেলের ওদের ঘরে। আমি নাসিরকে বললাম, সিগারেটটা খেতে খেতে কেমন কেমন যেন লাগছে! নাসির বলেছিল, ‘ও কিছু নয়।’ সিগারেটটা শেষ করে মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করতে লাগল। আমার ঘরে যাওয়ার জন্য বেরোলাম। ঘর আর খুঁজে পাই না। অন্যের ঘরে প্রায় ঢুকে পড়ছি এমন সময় নাসিরই আমাকে আমার ঘরে দিয়ে গেল। আসলে নাসির আমার পিছন পিছন আসছিল। আমাকে দেখার জন্য। আমি কি করি তা দেখতে…।” বাকিটা আর শোনা হল না। নাটক শুরুর বেল বাজতেই।
এরপর বেশ কয়েকবার কথা হয়েছিল মৃণাল সেনের সঙ্গে। তবে আর একদিনের ঘটনা আজও মনে পড়লে হাসি আসে। তখন ‘আনন্দলোক’-এর সম্পাদক ঋতুপর্ণ ঘোষ। সম্পাদকীয় কোনও কাজের জন্য ঋতুর ঘরে বসে। কোনও একটা লেখার জন্য ঋতুকে বললাম, এটা মৃণালদাকে দিয়ে লেখাও না। ঋতু এককথায় রাজি। বলল, “মৃণালদাকে ফোন কর।” ফোন বাজতেই ওপ্রান্তে মৃণাল সেন। নাম বলতেই উনি বললেন, “বলো।” সব বললাম। উনি সেসবের ধারেকাছে গেলেন না। বললেন, “আমি ভাবছি তোমাদের দফতরে যাব।” আমি মহানন্দে বললাম, আসুন না একদিন খুব ভাল লাগবে। কবে আসবেন? মৃণালদা বললেন, “যাব। তবে ১১টা… কিনে নিয়ে যাব।” কি কিনে নিয়ে আসবার কথা উনি বলেছিলেন সেটা উহ্য থাক। উহ্য থাক আরও যেসব কথা হয়েছিল ফোনে। উনি যে খুব মজা করতে পারেন সেদিনই বুঝেছিলাম।

Ads code goes here


এহেন মৃণাল সেনের কথা থাক। ফিল্মমেকার মৃণাল সেনের কথায় আসি। ১৯৫৫ থেকে ২০০২ এই ছিল চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনের জীবন। মোট ৪৭ বছর। অর্থাৎ ১৯৫৫ তৈরি ‘রাতভোর’ থেকে ২০০২-এর ‘আমার ভুবন’। মোট গোটা আটাশেক কাহিনি চিত্র। সারা বিশ্ব চিনেছিল চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনকে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে একসঙ্গে উচ্চারিত হয় সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল এই তিনটি নাম।
মৃণাল সেন তাঁর প্রতিটি ছবিতে এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন। খুঁজেছিলেন বিষয়-ভাবনা। এখানেই মৃণাল ছিলেন সকলের চাইতে ভিন্ন। ফিল্ম নিয়ে তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষা ছিল একজন বৈজ্ঞানিকের মতো। একজন বিজ্ঞানীর যেমন গবেষণার অস্ত্র মাইক্রোস্কোপ, ঠিক তেমনই মৃণালের মাইক্রোস্কোপ ছিল তাঁর ক্যামেরা, তাঁর চিত্রনাট্য। ‘রাতভোর’-এর কথা বাদ দিলাম। দ্বিতীয় ছবি ‘নীল আকাশের নীচে’ (১৯৫৯)। অনেকের কাছেই খুবই সাদামাটা ছবি। যাঁরা এমন ভাবনা পোষণ করেন তাঁরা পিছনের দিকটা এতটুকু ভাবেন না। ১৯৪৯-এ চিনে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখলের পর চিনাদের সন্দেহের চোখে দেখা হত। চিনা মানেই সন্দেহভাজন লোক। অথচ ‘নীল আকাশের নীচে’র মধ্যে দিয়ে অসাধারণ সুন্দর এক মানবিক দলিল সৃষ্টি করেছিলেন মৃণাল সেন। চিনা মানেই যে কমিউনিস্ট নন, শত্রু নন, সেটা এই ছবির মধ্যে ফুটে উঠেছিল। একজন সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের সঙ্গে তাঁর দেশের নীতির বা রাজনীতির কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে না। একজন সাধারণ মানুষের কাছে বেঁচে থাকার সমস্যাটা অতিক্রম করা অনেক বেশি ভাবনার। হয়তো ছবিটি ন্যারেটিভ। মৃণাল সেনের আর পাঁচটা ছবির মতো নয়। তাতে কী যায়-আসে! ছবির বিষয়বস্তুর মধ্যে কি এক্সপেরিমেন্ট থাকতে পারে না! অবশ্যই পারে। সে-জায়গায় ভীষণভাবে সফল মৃণাল সেন।
মৃণাল সেন প্রতিটি ছবির মধ্যে দিয়ে তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষা এগিয়ে নিয়ে গেছিলেন। ছবির আর্থিক সাফল্য-অসাফল্যের দিকে তাকিয়ে কখনও থেমে থাকেননি। তাঁর সমস্ত ছবি নিয়ে স্বল্প পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়। করতে যাওয়াটাও বোকামি।


মৃণাল সেনের কাজের জীবনের বিশাল ক্যানভাস এবং সেই ক্যানভাসে রয়েছে কখনও জল রঙে কাজ, কখনও অ্যাক্রেলিকে, কখনও মিশ্র মাধ্যমে আবার কখনও-বা তেল রঙে। তাই সেই ক্যানভাসে টুকরো টুকরো কিছু তুলে আনায় শ্রেয়। আশির প্রথম দিকে তাঁর তৈরি ‘খারিজ’। অসাধারণ ছবি। এমন বিষয়, এমন ট্রিটমেন্ট, সবমিলিয়ে ‘খারিজ’-এর মতো ছবি অতীতে হয়েছে কী! জানি না। প্রয়োজনও নেই। মধ্য সত্তর দশক থেকে বাঙালি মধ্যবিত্তদের বিশ্বাস এবং মানসিকতায় বহু বদল ঘটেছে। ভেঙে তছনছ হয়েছিল বাঙালি মধ্যবিত্তেরা। শুধু বাঙালি নয়, সারা দেশের মধ্যবিত্তদের ছিল একই অবস্থা। সেখানে দাঁড়িয়ে মৃণাল সেনের ‘খারিজ’ অত্যন্ত মূল্যবান একটি ছবিএবং দলিলও বটে। রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাসটিও উঁচুমানের। তবে চলচ্চিত্র আর সাহিত্য যে এক নয় তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন পরিচালক। সিনেমার ভাষা ভীষণ সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছিলেন মৃণাল। সাহিত্যের ভাষা অতিক্রম করেছিল ছবির ভাষা। তাই একটা পূর্ণঙ্গ চলচ্চিত্র হয়েছিল ‘খারিজ’। রমাপদ চৌধুরী একবার আলোচনা সূত্রে সেকথা বলেওছিলেন আমাকে। তিনি বলেছিলেন, “আমার লেখার চেয়ে মৃণাল সেনের ‘খারিজ’ অনেক ভাল।” সবমিলিয়ে মৃণাল সেনের ‘খারিজ’ হয়েছিল চলচ্চিত্রের সাহিত্য।
‘খারিজ’-এর বছর দুই আগে বানিয়েছিলেন ‘আকালের সন্ধানে’। ছবিটি ফিল্ম উইদইন ফিল্ম। নতুন কিছু নয়। তবে শুটিং দলের আকালের মুখোমুখি হওয়াটা অবশ্যই নতুন কিছু পাওয়া। ‘আকাল আমাদের সর্বাঙ্গে’। এই সংলাপটি এখনও চমকে দেয়। স্বাধীনতার সত্তর পেরোলেও আজও শুনতে পাই কিংবা খবরে শুনি-পড়ি ‘আকাল আমাদের সর্বাঙ্গে।’ দেখতেও পাই খেতে না-পাওয়া মানুষের ছবি। সে-ছবি দেশের কিংবা বিদেশের। এখানেই মৃণাল সেনের ছবির সার্থকতা। তাঁর ছবির বিষয় দেশের কালের মাত্রা কাটিয়ে সর্বদেশ সর্বকালের হয়ে ওঠে।
সত্তরের দশকে বেশ কয়েকটা ছবি করেছিলেন মৃণাল সেন। প্রতিটি ছবিরই আছে আলাদা আলাদা গুরুত্ব। তার মধ্যে ইন্টারভিউ, কলকাতা ৭১, পদাতিক আর কোরাস বিশেষভাবে ইমপর্ট্যান্ট। আমার ধারণা, সত্তরের নকশাল আন্দোলন পরিচালক মৃণাল সেনের মন আলোড়িত করেছিল। সেই আলোড়ন থেকেই এইসব ছবির সৃষ্টি। আমাদের দেশে এক শ্রেণির মানুষের ভিতর কাজ করত কলোনিয়াল হ্যাংওভার। এখনও অনেকেই এই ঔপনিবেশিক আচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত নন। সেই ভাবনা থেকেই মৃণালের ‘ইন্টারভিউ’।
‘কোরাস’ তো রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে কিংবা কর্পোরেট সিস্টেমের বিরুদ্ধে বেকার যুবকদের জেহাদ। ১৯৭৪-এ তৈরি এই ছবিতে পাওয়া গিয়েছিল জরুরি অবস্থার আভাস। ‘কোরাস’-এর ফর্ম এবং প্যাটার্ন নিয়ে মৃণালের যে এক্সপেরিমেন্ট তা এককথায় অতুলনীয়। এখানে পরিচালক তাঁর জাত চিনিয়ে দিলেন। তিনি অন্য জাতের পরিচালক তা বুঝে নিতে অসুবিধা হয়নি কারওর।


১৯৬৯-এ তৈরি ‘ভুবন সোম’-এ দেখালেন সম্পর্ক এবং দুর্নীতি কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে রিলেটেড হয়ে যায়। সৎ মানুষও অসহায় হয়ে পড়ে। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক ল্যান্ডমার্ক ছবি ‘ভুবন সোম’। এমন ছবি আগেও হয়নি, এখনও দেখা যায়নি।
‘আকাশ কুসুম’ (১৯৬৫), ‘খণ্ডহর'(১৯৮৩) দু’টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছবি।
অনেকের কাছেই শুনেছি মৃণাল সেনের ছবিতে অমুক বিদেশি পরিচালকের প্রভাব আছে। আমার ব্যক্তিগতভাবে তিনি প্রভাবমুক্ত এক স্বাধীন পরিচালক। তাঁর ছবি ভীষণভাবেই দেশজ সংস্কৃতির বা ভাবধারার সঙ্গে জড়িয়ে। মৃণাল সেন ছবি তৈরির কাজে যে-সাহস দেখিয়েছেন, সেই সাহস আগে বা পরে কোনও পরিচালক তেমনভাবে দেখাতে পারেননি। মৃণাল সেন শুধু বাংলা নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্র দুনিয়ায় এক নবদিগন্ত খুলে দিয়েছেন। মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রজীবনের এক্সপেরিমেন্ট সফল।

Spread the love

Best Bengali News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is Bengal's popular online news portal which offers the latest news Best hindi News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is popular online news portal which offers the latest news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement