হারিয়ে যাওয়া বঙ্কিম

Wednesday, June 26th, 2019

পার্থসারথি পাণ্ডা:

বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা গানের কথা উঠলে, আমাদের একটা গানের কথাই মনে আসে, সেটা হল, ‘বন্দেমাতরম’। ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের সূত্রেই বাঙালির হৃদয়ে প্রথম জায়গা করে নেয় এই গানটি। কারণ, এ তো শুধু গান নয় স্বদেশ মায়ের উদার বন্দনা। পরাধীন দেশে এ গান হয়ে ওঠে বিপ্লবীদের মুক্তিমন্ত্র, স্বাধীন দেশের জাতীয় স্তোত্র। শোনা যায়, গানটির প্রথম সুরকার যদু ভট্ট। তবে, বঙ্কিমের ছোট ভাই পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বঙ্কিমচন্দ্রের বাল্যকথা’ নামের স্মৃতিকথায় ‘বন্দেমাতরম’ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কিন্তু প্রথম সুরকার হিসেবে যদু ভট্টের নাম উল্লেখ করেননি। গানটি যখন লেখা হয়, তিনি তখন ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রকাশনার সঙ্গে জড়িয়ে। ফলে, যদু ভট্টের মতো বিখ্যাত মানুষ এই গানে প্রথম সুর দিলে তিনি নিশ্চয়ই তা উল্লেখ করতেন। তিনি লিখেছেন, ‘এই গীতটির একটা সুর বসাইয়া উহার গাওনা হইত। একজন গায়ক প্রথমে উহা গাহিয়াছিলেন। বহুকাল পরে বন্দেমাতরম সম্প্রদায় কোরাসে গাহিবার জন্য মিশ্র সুর বসাইয়াছিলেন; পরে শ্রীমতী প্রতিভা দেবী আর একটি সুর বসাইয়াছিলেন। বেহাগ সুরে ভালো লাগিলে লাগিতে পারে।’ যাই হোক, সেই অদ্যিকালে কোরাসের মিশ্র সুর বলুন আর প্রতিভা দেবীর সুরই বলুন– এ নিছক এখন তথ্য মাত্র, তখনও রেকর্ডের যুগ শুরু হয়নি, কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে।

Ads code goes here

সুর যে শুধু হারিয়ে গেছে, তাই নয় বঙ্কিমের লেখা গানও হারিয়ে গেছে। বঙ্কিমের তেরো চোদ্দ বছর বয়সে লেখা গান। গানটির গল্প শুনিয়েছেন পূর্ণচন্দ্র।

নৈহাটির গঙ্গায় নৌকায় চেপে বিজয়ার ভাসান দেখতে গিয়েছিলেন বঙ্কিম। সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই পূর্ণচন্দ্র। আর ছিলেন বাবা, দাদা এবং অন্যান্য গুরুজনেরা। ভাসানের আগে নৌকা বাইচ হল। দেখলেন। ভাসান হল। দেখলেন। বেশ আনন্দ হল। সেই আনন্দের মন নিয়ে ফিরতে গিয়ে কিশোর বঙ্কিমের চোখে পড়ল এক মর্মান্তিক দৃশ্য। গঙ্গার পাড়ে একটি চিতা জ্বলছে। দাহ চলছে। স্বামীর চিতার সামনে বেশ কিছু শ্মশানযাত্রীর মধ্যে সদ্য বিধবা একটি বউ, তাকে আটকে ধরে আছে একটি মেয়ে এবং কয়েকজন। বউটি সমস্ত বাধা ছড়িয়ে যেন উঠে পড়তে চাইছে চিতায়। মাথায় যেন তার সতী হওয়ার ভুত চেপেছে। কুসংস্কারের ভুত। লড়াইটা এক সময় থেমে যায়, বউটি জ্ঞান হারায়। এই দৃশ্যটি বালক বঙ্কিমের অন্যরকমভাবে ভাবিয়ে তোলে। স্বভাব কবির মতোই তক্ষুনি মনে মনে রচনা করে ফেলেন একটি গান–‘হারালে পায় কি ফিরে মণি–কি ফণিনী, কি রমণী?’ বড়দের তো শোনানো যায় না, তাই ছোটভাইকে কানে কানে শোনালেন সেই গান। মল্লার রাগে বাঁধা সেই গান বেশ কিছুদিন গাওয়ার উৎসাহ কবিকে পেয়ে বসেছিল, তারপর ধীরে ধীরে একদিন তাও নিভে গেল, গানটিও লুপ্ত হল। বঙ্কিমের মনে ছিল কিনা কে জানে, তবে উনি সে আর লিখে রাখেননি। পূর্ণচন্দ্রের ওই এক পংক্তিই মনে ছিল, বাকিটুকু হারিয়ে গেছে। সুর আর গান এক সাথে।

হারানোর তালিকায় সরস কিছু চিঠিও আছে। নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের বাল্যবন্ধু। যাকে বলে একবারে গলায় গলায় বন্ধু। দুজনের মধ্যে যে চিঠি চালাচালি চলত, তা যেন ছিল এক একটি রম্য সাহিত্য। সেগুলো ছিল দাদার অন্তরের সম্পদ। পূর্ণচন্দ্রের ইচ্ছে ছিল সেগুলো একসময় সংগ্রহ করার, কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমের বদলি জীবনে সেসব কোথায় হারিয়ে গেল, আর পাওয়া গেল না। পেলে, রবীন্দ্রনাথের পত্র সাহিত্যের মতো সেও এক সম্পদ হতো বাংলা সাহিত্যের।

Spread the love

Best Bengali News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is Bengal's popular online news portal which offers the latest news Best hindi News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is popular online news portal which offers the latest news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement