মহাবীরের নাম ‘বর্ধমান মহাবীর’ হয়েছিল কেন?

Wednesday, April 17th, 2019

পার্থসারথি পাণ্ডা:

চৈত্রের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথির রাত। বৈশালীর আকাশে তখন স্বমহিমায় জ্বল জ্বল করছে উত্তর-ফাল্গুনী নক্ষত্র। সেই নক্ষত্রের আলোয় শুভলগ্নে রাজা সিদ্ধার্থ আর রানি ত্রিশলার ঘর আলো করে জন্ম নিলেন মহাবীর। আমরা তাঁকে ‘মহাবীর’ বলছি বটে, তখনও কিন্তু তাঁর কোন নামকরণ হয়নি; তখন তিনি নেহাতই এক সদ্যোজাত শিশুপুত্র। জন্মের পর পরই স্বর্গ থেকে দেবরাজ ইন্দ্র এলেন তাঁকে দেখতে। দেখে তাঁর সাধ হল সাত সাগরের জল দিয়ে এই ভাবী তীর্থঙ্করকে স্নান-অভিষেক করানোর। অমনি তাঁর ইচ্ছেয় রাজা-রানি ও রাজপুরীর সকলে ঘুমিয়ে পড়লেন। শুধু মায়ানিদ্রা এলো না মহাবীরের চোখে, তাঁর মুখে তখন শুধু ইন্দ্রকে প্রশ্রয়দায়ী এক চিলতে সরল হাসি। অভয় পেয়ে মায়ের কোল থেকে নবজাতক মহাবীরকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে মেরু পর্বতের শিখরে গেলেন ইন্দ্র। তাঁর আদেশে দেবতারা ও দেবকন্যারা সমবেত হলেন সেখানে। দেবকন্যারা সোনার কলসি কাঁখে সংগ্রহ করে আনলেন সাত সাগরের জল। কিন্তু দেবতাদের মনে সন্দেহ হল, দেবরাজের শখ হয়েছে ভালো কথা, কিন্তু সদ্যজাত শিশুটি কি সাত সাগরের জল গায়ে সইতে পারবে? দেবতারা তখনও চিনতে পারেননি মহাবীরকে, ভাবতেও পারেননি পরমেশ্বরের মহাবীরজাতকের রহস্য। জানতেন শুধু ইন্দ্র। তিনি মুচকি হাসলেন। রহস্যটি নিজেই জানাতে চাইলেন মহাবীর, তিনি তাঁর পায়ের বুড়ো আঙুল দুটি দিয়ে চাপ দিলেন মেরু পর্বতের শিখরভূমিতে। আর অমনি প্রবলভাবে কম্পিত হতে শুরু করলো সেই পর্বতশিখর। দেবতারা এবং দেবকন্যারা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে দেবরাজের কাছে ত্রাণ চাইতে লাগলেন! তারপর তাঁদের চোখে পড়ল, এই প্রবল কম্পনের মাঝেও ইন্দ্রের আনা সদ্যোজাত শিশুটি অচঞ্চল-স্থির, তার মুখে যেন তিতিক্ষার হাসি। দেবতারা বুঝতে পারলেন শিশুটি কোন সাধারণ শিশু নন, দেবতাদের সংশয় ঘোচাতে তাঁদের বোধির জন্য তাঁর এই লীলা। তাঁরা সমবেতভাবে এই আশ্চর্য জন্মবীর শিশুটির বন্দনা করতে লাগলেন, সংশয় প্রকাশের জন্য ক্ষমা চাইতে লাগলেন। আর ঠিক তখনই মেরু পর্বতের সেই লীলাকম্পন একেবারে থেমে গেল। এই কম্পনে পৃথিবীর কোন ক্ষতি হল না, শুধু নেতিবাদী সংশয়ী ও দ্বিধাগ্রস্থের মনে ইতিবাচক পরিবর্তন এলো। ইন্দ্র দেবতাদের জানালেন, ভোগবাদী ও সংশয়বাদী মানুষের মনে ত্যাগের আচরণ ও অহিংসার তরঙ্গের মধ্য দিয়ে জাতিকে মুক্তির পথ দেখাতেই এই শিশুররূপে ধরায় আবির্ভুত হয়েছেন পরমশক্তিধর পরমেশ্বর। এই অবতারে ইনি অস্ত্র না ধরেও শুধু প্রেম আর ত্যাগ দিয়েই জয় করবেন ত্রিভুবন। তাই আমি এঁর নাম দিলাম, ‘মহাবীর’। দেবতারা হর্ষধ্বনি আর বন্দনা করতে করতে সাত সাগরের জল ও পুষ্প দিয়ে মহাবীরের অভিষেক সম্পন্ন করে তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন মায়ের কোলে।

Ads code goes here

তখন সকাল। রাজা সিদ্ধার্থের পুত্রজন্মের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত রাজ্যে। রাজ্যজুড়ে শুরু হল নন্দ উৎসবের মতো বর্ণাঢ্য আনন্দ উৎসব। প্রজাদের দান করার জন্য রাজা খুলে দিলেন রাজকোষ। এই সময় একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল, যে-সব রাজারা এতদিন সিদ্ধার্থের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন ক্রমাগত, যাঁরা তাঁর কিছুতেই বশ্যতা মেনে নিচ্ছিলেন না; সেইসব রাজারা উপহার সামগ্রী নিয়ে হাজির হলেন মহাবীরকে দেখতে। সমস্ত শত্রুতা ভুলে বন্ধুতার হাত বাড়িয়ে সিদ্ধার্থের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক তৈরি করে নিলেন। এভাবেই মহাবীরের জন্মের পরই দেখতে দেখতে বেড়ে উঠল সিদ্ধার্থের রাজ্যের পরিধি, পরের রাজ্য আপন হল, রাজ্যজুড়ে বিরাজ করতে লাগল অসীম শান্তি আর অগাধ সুখ। এই বৃদ্ধি দেখে রাজা ও রানি তাঁদের পুত্রসন্তানের নাম রাখলেন, ‘বর্ধমান’। এই ভাবে দেবদত্ত ও পিতৃদত্ত দুই নাম মিলে মহাবীরের নাম হল, ‘বর্ধমান মহাবীর’।

Spread the love

Best Bengali News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is Bengal's popular online news portal which offers the latest news Best hindi News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is popular online news portal which offers the latest news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement