কীভাবে গড়ে উঠেছিল পটারের আশ্চর্য জাদুজগৎ?

Friday, November 2nd, 2018

পার্থসারথি পাণ্ডা

১৯৯৫ সালে মাত্র তিরিশ বছর বয়সে রাউলিং লিখলেন পটার সিরিজের প্রথম উপন্যাস ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলসফারস স্টোন’। গল্পটা রাউলিং শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য লিখলেন বটে, তবু সাহস পেলেন না সেটা নিজের নামে ছাপতে। আশ্রয় নিলেন ছদ্মনামের, এমন একটি নাম যাতে বোঝা না যায় লেখক পুরুষ, না মহিলা। কিন্তু কেন? আসলে তাঁর ভয় ছিল একজন মহিলার লেখা বলে পাছে ছেলেমেয়েরা পাতি-তরল ভেবে বইটা না ছুঁড়ে ফেলে! একুশ শতকের দোরগোড়ায় এসে এমন ভাবনা একজন ব্রিটিশের পক্ষে নেহাত ছেলেমানুষি ভাবনা ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। সেদেশে শিশু-কিশোর সাহিত্য রচয়িতা হিসেবে মহিলা সাহিত্যিকের তো অভাব ছিল না। তাঁর অনেক আগে জেন গারডম, জেনি বাকের, এডিথ হগেটস প্রভৃতি অনেক খ্যাতনামা লেখিকা ছোটদের জন্য নানা স্বাদের গল্প উপন্যাস লিখে গেছেন। স্বনামেই। সুখ্যাতির সঙ্গে। এবং ছোটদের জন্য তাঁদের লেখার মধ্যে ফেয়ারি টেল ছিল অনেকটা জায়গা জুড়ে। রূপকথাও ছিল। সেগুলো বেশ জনপ্রিয়ও ছিল। তবু জোয়ানে রাউলিং, জে কে রাউলিং নামের আড়ালে যে জাদু আর রূপকথার মোড়কে পটার কাহিনি লিখলেন তাতে নতুন এমন কী দিলে, যাতে প্রথম প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের প্রায় সমস্ত ভাষায় তাঁর বই অনূদিত হল, বিশ্বশিশু-কিশোরেরা মোহিত হল? রাতারাতি তিনি এত জনপ্রিয় হয়ে গেলেন এবং কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী লেখক হয়ে উঠলেন?

Ads code goes here

১৯৬৫ সালের ৩১ জুলাই জন্ম হয়েছিল রাউলিং-এর। বাবা জেমস ছিলেন একজন এয়ারক্রাফট এঞ্জিনিয়ার আর মা অ্যানি সায়েন্স টেকনিশিয়ান। বাবামার ব্যস্তজীবনে রাউলিং এর শৈশবসঙ্গী ছিল শুধুই একাকীত্ব। তাঁর একটি বোন ছিল বটে, তার একঘেয়ে সঙ্গ তাঁকে একাকীত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারেনি। সেই একাকীত্ব বিরাট হয়ে দাঁড়াল যখন মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং বাবার সঙ্গে মায়ের সম্পর্কটা একটা চরম তেতো জায়গায় গিয়ে পৌঁছল। শৈশব এই দমবন্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তি চায়। সেই মুক্তি আসে কল্পনার উড়ালে, স্বপ্নের পাখায়। আর সেই কল্পনা এলো তাঁর আশৈশবের সঙ্গী একাকীত্বের বন্ধু ফেয়ারি টেলের জগত থেকেই। বাস্তবতার বিপরীতে তৈরি হল নিজেকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের মধ্যে তাঁর দ্বিতীয় এক জগত। সেখানে তাঁর হাতে জাদুময় এক আশ্চর্য ক্ষমতা, যে ক্ষমতা দিয়ে সমস্ত বাধাকে অতিক্রম করে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। সেই দ্বিতীয় জগতেই জন্ম হল একদিন হ্যারি পটারের।

উনিশ শো নব্বইয়ের এক সকালে তিনি লন্ডন থেকে ম্যাঞ্চেস্টার যাচ্ছিলেন। ট্রেন কোন কারণে চার ঘন্টা লেট হয়ে গেল। এই সময়টায় তিনি একটা প্লট ভেঁজে ফেললেন। সেই প্লটে এমন একটি স্কুলের কথা তিনি সাজিয়ে ফেললেন, যেখানে জাদু শেখানো হয়। হ্যারিকে হিরো করে গল্পটা লিখতেও শুরু করলেন। কিন্তু এই লেখার সময়টায় তাঁর জীবনে নানা দিক থেকে নানান বিপত্তি আসতে শুরু করল। আর তারই ছায়া পড়তে লাগল তাঁর গল্পে। এই সময় রাউলিংএর মা মারা গেলেন, স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হল, নেমে এলো দাম্পত্যজীবনে অশান্তি। গল্পে হ্যারি হয়ে উঠল মা-বাপ মরা একটি ছেলে, কাকাকাকিমার বাড়িতে তার ওপর অত্যাচারের যেন শেষ নেই। তাঁরই ছায়াজীবন হয়ে উঠল হতভাগ্য হ্যারি। গল্পে এগারো বছর বয়সে হ্যারির কাছে যখন হগারটের জাদুস্কুলের ডাক এলো চিঠি মারফৎ, তখন সেই চিঠি কাকাকাকিমা পুড়িয়ে ফেলল। সেই ছোট থেকেই বাস্তবের রুক্ষ্মতা থেকে রাউলিং যখনই কল্পবিশ্বে শান্তি পেতে চেয়েছেন, তখনই তাঁর বাবামার ঝগড়া-বিচ্ছেদ তাঁকে তাঁর সেই নিজস্ব জগতটি থেকে টেনে নামিয়েছে—এমনকি গল্প লেখার সময় তাঁর ব্যক্তিগতজীবনেও দাম্পত্য কলহ তাঁকে সেই জাদুবিশ্বে শান্তিতে অবস্থান করতে দেয়নি। এই প্রতিকূলতাগুলোই হ্যারি পটারে এসেছে অন্যভাবে। মন চেয়েছে তার থেকে অবিরত উত্তরণ। তাই শয়তান সহপাঠীদের হাতে বিপদে পড়েও হ্যারি সেই বিপদ থেকে বীরত্বের সঙ্গে বেরিয়ে আসতে পেরেছে ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধু আর সহানুভূতিশীল জাদুশিক্ষকের সাহায্যে। তাই হ্যারি পটারের গল্প তাই উত্তরণের গল্প। সেই গল্পের ভাঁজে ভাঁজে মিশে আছে আধুনিক জীবন যন্ত্রণার মাঝে শিশুমনের অবাধ কল্পনার পাখায় বাধাহীন মুক্তির আনন্দ। তাই এই গল্প পৃথিবীর সমস্ত শিশুমনকেই ছুঁয়ে গিয়েছিল।

গল্পটা লিখে ফেলার পেছনে রাউলিং-এর জীবনের যেমন একটা দীর্ঘ বেদনাদায়ক ইতিহাস আছে, ঠিক ততটাই যন্ত্রণার সেটা বই আকারে প্রকাশ করার ঘটনাপ্রবাহে। বারো জন প্রকাশক বইটাকে বাতিল করে দিয়েছিলেন পত্রপাঠ। সারাবিশ্বে জাদু আর রূপকথা নিয়ে অনেক বই আছে, সেগুলো যে রম রম করে বিকোচ্ছে এমনও নয়। আর তাছাড়া এর মধ্যে এমন নতুন কিছু তাঁরা খুঁজে পাননি, যাতে বইটা প্রকাশ করা যায়। আমাদের বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও এরকম ঘটনা ঘটেছিল, প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ প্রকাশের জন্য বেশ কয়েকজন প্রকাশকের কাছে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। একজন তো উপন্যাসের নামটাকে ব্যঙ্গ করে বলেও বসেছিল যে, ‘আমাদের এখানে পাঁচালিটাচালি ছাপা হয় না মশাই’। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। সেরকমই প্রত্যাখ্যাত হয়েও হাল না ছেড়ে অনেক ঘোরাঘুরির পর রাউলিং গেলেন ব্রিটেনের আর এক প্রকাশক সংস্থা ‘ব্লুমসবেরি’র কাছে। প্রকাশক ভদ্রলোক নিজে পড়ে বইটা ছাপার মতো তেমন কিছু পাননি কিন্তু তাঁর মেয়ে পেল। বছর আটেকের মেয়ে। তিনি ভাবলেন, বইটা যেহেতু ছোটদের জন্য তাই এর বিচার ছোটদের চোখ দিয়েই করতে হবে। মেয়েকে প্রথম পরিচ্ছেদটুকু আগে পড়তে দিলেন, দেখলেন মেয়ে যেন গোগ্রাসে পড়ছে সেই গল্প, চেয়ে নিচ্ছে একের পর এক পরিচ্ছেদ। তখনই প্রকাশক সিদ্ধান্ত নিলেন বইটা ছাপবেন। ১৯৯৭ সালে বইটি প্রকাশিত হল। ১৯৯৭ সালে আর একটি ঘটনা ঘটেছিল, ‘টাইটানিক’ ছবিটা সারা বিশ্বে রিলিজ করেছিল। ছবির কথাটা উল্লেখ করলাম এই জন্য যে, দুটোর ক্ষেত্রেই প্রকাশ বা রিলিজের বহু আগে থেকেই এমনভাবে প্রচার চালানো হচ্ছিল যে, বইটা বা ছবিটার ব্যাপারে মানুষের মনে তৈরি করা গিয়েছিল ব্যাপক আগ্রহ। তৈরি হয়েছিল প্রচারমূলক বাণিজ্যকৌশলের নতুন পথ। এ-পথে হ্যারি পটারের প্রকাশক ও টাইটানিকের প্রযোজক দুজনেই প্রচণ্ড রকমের সফল হয়েছিলেন। দুই ক্ষেত্রেই অবশ্য প্রচার ছাড়াও ছিল কনটেন্ট বা ‘বিষয়’-এর জোর। সেই জোরেই সেদিন তারা রচনা করেছিল ইতিহাস।

Spread the love

Best Bengali News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is Bengal's popular online news portal which offers the latest news Best hindi News Portal in Kolkata | Breaking News, Latest Bengali News | Channel Hindustan is popular online news portal which offers the latest news

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement